২৭ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্থায়ী প্রবৃদ্ধি অর্জনে রফতানি বাড়ানোর পরামর্শ

  • বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ হ্যান্স টিমার

এম শাহজাহান, ওয়াশিংটন থেকে ॥ স্থায়ী প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশের রফতানি আরও বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ হ্যান্স টিমার। তার মতে, শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভর না থেকে বহুমুখী রফতানির দিকে নজর দিতে হবে বাংলাদেশকে। অপার সম্ভাবনা থাকার পরও মাত্র এক-তৃতীয়াংশ রফতানি ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ স্থায়ী ও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে রফতানি বাড়ানো দরকার। টিমার মনে করেন, বাংলাদেশ রফতানির চেয়ে বেশি আমদানি করছে। অথচ রফতানির চেয়ে আমদানি বেশি হলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাজারে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বাংলাদেশের। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক সদর দফতরে বসন্তকালীন সভা চলাকালীন চা চক্র বিরতির সময় বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে সাক্ষাতকারে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রফতানি আয় বাড়ছে, তবে এটি আরও বাড়ানো সম্ভব। কারণ বাংলাদেশের সেই সক্ষমতা রয়েছে। তিনি বলেন, চলতি বছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সরকার এটিকে দুই অঙ্কের ঘরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছে। কিন্তু এটি বড় চ্যালেঞ্জিং যদিও বাংলাদেশ শীর্ষ পাঁচ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশের একটি। তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ অসম্ভবও নয়, কারণ বাংলাদেশের রফতানি বাড়ছে। পোশাকের পাশাপাশি রফতানি বাণিজ্যে নতুন নতুন পণ্য যুক্ত হচ্ছে। এরপরও রফতানির চেয়ে আমদানির পরিমাণ বেশি। রফতানি হ্রাস পেলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে।

তার মতে, এতে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে ও মুদ্রার মান কমে যাবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ফলে টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে বাংলাদেশের জন্য। হ্যান্স টিমার বাংলাদেশের রফতানি বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরে সাংবাদিকদের বলেন, ভর্তুকি নির্ভরতার দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। বিনিয়োগকারীদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। নতুন বাজার তৈরি করতে হবে। এ জন্য এখনই মনোযোগী হতে হবে বাণিজ্য উদারীকরণের ক্ষেত্রে। চালু করতে হবে বাজারভিত্তিক মুদ্রা বিনিময় হার।

পাশাপাশি বাণিজ্যের কর হার কমিয়ে আনতে হবে। বাণিজ্য কর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এমনিতে দক্ষিণ এশিয়ায় আমদানিযোগ্য পণ্যে কর অন্য দেশের তুলনায় বেশি। এই কর হার কমিয়ে আনলে রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন খরচ কমে আসবে। পাশাপাশি রফতানি কর কমিয়ে আনলে অভ্যন্তরীণের পাশাপাশি বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও।

প্রসঙ্গত, দেশের রফতানি খাত মূলত পোশাক নির্ভর। এ খাতে ভাল করলে সার্বিক রফতানিও ভাল হয়। আর এ খাতের রফতানি কম হলে মোট রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সার্বিক রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আর পোশাক খাতে (ওভেন ও নিট মিলে) প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

বর্তমান (২০১৮-১৯) অর্থবছরের জন্য সরকার প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার পূর্বাভাস দিয়ে বলেছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি হবে না। প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে নানা বিতর্কের বিষয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, জিডিপির প্রবৃদ্ধি সবসময় অনুমান নির্ভর হয়। এটি সব সময় মিলবে এমনটি নয়।

প্রবৃদ্ধি আট না সাত শতাংশ হলো সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো এই প্রবৃদ্ধি কীভাবে অর্জন হচ্ছে। কেননা, কোন দেশে ভোগের পেছনে ব্যয় বাড়লেও প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ভোগনির্ভর অর্থনীতির বাইরে এসে উৎপাদনমুখী বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সেই সঙ্গে টেকসই প্রবৃদ্ধিকে ধরে রাখতে হবে। ব্রেক্সিট, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের মতো আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারেÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে হ্যান্স টিমার বলেন, স্বল্প মেয়াদে বাংলাদেশ কিছু সুবিধা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের আন্তর্জাতিক সমস্যা শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো দক্ষিণ এশিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে। স্বল্পমেয়াদে উন্নত দেশগুলো বিকল্প বাজার হিসেবে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের প্রতি ঝুঁকতে পারে। কিন্তু এটি খুব বেশিদিন স্থায়ী হবে না।

তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে তারা নিজেদের দেশেই বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। ফলে রফতানি সুবিধা সে সময় আরও কঠিন হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পর বাংলাদেশের বাণিজ্যে কী প্রভাব পড়বেÑ এ প্রশ্ন তিনি বলেন, উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিলে বিভিন্ন বাণিজ্যিক জোটে এই সুবিধা বহাল রাখার জন্য চেষ্টা চালাতে হবে। তার মতে, রফতানিপণ্য বহুুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি। সব সময় একক পণ্যের ওপর নির্ভর থেকে স্থায়িত্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। এজন্য ওষুধ, পাটজাতপণ্য, হস্তজাতপণ্যসহ কৃষিপণ্যেও রফতানি বাড়াতে হবে। পণ্যের গুণগতমান, ডিজাইন ও ফ্যাশনে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।