১৮ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মহাস্থানগড়ে একদিন

  • এম শহিদুল ইসলাম

বেড়াতে ভাল লাগে, ভাল লাগে বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গায় যেতে। সেই ভাল লাগার অভ্যাস থেকে বেশ কিছুদিন ধরে মনে মনে ভাবছিলাম, বগুড়ার মহাস্থানগড় কবে দেখতে যাব। সময় এবং সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। এই সময়ে ফেসবুকে পরিচয় হয় বগুড়ার এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে। নাম তপু খান। পরিচয়ের এক পর্যায়ে তপু ভাইয়ের কাছে আমার মহাস্থানগড় দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করি। আমার বগুড়া যাওয়ার ইচ্ছার বিষয়টা বুঝতে পেরে তপু ভাই আমাকে বগুড়া যাওয়ার অনুরোধ করেন। শুধু যাওয়ার জন্যই বলেন না, তিনি বলেন, আমাকে তিনি সঙ্গে নিয়ে সমস্ত বগুড়া শহর ঘুরে দেখাবেন। ফেসবুকে পরিচিত একজন মানুষের আন্তরিকতা দেখে আমি অবাক হই। অবশেষে তপু ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বগুড়া যাওয়ার তারিখ চূড়ান্ত করি। আমার বগুড়া যাওয়ার কথা ঢাকার বন্ধু রাতুল রতনকে বললে, সেও রাজি হয়।

যেভাবে বগুড়ায় : পরিকল্পনা মোতাবেক কোন এক বৃহস্পতিবার আমরা (আমি আর রাতুল) ট্রেনের টিকেট কাটি। যথারীতি, অফিস শেষ করে বাসায় গিয়ে প্রস্তুতি নিয়ে আমরা ট্রেন স্টেশন কমলাপুর যাই। আমাদের ট্রেনের সময় ছিল ১২.৩০ মিনিট। শীতের সময়। বেড়াতে যাচ্ছি। সব কিছু মিলে ভেতরে এক অন্য রকম উত্তেজনা কাজ করছিল। বগুড়া থেকে তপু ভাই বার বার আমাদের খবর নিচ্ছিল। স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষমাণ অবস্থায় হঠাৎ শুনতে পাই, ট্রেন আসতে এক থেকে দুই ঘণ্টা দেরি হতে পারে। দেরির কথা শুনে প্রথমে হোঁচট খেলেও পরে বিষয়টাকে স্বাভাবিক হিসেবেই নেই। কারণ, এসব সমস্যা তো দেশের স্বাভাবিক বিষয়। যদিও ভেতরে একটু চিন্তা হচ্ছিল, নতুন জায়গায় যাচ্ছি। ট্রেন দেরি হওয়াতে গভীর রাতে বগুড়ায় নেমে কোন সমস্যা হবে কিনা এসব ভেবে। তবে, তপু ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে সাহস পাই। কারণ, তপু ভাই বলেন, কোন সমস্যা নেই। যত রাতই হোক সে আমাদের স্টেশন থেকে নিয়ে যাবে।

শুরু হলো ট্রেন ভ্রমণ : ছবি তুলে, স্টেশন ঘুরে দেখে সময় পার করতে করতেই আমাদের ট্রেন চলে আসল। যথারীতি আমরা কেবিনে বসলাম। কেবিনে আরও যারা টিকেট নিয়েছিল, ট্রেন দেরি হওয়ায় তারা না যাওয়াতে আমাদের সুবিধা হলো। চারজনের কেবিনে আমরা দু’জন। আমি ঘুমাতে চেষ্টা করলেও রাতুল কেবিনের জানালা খুলে এই শীতের রাতে ফেসবুক লাইভে আসল। একটু ঘুম, একটু আড্ডা, চা-কফি খাওয়া এসব করেই আমরা চলছি বগুড়ার দিকে। মাঝে মাঝে, তপু ভাই আমাদের আপডেট নিচ্ছে। কুয়াশায় জড়ানো প্রকৃতি দেখছি ট্রেন থেকে। এক স্টেশন পার হয়ে পড়ের স্টেশনের অপেক্ষায় থাকছি। এভাবে চলতে চলতে হঠাৎ অনেক বেশি শীত অনুভব করলাম। রাতুলকে বলছি, এখন এত বেশি শীত লাগছে কেন। রাতুল বলল বগুড়ায় তো বেশি শীত, যা তপু ভাই বলেছিল। তা হলে কি আমরা বগুড়ায় চলে এসেছি। হ্যাঁ, সত্যই তাই। দীর্ঘ ৬-৭ ঘণ্টার ট্রেন ভ্রমণ শেষে আমরা বগুড়া শহরের স্টেশনে পৌঁছে যাই।

বগুড়া শহর দেখা শুরু হলো : যখন বগুড়া স্টেশনে নামি, তখন ভোর ছয়টা। শীতের এত ভোরে স্টেশনে লোকজন নেই বললেই চলে। শুধু ২-১টা চায়ের দোকান খোলা আছে। তখন চায়ের দোকানই আমাদের দরকার ছিল। আমরা স্টেশনে নেমে যথারীতি তপু ভাইকে জানিয়ে দেই। তপু ভাই আসা পর্যন্ত আমরা হালকা নাশতা সেরে নেই। ইতোমধ্যে দেখি তপু ভাই তার গাড়ি নিয়ে চলে এসেছে। ফেসবুকে পরিচিত এক ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে কুশল বিনিময় শেষে আমরা রওনা হই বেড়ানোর উদ্দেশে। কোথায়, কিভাবে যাব তা গাড়িতে বসে পরিকল্পনা করি। পরিকল্পনা মোতাবেক, তপু ভাই প্রথমে আমাদের নাশতা করানোর জন্য একটি ভাল মানের হোটেলে নিয়ে যান। সেখানে বগুড়ার খেজুর গুড়ের মিষ্টি খাই। নাশতা শেষে, আমরা বেড়িয়ে পড়ি মহাস্থানগড়ের দিকে। আগে মহাস্থানগড়ের অবস্থানসহ বিস্তারিত বলে নিচ্ছি।

মহাস্থানগড় : মহাস্থানগড় বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাচীন পুরাকীর্তি। প্রসিদ্ধ এই নগরী ইতিহাসে পুন্ড্রবর্ধন বা পুন্ড্রনগর নামেও পরিচিত ছিল। এক সময় মহাস্থানগড় বাংলাদেশের রাজধানী ছিল। যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও আগে অর্থাৎ প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এখানে সভ্য জনপদ গড়ে উঠেছিল প্রতœতাত্ত্বিকভাবেই তার প্রমাণ মিলেছে। ২০১৬ সালে এটি সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রাচীর বেষ্টিত এই নগরীর ভেতরে রয়েছে বিভিন্ন আমলের প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন। কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এ স্থান পরাক্রমাশালী মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসক বর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ও পরবর্তীকালে হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানী ছিল। তৃতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে পঞ্চদশ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অসংখ্য হিন্দু রাজা ও অন্যান্য ধর্মের রাজারা রাজত্ব করেন। মহাস্থানগড়ের অবস্থান বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায়। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কিমি উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে গেলেই এই শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। মহাস্থানগরে যাওয়ার পথে আমাদের আর এক আমেরিকা প্রবাসী বন্ধু খোন্দকার রবিকে আমরা সঙ্গে নিয়ে যাই। দিনটি শুক্রবার হওয়ায় শহর ছিল ফাঁকা। খুব দ্রুত পৌঁছে যাই মহাস্থানগড়ে। যাওয়ার সময় চোখে পড়ে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটার মুশফিকুর রহমানের বাড়িটি।

দর্শনীয় যে স্থানসমূহ দেখলাম

জিয়ৎ কু- : ঘাটের পশ্চিমে জিয়ৎ কু- নামে একটি বড় কূপ রয়েছে। কথিত আছে, এই কূপের পানি পান করে পরশুরামের আহত সৈন্যরা সুস্থ হয়ে যেত। কূপটির গভীরতা এখন কমিয়ে স্বাভাবিক মাত্রায় আনা হয়েছে।

