২১ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গ্রামীন উন্নয়নে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে

গ্রামীন উন্নয়নে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা এবং গ্রামীন উন্নয়নে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে উঠে এসেছে। তবে নানামুখী সংকট গ্রামীন দারিদ্র ও ক্ষুধা নিবারণের ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের গ্রামীন এলাকাতেও পরিবেশগত বিপর্যয়, কৃষির সমস্যা ও উদীয়মান তরুণদেন কর্মসংস্থানের সঙ্কট বিরাজমান রয়েছে। গ্রামীন এই হুমকি সমুহ বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা অর্জনকে মন্থর করে দিচ্ছে।

গ্লোবাল ফুড পলিসি রিপোর্ট ২০১৯ -এ এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বৃহস্পতিবার স্থানীয় এক হোটেলে এই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। রিপোর্টে এসব সঙ্কট মোকাবেলায় গ্রামকে পুনরুজ্জীনের তাগিদ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে গ্রাম ও শহরের মধ্যকার উন্নয়ন বৈষম্য কমানোর জন্য নিবিড় উদ্ভাবনীমূলক কর্মসূচী গ্রহণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। গ্রাম পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে বিদ্যুত সংযোগ প্রদানের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করে রিপোর্টে বলা হয়েছে, কেবলমাত্র বিদ্যুতই পারে গ্রাম পুনরুজ্জীবনে বড় ভ‚মিকা রাখতে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অকেটা এগিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের গ্রামের ৫৯ শতাংশ এলাকা বিদ্যুত সংযোগের আওতায় চলে এসেছে। যদিও বিশ্বে এখনও ১০০ কোটি মানুষ বিদ্যুত সংযোগ থেকে বঞ্চিত রয়েছে।

রিপোর্ট প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে কৃষি মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে অগ্রাধিকারের তালিকায় গ্রাম পুনরুজ্জীবনকে শীর্ষে রাখা হয়েছে। কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও পণ্য বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা গ্রামকে শহরে পরিণত করতে চাই। যাতে শহরের সব সুবিধা গ্রামে পাওয়া যায়। এতে গ্রাম থেকে শহরের আসার প্রবণতা হ্রাস পাবে। এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

বিদ্যুত সংযোগের পরিসংখ্যানের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুত সংযোগ প্রাপ্তির সংখ্যা আরও বেশি হবে। এই সংখ্যা ৯০ শতাংশ হবে। বিদ্যুত সংযোগ বৃদ্ধির কারণে গ্রাম এলাকায় অকৃষি কর্মকান্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামে এখন রাইস কুকারে রান্না করা হচ্ছে। ঘরে ঘরে বৈদ্যুতিক সামগ্রি ব্যবহৃত হচ্ছে। এভাবে গ্রাম ক্রমান্নয়ে শহরে পরিণত হচ্ছে।

কৃষি খাতে বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করে কৃষি মন্ত্রী বলেন, আমাদের স্থানীয় বাজার খুব ছোট। ফলে অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদিত হলে কৃষক তার দাম পায় না। তাই কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াকরণে আমাদের বিনিয়োগ দরকার। যাতে উৎপাদিত কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াকরণ করে বিদেশে রফতানি করা যায়। আমরা প্রক্রিয়াজত কৃষি পণ্য রফতানিকে উৎসাহিত করছি। এজন্য সরকার প্রণোদনাও ঘোষণা করেছে।

এ ব্যাপারে আলুর প্রসঙ্গ টেনে কৃষি মন্ত্রী বলেন, এবছর দেশে এক কোটি ৩ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। দেশে আলুর চাহিদা ৭০ লাখ টন। ফলে ৩০ লাখ টন আলু উদ্বৃত্ত রয়েছে। এই আলু রফতানি করা যাচ্ছে না। এক সময় রাশিয়ায় আলু রফতানি হতো। কিন্তু সমস্যার কারণে সে বাজারেও আলু রফতানি বন্ধ রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনষ্টিটিউট (ইফরি) প্রতি বছর এই বৈশ্বিক খাদ্য নীতি রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে। এই রিপোর্ট প্রকাশ উপলক্ষ্যে ইফরি বৃহস্পতিবার সকালে এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড, শামসুল আলম। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইফরি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি ড. আখতার আহমেদ। ফুড পলিসি রিপোর্টের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন ইফরির মহাপরিচালক ড. শেনজেন ফ্যান। এই রিপোর্টের ওপর আলোচনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী পরিচালক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যামিরেটাস অধ্যাপক ড. এম এ সাত্তার মন্ডল। বিআইডিএস এর মহাপরিচালক ড. খান আহমেদ সৈয়দ মুর্শিদ এবং ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টারের আবাসিক পরিচালক ড. ইমরান মতিন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিতি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক নাজমুন আরা খানম।

আখতার আহমেদ খান খান তার স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশের গ্রামীন রুপান্তরের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তিনটি কারণে বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। এগুলো হচ্ছে চালের স্থিতিশীল মুল্য, গ্রামীন মজুরি বৃদ্ধি এবং বিদ্যুত সংযোগ প্রাপ্তি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের গ্রামীন এলাকায় নাটকীয়ভাবে বিদ্যুত সংযোগ বাড়ছে। এতে গ্রামীন কর্মকান্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে কৃষি কাজে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে।

তিনি গ্রামকে পুনরুজ্জীবনের জন্য তিনটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। এগুলো হলো- কৃষি খাতে প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান, গ্রামীন দরিদ্রদের বিদ্যুত সংযোগ প্রদান এবং গ্রামীন অকৃষি কর্মকান্ডে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান গ্রামীন পুনরুজ্জীবনের জন্য টেকসই ভ‚মি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, দেশের সব ধরণের ভ‚মি ব্যবহারের পরিকল্পনা করতে হবে। পরিবেশগত বিষয় মাথায় রেখে বিনিয়োগ করতে হবে। তিনি বলেন, গ্রামীন পুনরুজ্জীবনের জন্য নতুন সম্ভাবনাময় প্রবৃদ্ধির উৎস খুজে বের করতে হবে। এক্ষেত্রে পাট একটি সম্ভাবনাময় পণ্য। তথ্য প্রযুক্তিকেও গ্রামীন উন্নয়নের নতুন উৎস হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

এম এ সাত্তার মন্ডল গ্রামীন যান্ত্রিকীকরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, শুধু কৃষি যান্ত্রিকীকরণই নয়, অন্যান্য খাতেও যন্ত্রের ব্যবহার করতে হবে। শুধু সেচ ও ধানের চারা লাগানোর জন্যই নয়, কৃষির সব কাজেই যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে। এতে কাজের গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে এবং শ্রমিক সঙ্কট থেকে কৃষক মুক্তি পাবে। তবে শুধু যন্ত্র ব্যবহার করলেই হবে না, যন্ত্রের সর্বোচ্চ ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে।