২২ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ববি’র আন্দোলন জোরদার হচ্ছে ॥ সেশন জটের আশঙ্কা

  ববি’র আন্দোলন জোরদার হচ্ছে ॥ সেশন জটের আশঙ্কা

খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল ॥ ভিসির পদত্যাগের দাবিতে ববি’র শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন দমাতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একইসাথে উপাচার্য ড. এসএম ইমামুল হক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছেন। এতে করে আন্দোলন আরও জোরদার হচ্ছে।

টানা ২৪দিন ধরে শিক্ষার্থীদের এবং পরবর্তীকালে শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা এবং প্রশাসনিক কর্মকান্ড স্থবির হয়ে পরায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন চরম ক্ষতির মুখে পরেছে। আর এতে করে সেশন জটের আশঙ্কা করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। একাধিক শিক্ষার্থীরা জনকন্ঠকে বলেন, ভিসির পদত্যাগের দাবিতে গত ২৪ দিনের আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে অচলাবস্থা চলছে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থী বিশেষ করে দরিদ্র, মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। এসব নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, উপাচার্যের পদত্যাগের দাবির বিষয়টি এখন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একমাত্র দাবিতে পরিনত হয়েছে। উপাচার্য শিক্ষার্থীদের নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন সেটা মোটেও অভিভাবকসুলভ নয়। উপাচার্যের মেয়াদ রয়েছে আগামী ২৭ মে পর্যন্ত। এরপরে তিনি আর ওইপদে নিয়ম অনুযায়ী থাকতে পারবেন না। এই অল্পদিনের জন্য গত ২৪ দিন এবং সামনে আরও দেড় মাস যদি এভাবে পাঠদান ও ক্লাস বন্ধ থাকে তাহলে হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থীকে সেশনজটে পরতে হবে। এছাড়া আন্দোলনের কারণে রুটিন অনুযায়ী যে পরীক্ষাগুলো হওয়ার কথা ছিলো সেগুলোও নেয়া সম্ভব হয়নি। আন্দোলন শেষ হলে নতুন করে আবার রুটিন তৈরি করবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিস, তাতে অনেক সময় চলে যাবে। যেজন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেক সমস্যায় পরতে হবে। এতে নেতিবাচক প্রভাব পরার আশঙ্কা রয়েছে।

শিক্ষাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টির সমাধান করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার হাত থেকে রক্ষা করবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এর আগে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামিম, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ সহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৈঠক করেও বিষয়টির কোন সুরাহা করতে পারেননি।

সূত্রমতে, শিক্ষার্থীদের না জানিয়ে গত ২৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের আয়োজন করার প্রতিবাদ করায় ওইদিনের আরেকটি অনুষ্ঠানে উপাচার্য শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে মন্তব্য করেন। এর প্রতিবাদে গত ২৭ মার্চ থেকে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে শিক্ষার্থীরা ভিসির বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি করে আন্দোলন শুরু করে। ২৮ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ এবং শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শিক্ষার্থীরা ভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ২৯ মার্চ উপাচার্য তার মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেও তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি শিক্ষার্থীরা। তারা ভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এসএম ইমামুল হকের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ২৪দিনের আন্দোলনে তিনবার মহাসড়ক অবরোধ, অবস্থান কর্মসূচি, মানববন্ধন, প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মশাল মিছিল, রক্ত দিয়ে দেয়াল লিখন, ভিসির কুশপুতুল দাহ, প্রতীকী অনশন, কালো কাপড় মুখে বেঁধে, কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন, জেলা প্রশাসনের কার্যালয় ঘেরাওসহ ভিসির পদত্যাগের দাবি করে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বরাবর স্মারকলিপি পেশ করা হয়।

শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের মুখে উপাচার্য ইমামুল হক ১৫ দিনের ছুটির জন্য আবেদন করেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, উপাচার্যর ক্যাম্পাসে ফিরে আসার আর কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাকে ঘটনার পর থেকেই বরিশালে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। তাকে ১৫ দিনের ছুটিতে নয়, হয় তার কর্ম মেয়াদকাল (আগামী ২৮ মে) পর্যন্ত ছুটি নতুবা পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। প্রয়োজনে তারা আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরবেন না বলেও শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন।

শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও কর্মচারীরা আট দফা দাবিতে গত পাঁচদিন ধরে (দুইঘন্টা করে) অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ১৫দিনের ছুটিতে থাকা উপাচার্য ড. এসএম ইমামুল হকের স্বাক্ষরিত গত ১৬ এপ্রিলের এক নোটিশে ব্যাংকের দুটি অ্যাকাউন্ট থেকে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কোনো ধরনের অর্থ না দেয়ার জন্য ব্যাংকের ব্যবস্থাপককে নির্দেশ দেয়া হয়। এমনকি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্থগিতেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজের অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনালী ব্যাংক শাখা থেকে দেয়া হতো। উপাচার্যের এমন নির্দেশের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বেতন-ভাতা তুলতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এ নির্দেশের পর শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও শিক্ষার্থীদের সাথে একত্মতা প্রকাশ করে একমাত্র ভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। এতে করে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবির আন্দোলন আরও বেগবান হয়েছে। ইতোমধ্যে বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ক্যাম্পাসের প্রশাসনিক ভবনের সামনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে একত্রিত হয়ে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর মিয়া বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা এখন এক দাবিতে ঐক্যবদ্ধ। তা হলো উপাচার্যের পদত্যাগ। ভিসি পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে। পদত্যাগ না করলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।