১৮ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মধ্যাহ্ন, অপরাহ্ণ!

  • আলী যাকের

পর্ব-৩০

মধ্যাহ্ন, অপরাহ্ণের এই পর্যায়ে এসে মনে হচ্ছে পাঠকদের সঙ্গে, বাংলাদেশে নিয়মিত নাটক প্রদর্শনীর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত আমার কিছু ভ্রমণ বিষয়ক স্মৃতি ভাগ করে নেয়া যেতেই পারে। ’৭৩-এর ৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে প্রথম বারের মতো দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত নাটক মঞ্চায়ন শুরু হয়ে গেল। প্রথম দফায় ব্রিটিশ কাউন্সিল মঞ্চে পর পর আট রবিবার ‘বাকি ইতিহাস’-এর অভিনয় করলাম আমরা। তারপর ব্রিটিশ কাউন্সিলের নিজস্ব কাজের জন্য ওই হলটিকে দরকার হয়েছিল তাদের। আমরা বাধ্য হয়ে নাটকের জন্য নতুন ঘর অন্বেষণে উদ্যোগী হলাম। এই সময় সারা এবং নায়লা কথা প্রসঙ্গে আমাদের জানাল যে বেইলি রোডে বাংলাদেশ মহিলা সমিতির একটি মঞ্চ এবং মিলনায়তন আছে। সেখানে বিশেষ কোন ধরাবাধা অনুষ্ঠান হতো না। অতএব, আমরা নিয়মিত নাটক মঞ্চায়নের জন্য ওই হলটিকে দেখতে পারি। একদিন সকালে আমি এবং আমাদের দলের আরও ক’জন মিলে হলটি দেখতে গেলাম। বোঝা গেল যে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোন অনুষ্ঠান হয়নি। তখন প্রফেসর নীলিমা ইব্রাহীম ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সভানেত্রী। তাঁর সঙ্গে আলাপ করে আমরা আট রবিবার হলটির বরাদ্দ নিয়ে নিলাম। হলটিকে ধোয়া মোছা করে আসন ইত্যাদি জোগাড়-যন্ত্র করে বাংলাদেশে মঞ্চায়িত নিয়মিত নাটক তার নতুন ঠিকানায় পুনর্বাসিত হলো। সেই যে শুরু হয়ে গেল আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আমরা যখন নাটক শুরু করি তখন আমাদের সাধ্য ছিল সীমিত কিন্তু সাধ ছিল সীমাহীন এবং আমি নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে ন্যূনতম বুদ্ধি নিয়ে যদি কেউ কোন কাজে নিজেকে উজাড় করে দিতে প্রস্তুত থাকে তা হলে কোন বাধাই অনতিক্রম্য হতে পারে না। সেই যে পালে হাওয়া লাগল নাটকের এরপর এই শিল্প মাধ্যমটি নিজশক্তিতেই দুর্মর গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে চলল। থিয়েটার, বহুবচন, কথক, ঢাকা থিয়েটার এসব দল এগিয়ে এলো মঞ্চ নাটক নিয়ে। তখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার বাংলা সংস্কৃতির রূপরেখা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হলো এবং তার প্রথম মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োজিত হলেন অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। এই নিয়োগের পর পরই তিনি নাট্যকর্মীদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি বৈঠক করলেন। তিনি স্পষ্টতই আমাদের বুঝিয়ে দিলেন যে সরকার সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সহজাত আগে বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বাসী। তার প্রতিষ্ঠান, শিল্পকলা একাডেমি কেবল সংস্কৃতির চলার পথকে মসৃন রাখতে যেটুকু করা দরকার তাই করবে। প্রসঙ্গক্রমে তখনকার তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দীন ঠাকুর আমাকে তার দফতরে আমন্ত্রণ করে জানতে চেয়েছিলেন তারা আমাদের জন্য কি করতে পারেন। জবাবে আমি বলেছিলাম তারা যদি কিছুই না করেন কেবল আমাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেন তা হলে এ দেশে সাংস্কৃতিক কর্মকা- ফল্গুধারার মতো সামনের দিকে এগিয়ে যাবে এবং শীঘ্রই আমরা সংস্কৃতির উদ্যানে নতুন নতুন ফুল ফোটাতে সক্ষম হবো। তখনকার সরকার আমাদের এই অনুরোধ রেখেছিলেন। নাটকে আমাদের কর্মকা- এতই সর্বব্যাপী হয়ে ওঠে যে আমরা ক্রমেই বিদেশ থেকে নানা রকম সাহায্য সহযোগিতা পেতে শুরু করি। মনে পড়ে তৎকালীন মার্কিন তথ্যকেন্দ্র এবং ব্রিটিশ কাউন্সিল নাট্য বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশে নিয়ে আসার ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করে। আমরা বেশ কয়েকটি নাট্য কর্মশালারও আয়োজন করেছিলাম এই ঢাকা শহরেই, যেখানে তরুণ নাট্যকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। তখনও জার্মানি দুই ভাগে বিভক্ত। কমিউনিস্ট শাসিত পূর্ব জার্মানি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম জার্মানি। জার্মানির প্রধান শহর বার্লিনও দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। পূর্ব বার্লিন এবং পশ্চিম বার্লিন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে টেলিফোনে জানানো হলো যে আমি যেন অবিলম্বে একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের সঙ্গে দেখা করি। সাক্ষাতেই তিনি এক গাল হেসে আমাকে বললেন, ‘জার্মানি যাবে?’ কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। ¯েœহবৎসল শিক্ষক আমাকে বললেন, ‘বসো।’ তারপর চা খেতে বললেন। আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি এরপরে তিনি কি বলবেন, সে জন্য। তিনি বেশ সময় নিয়ে ধীরে ধীরে আমাকে বললেন, ‘তোমাকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে পূর্ব জার্মানির বার্লিনে যাবার জন্য। ওখানে বার্লিন ফেস্টিভ্যালে তুমি যাবে।’ শুনে আমার চোখে পানি চলে এলো। আমি তখন টগবগে তরুণ। এমন এক অপ্রত্যাশিত আমন্ত্রণে ভাবাবেগ স্বভাবতই আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। বার্লিন ফেস্টিভ্যালের নাট্যোৎসবে ওই আমন্ত্রণে আমি গিয়েছিলাম প্রতিনিধি হয়ে আর স্যার গিয়েছিলেন দলনেতা হিসেবে। ব্যস, আমরা দু’জন।

