২৫ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

১৬৩টি বাসের কয়টি রাস্তায় চলাচল উপযোগী

  • মতি লাল দেব রায়

১৯ মার্চ, ২০১৯ প্রগতি সরণিতে সুপ্রভাত বাসের চাপায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউবি) ছাত্র আবরার আহমেদ নিহত হন। একই দিন এই বাস অন্য এক স্কুলছাত্রীকে চাপা দেয় শাহাজাদপুরের বাঁশতলায়। সেখানে চালককে স্থানীয় জনগণ ধরে ভাটারা থানায় হস্তান্তর করে। তারপর ইয়াসিন নামক একজন সহকারী জনতার রোষানল থেকে বাঁচতে মালিকের নির্দেশে বাস নিয়ে পালানোর পথে আবরারকে জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর দিয়ে হাঁটার সময় বাস চাপা দেয়। এই বাসের চালক, হেলপার, সহকারী, মালিক সকলকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরদিন সুপ্রভাত পরিবহনের বাস চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় বিআরটিএ। নিষেধাজ্ঞার চিঠিতে বলা হয়, পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত ঢাকা মহানগরের (রুট নং এ-১৩৮) উত্তরা-রানীগঞ্জ থেকে সদরঘাটে চলাচলকারী সুপ্রভাত প্রাইভেট লিমিটেডের সব বাস ও মিনিবাস চলাচল বন্ধ থাকবে। বিআরটিএর এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে বাস চলাচলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে সুপ্রভাত কর্তৃপক্ষ। সেই আবেদন নিষ্পত্তি না করায় ৮ এপ্রিল বিআরটিএ’কে আইনী নোটিস দেয়া হয়। কিন্তু সেই নোটিসের জবাব না পেয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় সুপ্রভাত। গত ১৫ এপ্রিল হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রভাতের এমডি আশরাফ আলী। এ রিটের শুনানি নিয়ে আদালত সুপ্রভাতের আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দিয়েছে।

সুপ্রভাতের পরিবহন অনেক দিন ধরে উত্তরা-রানীগঞ্জ থেকে সদরঘাট রুটে বাস চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবহনের একজন মালিক ননী গোপাল সরকার, যার বাস ১৯ মার্চ ২০১৯ তারিখে আবরারকে চাপা দেয়। সেই বাসটি ছিল ৪৯ আসনবিশিষ্ট যা চলাচলের জন্য মহাখালী থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুট পারমিট ছিল। মহাখালী ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুটের হওয়া সত্ত্বেও সুপ্রভাত কোম্পানির সভাপতি ও সেক্রেটারিকে ম্যানেজ করে সদরঘাট ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে গাজীপুর রুটে বাস চালাতেন বলে বাসের মালিক জানান। রুট পালটিয়ে গাড়ি চালানোর জন্য কোম্পানির সভাপতি ও সেক্রেটারিকে প্রতিটি বাস থেকে প্রতিদিন তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা দিতেন বলে তিনি জানান।

গত ১ জানুয়ারি ২০১৯ মঙ্গলবার বেলা দেড় ঘটিকার সময় মালিবাগ রেলক্রসিং সংলগ্ন রামপুরা সড়কের চৌধুরীপাড়ায় অবস্থিত আবুল হোটেলের সামনে মিম আক্তার (১৬) ও নাহিদ পারভিন পলি (১৯) নামে দু’জন কিশোরী আল রাফি গার্মেন্টসের কর্মী সুপ্রভাত পরিবহনের বাসের চাপায় নিহত হন। পলি নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার মৃত ইজাজ উদ্দিনের মেয়ে। মিম বগুড়ার গাবতলী উপজেলার সুনা মিয়ার মেয়ে। নিহত পলির মা ঘটনার দিন হাতিরঝিল থানায় মামলা করেন। পলি দীর্ঘদিন বাহারাইনে থাকতেন। মাত্র ৬ মাস যাবত দেশে এসে পরিবারের অভাব দূর করতে তিনি মালিবাগের আল রাফি গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছিলেন। নতুন ভিসা হাতে এলেই তার আবার বাহরাইন যাওয়ার কথা ছিল।

সুপ্রভাতের ঢাকা মেট্রো-ব ১১-৪১৩৫ নম্বরের বাসটির ফিটনেস সার্টিফিকেট ছিল কি-না, যে বাস চালায় সহকারী, যে বাস অননুমোদিত রুটে চালায়, যে বাস প্রতিদিন কোম্পানির সভাপতিকে ৩৫০০.০০ টাকা ঘুষ দিয়ে অন্য রুটে চলে, তার ফিটনেস সার্টিফিকেট থাকার কথা নয়। কী করে এক রুটের গাড়ি অন্য রুট দিয়ে চলে তা খুঁজে বের করা দরকার। বিআরটিএর মতে, ঢাকার ৩৩ শতাংশ বাসের ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই। সুপ্রভাত পরিবহনের প্রত্যেকটি বাসের ফিটনেস আছে কিনা, চালকদের প্রত্যেকের সঠিক লাইসেন্স আছে কিনা এবং নিয়ম অনুযায়ী রুট পারমিট আছে কিনা ইত্যাদি জানার জন্য একটি তদন্ত টিম গঠন করে তদন্ত করে তার প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করবে এই পরিবহনের বাস রাস্তায় চলবে কিনা। সুপ্রভাত পরিবহনের মালিকপক্ষ কর্তৃক তাদের ১৬৩টি বাসের রেজিস্ট্রেশন নম্বর চালকের লাইসেন্সের কপি, চালকের নাম, হেল্পারের নাম ঠিকানাসহ বিস্তারিত তথ্য মালিক পক্ষকে রাখতে হবে যাতে সরকারী কর্তৃপক্ষ চাহিবা মাত্র দেখাতে পারেন। সুপ্রভাত পরিবহনের বাসগুলোর চেহারার দিকে তাকালে বোঝা যায় আসলে এই পরিবহনের কোন বাসের ফিটনেস সার্টিফিকেট আছে কিনা। তাছাড়া সুপ্রভাত পরিবহনের বাস অনুমোদিত রুট ছাড়া কোন্্ কোন্্ রুটে অবৈধভাবে চলছে তা তাদের কাছ থেকে জেনে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিভাবে কাদের দ্বারা এক রুটের গাড়ি অন্য রুটে চালায় এবং কেন রুট বদলায় তার কারণ তদন্তসাপেক্ষে বের করতে হবে। সুপ্রভাত পরিবহনের অনিয়মগুলো তদন্ত করলে অনেক বিষয় দেশবাসীর নজরে আসবে এবং এই কেস স্টাডির ফলাফলকে বিবেচনায় নিয়ে আর যত বাস পরিবহন কোম্পানি আছে তাদের সতর্ক করে দিতে হবে যাতে এ রকম পরিস্থিতির আর সৃষ্টি না হয়।

লেখক : আহ্বায়ক, ক্যাম্পেন ফর রোড সেফ্টি, নিউইয়র্ক