১৮ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভুবনবিখ্যাত গুহাচিত্রের সন্ধানে অজন্তায়

জায়গাটার নাম ‘ভিউ পয়েন্ট’। পাহাড়ী প্রায় সব জায়গাতেই এমন এক একটি ‘ভিউ পয়েন্ট’ থাকে। তাই প্রথমটায় আমাদের গাড়ির চালক যখন বললেন, ফরদাপুর থেকে প্রথমেই আমরা ভিউ পয়েন্টে যাব, তেমন কিছু মনে হয়নি।

অজন্তা দেখতে এসে উঠেছি মহারাষ্ট্র পর্যটন উন্নয়ন নিগমের ফরদাপুর টুরিস্ট রিসোর্টে। সেখান থেকেই আমাদের প্রথম যাত্রা ২৩ কিলোমিটার দূরের ভিউ পয়েন্টের উদ্দেশে। আওরঙ্গাবাদ-জলগাঁও রোড ধরে মিনিট পঁচিশেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম। গিয়ে গাড়ি থেকে নেমেই স্তম্ভিত হয়ে। আধখানা চাঁদের মতো একটা পাহাড়ী বাঁক ওপর থেকে দেখা যাচ্ছে, আর ওই পাহাড়ের গা কেটেই তৈরি হয়েছে অজন্তার ভুবনবিখ্যাত তিরিশটা গুহা। দু’শ’ বছর আগে, ঠিক এই জায়গাটি থেকেই একদল ইংরেজ সেনা-অফিসার শিকার করতে গিয়ে ঘন জঙ্গলের গাছপালার ফাঁক দিয়ে দেখতে পান নদীর ওপারে পাহাড়ের গায়ে সারি সারি খিলান আর স্তম্ভ। আবিষ্কৃত হয় অজন্তা!

সাধারণত এই ‘ভিউ পয়েন্ট’ থেকে অজন্তার গুহার দিকে কম পর্যটকই যান। অজন্তার গুহা-চত্বরে ঢোকার জনপ্রিয় পথ হলো মহারাষ্ট্র পর্যটন উন্নয়ন নিগমের অজিণ্ঠাটি জংশন থেকে চার কিলোমিটার পথ উঠে এক নম্বর গুহার সামনের গেট দিয়ে ঢোকা। এ পথে অজন্তা গুহায় যাওয়ার জন্যই সরকারী বাস চলে সারা দিন। ভাড়া জনপ্রতি কুড়ি টাকা। কিন্তু বাস যেখানে নামিয়ে দেয় সেখান থেকেও সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ে উঠতে হয় অনেকটা। সঙ্গে গাড়ি থাকলে ভিউ পয়েন্ট থেকে নেমে আট নম্বর গুহার সামনের গেট দিয়ে গুহা-চত্বরে ঢোকাই ভাল। নামার জন্য সুন্দর রেলিং দেয়া বাঁধানো সিঁড়ি আছে। বগোড়া নদী পেরোবার জন্য সেতুটিও যথেষ্ট ভাল। আট নম্বর গুহার গেটেও আর্কিয়োলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার টিকেট কাউন্টার আছে।

খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দী, প্রায় নয় শ’ বছর জুড়ে অজন্তার গুহাগুলো তৈরি আর তার ভেতরে ছবি আঁকা হয়েছে। তার পরে প্রায় এগারো শ’ বছর গুহাগুলো ছিল অজ্ঞাতবাসে। যখন দু’শ’ বছর আগে আবিষ্কৃত হলো তখনও প্রায় কুড়িটা গুহার ভেতরে ছবিগুলো অক্ষত ছিল। তার পরে এই দু’শ’ বছরে নষ্ট হতে হতে সংখ্যাটা নেমেছে ছয়ে। তবু যেটুকু আছে তা আজও যেন কথা বলে। মোট তিরিশটা গুহার মধ্যে পাঁচটি (৯, ১০, ১৯, ২৬, ২৯) চৈত্য-গৃহ, বাকি পঁচিশটি সঙ্ঘারাম বা বিহার। বৌদ্ধদের উপাসনার জায়গাকে চৈত্য-গৃহ বলা হয়, থাকার জায়গাকে সঙ্ঘারাম বা বিহার। আর এই গুহাগুলোর ভেতরে দেয়ালের গায়ে, থামের গায়ে আঁকা আছে অসাধারণ সব ম্যুরাল। বেশ কয়েকটি গুহার বাইরে এবং ভেতরে আছে বুদ্ধের নানা মুদ্রার মূর্তি। অনুমান করা হয়, বুদ্ধের মূর্তিগুলো পরবর্তী যুগের, মহাযান বৌদ্ধধর্মের সময়কার। কারণ তার আগের হীনযান পন্থার বৌদ্ধরা মূর্তি পূজায় বিশ্বাস করতেন না।

গুহাগুলোর ক্রমিক নম্বর কিন্তু কেবল দেখার সুবিধার জন্য, গুহানির্মাণের সময়ের সঙ্গে তার কোন যোগ নেই। খ্রিস্টের জন্মের দু’শ’ বছর পূর্ব থেকে দু’শ’ বছর পরে, মোটামুটি এই চার’শ’ বছরে তৈরি হয়েছিল ১০, ৯, ৮, ১২, ১৩, ৩০Ñ এই ছয়টি গুহা। বাকিগুলো পরবর্তী সময়ের। এ কথাটা মনে রাখলে গুহাগুলো দেখতে সুবিধা হবে। যেমন, এক নম্বর গুহাটি অনেক পরের, ৬০০ থেকে ৬৪২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, চালুক্য রাজাদের আমলে তৈরি।

গুহার গায়ের ছবিগুলোর প্রায় সব ক’টি জাতকের কাহিনী নিয়ে। অজন্তা যাওয়ার পরিকল্পনা করার সময়েই তাই জাতকের গল্প পড়তে শুরু করেছিলাম। ছবিগুলো দেখতে দেখতে মনে পড়তে লাগল সেই পড়া গল্পগুলো। যেমন, এক নম্বর গুহার দেয়ালে শঙ্খপাল জাতকের গল্প। তেমনই আরও আছে, মহাজনক জাতক, শিবি জাতক, চম্প্যেয় জাতক। গল্পগুলো না পড়ে গেলে কিন্তু ছবিগুলো দেখার তেমন মানে থাকবে না।

অজন্তার সব ক’টি গুহা খুব ভাল করে দেখতে গেলে অন্তত দু’দিন হাতে রাখা দরকার। সে ক্ষেত্রে ফরদাপুরে না থেকে টি জংশনে থাকাই ভাল। রিসোর্টের প্রায় সামনে থেকে সে ক্ষেত্রে বাস ধরা যাবে গুহায় যাওয়ার জন্য। বাসস্ট্যান্ডের সামনে নানা রকম হস্তশিল্পের বাজারও আছে। অবশ্য দরদস্তুর করতে না পারলে ঠকে যাওয়ার আশঙ্কা। আর একটা কথা, টি জংশনে থাকলে বিকেলের পরেই চারদিক সুনসান হয়ে যাবে, বিশেষ কিছু করার থাকবে না। যদি সব গুহা দেখার সময় না থাকে, অন্তত এই ক’টা দেখতেই হবে ১, ২, ৯, ১০, ১৬, ১৭, ১৯, ২৬।

সূত্র : আনন্দবাজার