২২ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শত বছরের পুরনো জমিদার বাড়িতে

  • সুমন্ত গুপ্ত

বছর আসে বছর যায় কিন্তু জমিদার বাড়ি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে স্যাঁতসেঁতে শ্যাওলা মেখে, কাল থেকে কালান্তরে গন্ধ ছড়িয়ে! জমিদার বাড়ির ঝরাপাতা, পুরনো ধুলো, রহস্যমাখা হাওয়া মাড়িয়ে ছুটে চলে জীবন ধারা। মহাকাল ছিন্ন করে বের হওয়া মানুষটা খুঁজে বেড়ায় অতীত ঐতিহ্যের। আমারও সেই অবস্থা, পুরনো কোন স্থান, তার ইতিহাস জানার আগ্রহ আমার সেই ছোট বেলার থেকেই। অনেক দিন ধরে কোন জমিদার বাড়িতে ঘুরতে যাওয়া হয় না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সিলেটের সুনামগঞ্জের গৌরারং জমিদার বাড়ি নাম চোখে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই আমার গ্রুপের ছেলে নিলয়কে ফোন দিলাম। গৌরারং জমিদার বাড়ি চিনো নাকি? ও বলল নাম শুনেছি, শুনি ওখানে ভূতের বাস কিন্তু যাওয়া হয় নাই কখনো। চলেন ভাই আমি আর আপনি ঘুরে আসব। আমি ও সঙ্গে সঙ্গে প্লান করে ফেলি আসছে শুক্রবারেই বেরিয়ে পড়ব সুনামগঞ্জের গৌরারং জমিদার বাড়ি দেখতে। বারে বৃহস্পতি বার তাই অফিস থেকে বের হতে হতে রাত নয়টা। যানজট পেরিয়ে বাসায় ঢুকতে ঢুকতে রাত দশটা। আগামী কাল সকাল বেলা বের হতে হবে তাই দেরি না করেই রাতের আহার সেরে শুয়ে পড়লাম। শুয়ে সেই গতানুগতিক অভ্যাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢু মারা। এদিকে ঘড়ির কাঁটা চলছে এগিয়ে কিন্তু নিদ্রা দেবীর আগমনের কোন খবর নেই। ঠিক কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম টেরই পেলাম না। সেই সাত সকালে মার ডাকে ঘুম ভাঙ্গল। ঘুম থেকে উঠেই নিলয়কে ফোন দিলাম। ঠিক দুইবার ফোন দিলাম নিলয় কে ফোন ধরার কোন নাম গন্ধ নেই। শেষ পর্যন্ত ফোন ধরলেন জনাব, আমি বললাম কি ঘুমে নাকি? উত্তরে বলল না আমি এই মাত্র উঠলাম। বললাম দেরি কর না দ্রুত তৈরি হয়ে চলে আস। শেষ পর্যন্ত নিলয়ের দেখা মিলতেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম গন্তব্য পানে। প্রথমে চৌহাট্টা, সেখান থেকে কার অথবা মাইক্রো করে সুনামগঞ্জ শহরে যেতে হবে। চৌহাট্টাতে গিয়ে কার এর জন্য অপেক্ষা করছি, আমি, নিলয় আর মা মিলে তিন জন যাত্রী। শেষ পর্যন্ত একজন ড্রাইভারের দেখা পেলাম। রওনা দিলাম সুনামগঞ্জ পানে। সিলেট শহর থেকে লামাকাজি, গোবিন্দগঞ্জ, জাউয়া বাজার, পাগলা বাজার ধরে আমাদের চার চাকার গাড়ি চলছে যেতে যেতে মনে হলো পৃথিবীতে সবুজ ছাড়া আর কোন রং নেই। গাছের পাতা আগের রাতের বৃষ্টির সাক্ষী। শান্তিগঞ্জ বাজার পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম সুনামগঞ্জ শহরে। এদিকে পেটে চলছে রাম রাবণের যুদ্ধ কোথাও খোঁজাখুঁজি না করে সরাসরি সাইনবোর্ড বিহীন এক খাবারের দোকানে ঢুকে পড়লাম। দেখলাম সবে মাত্র গরম গরম মিষ্টি সিরার থেকে উঠিয়ে তোলা হয়েছে পরিবেশনের জন্য। দেখে লোভ আর সামলাতে পারলাম না। রুটি আর গরম মিষ্টি দিয়ে সেরে নিলাম পেট পূজা। গরম গরম মিষ্টি স্বাদে দারুন আর খাঁটি দুধের তৈরি তাই স্বাদটাও ভিন্ন। যাই হোক পেট পূজা শেষ করে দোকানের একজনের কাছে জানতে চাইলাম গৌরারং জমিদার বাড়ি কিভাবে যাব? বলতেই বললেন রিক্সা নিয়ে চলে যান নতুন ব্রিজে সেখান থেকে সিএনজি করে যেতে পারবেন। আমরা বেরিয়ে রিক্স করে নতুন ব্রিজে গেলাম সেখান থেকে এক সিএনজি ড্রাইভারকে বললাম গৌরারং জমিদার বাড়ি বলতেই উনি বললেন চলেন স্যার। আমরা জমিদার বাড়ির দিকে ধাবিত হলাম। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম জামিদার বাড়িতে। জমিদার বাড়ির ফটক ধরে ভেতরের দিকে প্রবেশ করলাম আমরা। পুরনো ভবনের প্রতিটি স্থানে আছে অসাধারণ শৈল্পিক কাজ। অনেক বড় এলাকা নিয়ে বাড়িটি। দেখা হলো ঐ এলাকার এক প্রবীণ মানুষের সঙ্গে তার কাছে এই বাড়ির ইতিহাস জানতে চাইলাম। তিনি বললেন দু’শত বছর আগে জমিদার রাজেন্দ্র কুমার চৌধুরী ও জমিদার রাকেশ রঞ্জন চৌধুরীর হাতে এই জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন হয়। ত্রিশ একর জমির ওপর তারা এই জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করেন। তবে তাদের সময় এখানে জমিদারি চালু হলেও মূলত জমিদার রাম গোবিন্দ চৌধুরীর সময়ে এই জমিদার বাড়িটি বিস্তৃতি লাভ করে। তিনিই ছিলেন এই এলাকার প্রতাপশালী জমিদার। তার জমিদারির আমলে জমিদার বংশধর ব্যতীত অন্য কেউ এখান দিয়ে জুতা পায়ে দিয়ে হাঁটতে পারত না। এই জমিদার বাড়িটিতে আলাদা আলাদা ছয়টি ভবন ও রংমহল, অন্দরমহল, সিংহাসন ও জলসা ঘর রয়েছে। আমরা ওনার কথা শুনে শুনে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। উনি আরও বললেন প্রভাবশালী এই জমিদার বাড়িটির জৌলুসে ভাটা পড়ে ৪৭ সালের দেশভাগের সময়, পরবর্তীতে ৫৩ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে একসময়কার এই প্রভাবশালী জমিদার বাড়িটিও হারিয়ে ফেলে তার প্রভাব প্রতিপত্তি এবং জৌলুস। পরবর্তী সময়টা কেবলই ইতিহাস! মুক্তিযুদ্ধের সময় ইতিহাস বিজরিত এই জমিদার বাড়িটি পাকবাহিনী কর্তৃক প্রভূত ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। এর আগে আঠারো শতকের কোন একসময় প্রচ- ভূমিকম্পে জমিদার বাড়িটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভবন ধসে বাড়িটির তৎকালীন জমিদারের এক ভাই নিহত হন। কালক্রমে জমিদারের উত্তরসূরিরা অন্যত্র