এমন একটা চমকপ্রদ সংবাদে হতভম্ব হয়ে পড়লাম। ওই বয়সে ওই যৎসামান্য কাজের এত বড় স্বীকৃতি কেউ কল্পনা করতে পারে? প্রসঙ্গত বলা ভাল যে, আমি সব সময় মনে করি আমার কাজের জন্য আমার যা প্রাপ্য তার চেয়ে অনেক বেশি আমি পেয়েছি। যাকগে। মুস্তাফা নূরউল ইসলাম স্যারের কাছে ওই সংবাদ পাওয়ার পর আমার মাথায় প্রথম চিন্তা এলো যে, আমার পেশার কাজ ফেলে এক মাস আমি কী করে বাইরে থাকব? আমার বিজ্ঞাপন এজেন্সি, ইস্ট এশিয়াটিক, ওই যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে কেবল হাঁটি হাঁটি পা পা করে চলতে শুরু করেছে। আমার তখনকার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী, আমাদের কোম্পানির প্রধান হিসাবরক্ষক অনুতোষ মজুমদার, আমাকে বললেন, ‘কিচ্ছু ভাববেন না, আমরা সবকিছু সামলাব।’ ভরসা পেয়ে গোজগাছ শুরু করে দিলাম। তখন আমি আমার বড় ভাই এবং ভাবির সঙ্গে থাকতাম। ওঁরাও এই খবরে মহা খুশি। ভাইয়া তার একটা বিশাল সাইজের স্যুটকেস আমাকে দিলেন। আমি তাতে কিছু নিত্য ব্যবহার্য কাপড় চোপড় নিয়ে নিলাম। আমার আনুষ্ঠানিক পোশাক বলতে একটিই স্যুট। সেটি পরে যাব বলে বাইরে রেখেছি।

