১৯ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জুলিয়ান এ্যাসাঞ্জ

সারা বিশ্বে ঝড় তুলেছিলেন জুলিয়ান এ্যাসাঞ্জ তার প্রতিষ্ঠিত ওয়েবসাইট উইকিলিকসের মাধ্যমে। বিশ্বের মহাক্ষমতাধর কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধান রীতিমতো হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন রাষ্ট্রের অতিগোপনীয় নথি বিশ্ববাসীর সামনে খোলাসা হয়ে যাওয়ায়। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয়। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপরাধের নৃশংসতা, পৃথিবীর দেশে দেশে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের গোপন অনৈতিক তৎপরতা, ভ-ামি ইত্যাদির দালিলিক প্রমাণ পেয়ে সেগুলো বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার নৈতিক তাগিদ বোধ করেছিলেন জুলিয়ান এ্যাসাঞ্জ। সেই নির্ভীক সাংবাদিককে শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের সরকার গ্রেফতার করেছে। শুধু তাই নয়, দেশটির প্রধানমন্ত্রী গৌরবের সঙ্গে বলেছেন, ‘এই গ্রেফতার প্রমাণ করল, যুক্তরাজ্যে কেউ আইনের উর্ধে নয়।’

লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে ২ হাজার ৪৮৭ দিন অন্তরীণ থাকার পর উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান এ্যাসাঞ্জ সম্প্রতি সকালে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তার পক্ষে বিপক্ষে তুমুল আলোচনা চলছে। এ্যাসাঞ্জকে কূটনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিলেন ইকুয়েডরের সাবেক প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরেয়া। এ্যাসাঞ্জের গ্রেফতারের পর তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে টুইটারে লিখেছেন, ‘ইকুয়েডর ও লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের সেরা বিশ্বাসঘাতক ইকুয়েডরের প্রসিডেন্ট লেনিন মোরেনো এ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতার করার জন্য ব্রিটিশ পুলিশকে লন্ডনে আমাদের দূতাবাসে ঢুকতে দিয়েছেন। মোরেনো একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি, কিন্তু এবার তিনি যা করলেন তা এমন এক অপরাধ, যা মানবজাতি কখনো ভুলবে না।’

লন্ডন পুলিশ এ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতার করেছে জামিন লঙ্ঘনের অপরাধে। গ্রেফতারের দিনেই এ্যাসাঞ্জ আদালতে হাজির হতে ব্যর্থতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং তাঁকে যুক্তরাজ্যের কারাগারে ১২ মাস পর্যন্ত থাকতে হতে পারে। একই দিনে লন্ডনের পুলিশ এ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতার দেখিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রত্যর্পণ অনুরোধের (এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট) পরিপ্রেক্ষিতে। এই পদক্ষেপটির ফলে এ্যাসাঞ্জের সামনে এক জটিল ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে; যুক্তরাজ্যে তাঁর জামিন লঙ্ঘনের অপরাধ দৃশ্যত গৌণ হয়ে পড়েছে, মুখ্য হয়ে উঠেছে তাঁর আমেরিকান কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর প্রশ্ন।

প্রসঙ্গত সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা স্ব-স্ব দেশে নানা অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ার পর ইংল্যান্ডে আশ্রয় প্রার্থনা করে জীবন বাঁচিয়েছেন। এদের মধ্যে দ-প্রাপ্ত ব্যক্তিও রয়েছেন। বিএনপি নেতা তারেক রহমানের মতো দাগী অপরাধীদের ব্যাপারে ইংল্যান্ড বিশেষ সক্রিয়তা দেখায় না। অথচ অবাধ তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা গ্রহণকারী একজন সাংবাদিকের ক্ষেত্রে দৃশ্যত দেশটি এমন অবস্থান গ্রহণ করল যা বিশ্ববাসীকে অবাক করেছে।

জুলিয়ান এ্যাসাঞ্জের মা ক্রিশ্চিয়ান এ্যাসাঞ্জের দাবি, ‘থেরেসা মে ব্রেক্সিট থেকে নজর ঘোরাতেই আমার সাহসী, মেধাবী, সাংবাদিক ছেলেকে বেআইনিভাবে, কাপুরুষের মতো গ্রেফতার করাল।’ অন্যদিকে ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্টের উদ্দেশ্যে ক্রিশ্চিয়ানের টুইট এমরকম: ‘লজ্জাজনক! আপনি একজন বিশ্বাসঘাতক! আমার নির্দোষ ছেলের স্বপ্ন আপনার রাতের ঘুম কাড়বে।’

ভয়েস অব আমেরিকা জানিয়েছে, ৪৭ বছরের এই অস্ট্রেলীয় এ্যাক্টিভিস্টের বিরুদ্ধে কম্পিউটার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিপুল পরিমাণ সামরিক ও কূটনৈতিক গোপন নথি ফাঁস করে দেয়ার ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র প্রকাশ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। অবশ্য এই অভিযোগের কথা জানা গিয়েছিল আগেই। জুলিয়ান এ্যাসাঞ্জের গ্রেফতারকে কলঙ্কজনক আখ্যা দিয়েছেন মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক নোম চমস্কি। তিনি বলেছেন, সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করতেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপকে ইতালির ফ্যাসিস্ট মুসোলিনি সরকার কর্তৃক এ্যান্তোনিও গ্রামসিকে কারাগারে নিক্ষেপের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেছেন, তাকে চুপ করিয়ে দেয়াটা ক্ষমতাশালীদের জন্য জরুরী ছিল। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের জোরালো সমালোচনা করেছেন চমস্কি। বিশ্ববাসী দেখার অপেক্ষায় রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিষয়টি নিয়ে কতদূর যায়।