চলে গেলে বাড়িটি অরক্ষিত এবং ভূতুড়ে বাড়ি হিসেবেই সকলের নিকট পরিগণিত হয়। আমি নিলয়ের কথার সাথে মিল পেলাম ও আগেই বলেছিল এই রাজ বাড়িতে বুঝি ভুতের বাস। যাই হোক আমারা প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে আছি কোন প্রকার গণ্ডগোল চোখে পরেনি। একটু সামনে গিয়েই দেখতে পেলাম বাড়িটির সামনে দিয়ে সাবলীল গতিতে প্রবাহিত হচ্ছে নদীর সবুজ ও স্বচ্ছ জলধারা। পেছনে সুবিশাল হাওর। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ আর সবুজ। দখিনা বাতাসে এক অন্যরকম ভাল লাগার অনুভূতিতে মুগ্ধ হলাম আমরা। শেষ দিকের একটি কক্ষে ঢুকে গা ভয়ে ছমছম করছিল। অন্ধকার কক্ষÑ এর মাঝে ছিদ্র দিয়ে আলো প্রবেশ করছে। কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ। একটু সামনেই আছে শান বাঁধানো পুকুর ঘাট। আমাদের মতো অনেকেই এসেছেন ঘুরতে। কারুকাজ খচিত অন্দরমহল এবং অনন্য স্থাপত্যশৈলীর কারণেই জমিদার বাড়িটি এখন ভ্রমণ পিপাসুদের নজর কেড়েছে। আর এই ভরা বর্ষায় থই থই জলের মধ্যে মনে হয় এ যেন সমুদ্রে ভাসমান কোন রাজপ্রাসাদ। অনুপম নির্মাণশৈলীর কারণে এ জমিদার বাড়িকে হাওর রাজ্যের রাজমহল হিসেবেই আখ্যায়িত করেন স্থানীয়রা। আমি মনে মনে ভাবছিলাম কে জানে, হয়তো জমিদার বাড়ির সামনের এই পথ দিয়েই একসময় দুর্দান্ত দাপটে বিচরণ করতো জমিদারদের পাক পেয়াদা, নায়েব কিংবা রাজকর্মচারী! হয়তো এই পুকুর পাড়েই কোন প্রেমিক প্রেমিকার প্রেমের সলিলসমাধি ঘটে! এখানেই হয়তো জমিদার তার বিরুদ্ধাচরণকারীদের কঠোর শাস্তি দিতেন কিংবা ওই অন্দরমহলেই হয়তো কত সুন্দরী রমণীর নৃত্যের তালে সুরা পান করে রোমাঞ্চিত হতেন জমিদার বাবু। হয়তোবা রোজ সন্ধ্যায় গানের পসরা সাজিয়ে মধুর কন্ঠে জমিদার বাবুর মনোরঞ্জন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়তো সুরেলা রমণী! জমিদার বাড়ির প্রধান ফটকেই হয়তো সুবিচারের আশায় জমিদার বাবুর জন্য অধীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতো বিচার প্রার্থী! জমিদারি আমল নেই। জমিদার নেই। এক কথায় এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। প্রায় ধসে পড়া ভবনে কিছু নিরেট ইট, ধুলাবালি আর তৃণলতা কালের ¯্রােতের ওপর আঁকড়ে থেকে ইতিহাসের সাক্ষ্য দিচ্ছে!

যাবেন কিভাবে

সরাসরি ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ ৫৫০ টাকা বাস ভাড়া। এনা / শ্যামলী / মামুন বাস যায়। ট্রেনে যেতে চাইলে প্রথমে আপনাকে ঢাকা থেকে সিলেট আসতে হবে ট্রেনে তার পর সিলেট থেকে গাড়ি করে সুনামগঞ্জ। সেখান থেকে সুনামগঞ্জ নতুন ব্রিজ। তারপর ব্রিজ থেকে সিএনজি করে জমিদার বাড়ি। ভাড়া ২৫ টাকা জনপ্রতি।