নির্ধারিত দিনে ভাই, ভাবি এবং পেশা আর নাটকের সহকর্মীদের বিদায় জানিয়ে বিমানবন্দরের দিকে পা বাড়ালাম। পকেটে কেবল কুড়ি পাউন্ডের একটা নোট। আমার দলপ্রধানকে জিজ্ঞেস করলাম, জার্মানিতে হাত খরচের কি হবে? তিনি বললেন, ওরা দেবে বলেছে। নির্ধারিত দিনে একটা কেমন ভূতে পাওয়া মানুষের মতোই ঢাকা এয়ারপোর্টে রওনা হলাম। বন্ধুবর আতাউর রহমান সাগ্রহে তার গাড়িতে করে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিয়েছিল, আজও মনে আছে। বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন অনেকক্ষণ থেকেই। আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, ‘সে কী, তুমি এত দেরি করে এলে?’ বিমান ছাড়ার তখনও দু’আড়াই ঘণ্টা বাকি। অতএব, এত উতলা হওয়ার কী আছে? পরে লক্ষ্য করেছি যে, স্যার সময়ের ব্যাপারে কখনই আপোস করেন না।

আমরা তৎকালীন পূর্ব জার্মানির এয়ারলাইন ’ইন্টারফ্লুগ’-এ ঢাকা থেকে তাসখন্দ যাব, তাসখন্দ থেকে বার্লিন। এই উড়োজাহাজটি বার্লিন থেকে ভিয়েতনামের হোচিমিন নগরীতে যেত তাসখন্দ হয়ে এবং বার্লিনে ফেরত ঢাকা-তাসখন্দ হয়ে। ততদিনে বিশ্বের সর্বত্র সব এয়ারলাইনই প্যাসেঞ্জার জেট চালু করেছে। অতএব, আশা ছিল বিশাল বড় বোয়িং ৭০৭-এ করে বার্লিন যাব। প্লেন দেখে একটু হতাশ হলাম। আকারে বড়, তবে প্রপেলার দিয়ে চলে। চারটা পাখা যন্ত্রদানবের মতো আওয়াজ তুলে ঘুরতে থাকে আর প্লেন তার ওপরে ভর করে সামনে এগিয়ে যায়। মনে আছে বিমানবন্দরের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমি এবং মুস্তাফা স্যার হাত ব্যাগ নিয়ে ঢাকা পুরনো বিমানবন্দর ভবন থেকে বেরিয়ে অন্যান্য যাত্রীদের সাথে পায়ে হেঁটে পৌঁছুলাম প্লেনের সিঁড়ির কাছে। সেখানে ঢাকার দু-একটি পত্রিকার সাংবাদিক এবং ফটোগ্রাফাররা উপস্থিত ছিলেন। প্লেনের পাশে দাঁড়ানো আমার এবং স্যারের কিছু ছবি তোলা হলো। আমরা প্লেনে চড়ে বসলাম। ওই সব ছবি দিয়ে আমাদের জার্মানি ভ্রমণের প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল পরের দিনের পত্রিকায়। তখন অবশ্য সেটা দেখা হয়ে ওঠেনি আমার।

প্লেনে উঠে আমি এবং স্যার পাশাপাশি দুটো আসনে গিয়ে বসলাম। জার্মান এবং ইংরেজী ভাষায় প্লেন ছাড়ার ঘোষণা দেয়া হলো। আমরা সিট বেল্ট বাঁধলাম। দেশের জন্য মনটা যেন কেমন করে উঠল। সেই প্রথম দেশ ছেড়ে চললাম সুদূর ইউরোপে। সবার আগে যে চিন্তাটি মাথায় এলো তা হলো বিমানটি দুর্ঘটনায় পড়তে পারে। আমার প্রিয় মানুষগুলোর মুখ তাহলে আর দেখা হবে না। তারপরে কত শত বার আন্তঃমহাদেশ বিমানে চড়েছি, তার কোন হিসেব নেই। কিন্তু সেই প্রথমবারের মতো রোমাঞ্চ আর কখনও হয়নি।

প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল যে, দেশ ছেড়ে বাইরে যেতে আমার কোন আপত্তি ছিল না কোনকালে। এখনও নেই। তবে, যাবার সময় কিংবা কয়েকদিন বাইরে থাকার পর দেশের জন্য মনটা যেন কেমন করতে থাকে। ফিরে যখন আসি, তখন দেশটিকে নতুনভাবে আবিষ্কার করি যেন। ঢাকা বিমানবন্দরে পা দিয়েই মনটা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। এর আগেও আমি কোথায় যেন লিখেছিলাম, আমি সাধারণত দেশ ছেড়ে বাইরে যাই স্বদেশে ফিরে আসার অপার আনন্দ পাওয়ার জন্য। কিন্তু যেতে হয়। যেতে তো হবেই। নিদেনপক্ষে ফিরে আসার আনন্দটাকে অনুভব করার জন্য।