২৪ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নারী-শিশুর জবানবন্দী

সারাদেশে নারী নির্যাতন বিশেষ করে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার নারীরা নিজেদের ওপর ঘটে যাওয়া অত্যাচারের বর্ণনা দেবে নারী ম্যাজিস্ট্রেটকে। এমন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের প্রধান বিচারক সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের আদেশে। নতুন এই নির্দেশনা আসে সুপ্রীমকোর্টের স্পেশাল কমিটি ফর জুডিসিয়াল রিফর্মসের মাধ্যমে। নারীরা তাদের ওপর হওয়া নির্যাতনের যথাযথ বর্ণনা কোন পুরুষ ম্যাজিস্ট্রেটকে দিতে পারে কিনা তেমন আশঙ্কাকে আমলে নিয়ে নতুন এই ধারা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে। সময়োপযোগী এই সিদ্ধান্ত নিপীড়িত নারীদের সমস্ত লজ্জা আর সংস্কার ভেদ করার অন্যতম উপায় হতে পারে। নিপীড়নের শিকার হয় মূলত অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া সমাজ সংস্কারের জালে আবদ্ধ অসহায় নারীরা। ফলে লজ্জা, সঙ্কোচেই শুধু নয়, সম্মান হারানোর শঙ্কায়ও নির্যাতনের কথাগুলো বলতে হিমশিম খায়। বিচার প্রার্থীরা যদি অপরাধের বিরুদ্ধে যথার্থ সত্য তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়, তাহলে শুধু বিচারহীনতার অপসংস্কৃতিই নয়, অভিযুক্তের মূল অপকর্মও সামনে আসে না। ফলে জঘন্যতম অন্যায় করেও নিপীড়ক অনেকটাই দৃশ্যপটের আড়ালেই থেকে যায়।

সুপ্রীমকোর্ট এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই নববিধান জারি করে যখন আগুনে ঝলসে যাওয়া নুসরাতের মর্মান্তিক মৃত্যু সারাদেশকে প্রতিবাদে প্রতিরোধে উত্তাল করে তুলেছে। তারও আগে নুসরাতের শারীরিক শ্লীলতাহানির ব্যাপারটিও প্রথমদিকে আমলে না নেয়ার বিষয়টিও সামনে চলে আসে। সুপ্রীমকোর্ট কর্তৃক জারি এই নবধারাটি বাংলাদেশের সব মুখ্য বিচারিক হাকিম এবং মুখ্যমহানগর হাকিমকে মেনে চলতে আদেশ দেয়া হয়। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের কাছেও এমন নতুন আইনী প্রক্রিয়া পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোন জেলা, উপজেলা কিংবা মহানগরে মহিলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুপস্থিতি অন্য কোন যোগ্য হাকিমকে এ দায়িত্ব পালনের সুপারিশ এসেছে। এরপরও কোন ধরনের অসঙ্গতি, সমস্যা কিংবা সঙ্কট তৈরি হলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমন নির্দেশনা নারী ও শিশু নির্যাতনকে এক ভয়ঙ্কর পর্যায় থেকে আরও সহনীয় অবস্থায় আনতে যুগান্তকারী প্রভাব রাখবে, এই আশা করাই যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক অঘটন, নিপীড়ন আর নৃশংসতার কাহিনী উঠে এলেও আবার চাপা পড়ার সহিংসতার চিত্রও একেবারে কম নয়। নির্যাতনের শিকার অনেক অসহায় নারী যারা অতখানি আধুনিক নয়, তথ্যপ্রযুক্তিতেও অনেকটা পেছনে কিংবা লজ্জায় অপমানে অন্য কারোর সামনে মুখ খুলতে নারাজ তাদের নির্মমতার কাহিনী লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়। ফলে নারী ম্যাজিস্ট্রেটকে যদি কোন অসহায় নারী নিজের ওপর অকথ্য অত্যাচারের বয়ান দিতে পারে, এর থেকে মঙ্গল আর কিছু হতে পারে না। কারণ নিজের সমস্ত দুঃসহ যন্ত্রণা ভাগ করে নিতে গেলে সমব্যাথী আরও একজন প্রাজ্ঞ নারীর সাহচর্য একান্ত আবশ্যক। যার স¯েœহ সান্নিধ্যই শুধু নয়, আইনী প্রক্রিয়ার প্রতিকারের উপায়ও যখন সেই নারীই দিতে পারে তাহলে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তাসহ অনেক অনুকূল পরিস্থিতি সামনে এসে যাবে বলে ধারণা করাটা অমূলক নয়।

শারীরিকভাবে অসহায় ও দুর্বল নারীরা সমাজ-সংসারের হরেকরকম অপসংস্কারের বলি হয়। শুধু তাই নয়, নির্যাতনের কথা অকপটে স্বীকার করতেও হয় কুণ্ঠিত। নারী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সরাসরি নিজেদের কথা বলতে পারলে হয়তোবা ক্ষতবিক্ষত নির্যাতন কিছুটা হলেও উপশম হবে।