বেহুলার বাসর ঘর : মহাস্থানগড় বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ২ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি বৌদ্ধ স্তম্ভ রয়েছে যা সম্রাট অশোক নির্মাণ করেছিলেন বলে মনে করা হয়। স্তম্ভের উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট। স্তম্ভের পাশেই রয়েছে একটি চৌবাচ্চাসদৃশ গোসলখানা। এটিই বেহুলার বাসর ঘর হিসেবে পরিচিত। এখানে ঢুকলে বিশ টাকার টিকেট লাগে।

পরশুরামের প্রাসাদ : পরশুরাম প্রাসাদ ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ে সীমানা প্রাচীর বেষ্টনীর ভেতরে যেসব প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কার হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম। স্থানীয়ভাবে এটি তথাকথিত হিন্দু নৃপতি পশুরামের প্যালেস নামে পরিচিত। এই প্রাসাদ জিয়ৎ কূপের পাশেই অবস্থিত।

জাদুঘর : ১৯৬৭ সালে নির্মিত জাদুঘরটি প্রায় ১০ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত। মহাস্থানে খননের ফলে বিভিন্ন মূল্যবান ধাতু, সোনা, রূপা, পোরা মাটির মূর্তি। খোদাই করা ইট, শিলালিপি, ধারাল অস্ত্রসহ প্রাচীন অলঙ্কারসমূহ এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। অন্যান্য প্রতœত্বাত্ত্বিক নির্দেশকও এখানে রাখা আছে।

গোবিন্দ ভিটা : জাদুঘরের পাশেই গোবিন্দ ভিটা অবস্থিত। গোবিন্দ ভিটা শব্দের অর্থ গোবিন্দ তথা বিষ্ণুর আবাস। এ ভিটা একটি খননকৃত প্রতœস্থল, যা ১৯২৮-২৯ সালে খনন করে। যদিও বৈষ্ণব ধর্মের কোন নির্দেশক এ স্থানে পাওয়া যায়নি। তবু এটি গোবিন্ধ ভিটা নামেই পরিচিত।

শীলা দেবীর ঘাট : এটি করতোয়া নদীর তীরে পূর্বপাশে অবস্থিত। শীলা দেবী ছিলেন পরশুরামের বোন। এখানে প্রতি বছর হিন্দুদের স্নান হয় এবং একদিনের মেলা বসে।

বৈরাগীর ভিটা : মহাস্থানগড়ের উত্তর-পূর্ব কোনে রাজা পরশুরামের বাড়ি হতে প্রায় ২০০ গজ দূরে এটি অবস্থিত। এর আয়তন ২৫০ থেকে ৩০০ ফুট।

মাজার শরীফ : ঐতিহাসিক এবং স্থানীয়দের মতে এটি হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী (রা)-এর মাজার। শাহ সুলতান ১৪শ’ শতাব্দীর একজন ইসলাম ধর্ম প্রচারক ছিলেন। ধর্মপ্রাণ হাজারো মুসলিম তাদের নানা সমস্যা সমাধানের মানত করতে ওই মাজারে আসেন। মাজারের গেটেই পাওয়া যায় বগুড়ার খাটি আতপ চালের কটকটি। সময়ের অভাবে আমরা আরও কিছু স্থান দেখতে পারিনি।

সময় থাকলে আরও যা যা দেখতাম : খোদার পাথর ভিটা, মানকালীর ঢিবি, স্কন্ধের ধাপ, মঙালকোট স্তূপ। গোকুল মেধ, ট্যাংরা, বৌদ্ধ স্তূপ, বিহার ধাপ, ভাসু বিহার, ভিমের জঙ্গল, কালীদহ সাগর। অবশেষে যখন আমাদের বেড়ানো শেষ তখন সময় সন্ধ্যা ৭টা। এবার ঢাকায় ফেরার পালা। রাতের খাবার শেষ করে তপু ভাই আমাদের ঢাকার বাসে উঠিয়ে দিলেন এবং সঙ্গে দিয়ে দিলেন, বগুড়ার বিখ্যাত দই ও পায়েশ। বগুড়ার এত সুন্দর একটি ভ্রমণ সম্ভব হয়েছে রবি ও তপু ভাইয়ের আন্তরিকতার জন্য। রবি ভাই এবং তপু ভাইয়ের প্রতি অনেক সম্মান ও ভালবাসা রইল।’