১৯ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর হবে দ. এশিয়ার বৃহত্তম

 বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব  শিল্পনগর হবে  দ. এশিয়ার বৃহত্তম
  • জুলাইয়ে উৎপাদনে যাচ্ছে চীনা প্রতিষ্ঠান;###;৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব

হাসান নাসির, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চট্টগ্রামের মীরসরাই, সীতাকুন্ড ও ফেনীর সোনাগাজীতে বাস্তবায়নাধীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে কারখানা চালুর সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে একটি প্রতিষ্ঠান। চলতি বছরের জুলাই মাসের মধ্যেই উৎপাদনে যাচ্ছে চীনা বিনিয়োগের রফতানিমুখী এই কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি। এ শিল্পনগরে ইতোমধ্যেই দেশী-বিদেশী প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব পেয়েছে বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। বর্তমানে প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। বেজা সূত্রে জানা যায়, দেশে ১০০টি ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ সরকার পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে তন্মধ্যে অগ্রাধিকার হিসেবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর। প্রথমে মীরসরাই ইকোনমিক জোন হিসেবে কার্যক্রম শুরু হলেও এর সঙ্গে সীতাকুন্ড ও ফেনীর সোনাগাজী অর্থনৈতিক অঞ্চল যুক্ত হয়ে বিশাল এলাকাজুড়ে এখন শিল্পনগর প্রতিষ্ঠার কর্মযজ্ঞ। তিনটি জোনকে একসঙ্গে নামকরণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বড়তাকিয়া থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার পশ্চিমে সাগর পাড়ে গড়ে উঠছে সমুদ্রবন্দর, গ্যাস, বিদ্যুতসহ সকল ধরনের সুবিধাসহ বৃহৎ এই শিল্পাঞ্চল।

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বৃহস্পতিবার জনকণ্ঠকে জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে বিনিয়োগের জন্য দেশী-বিদেশী অনেক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। সেখানে অস্থায়ী ভিত্তিতে বেজার কার্যালয় তৈরি হয়েছে। তবে মূল কার্যালয়টি হবে ৮১ হাজার বর্গফুটের। পাঁচতলা বিশিষ্ট এ ভবনের দ্বিতীয়তলা পর্যন্ত এর মধ্যেই উঠে গেছে। কার্যালয় স্থাপিত হওয়ার পর কার্যক্রমেও গতি সঞ্চার হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। চীনের জিন ইয়াং কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ চলতি বছরের জুলাই মাসেই উৎপাদনে যাচ্ছে।

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আরও জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বড়তাকিয়া থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের সড়কের কাজ ভূমি অধিগ্রহণজনিত কারণে কিছুটা বিলম্বিত হলেও সে জটিলতা আর নেই। এক পাশের সড়ক দিয়ে এখনই যানবাহন চলাচল করতে পারছে। চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যে সড়কের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন না হলেও গাড়ি চলাচলের উপযোগী হয়ে যাবে। এই সড়কটির নাম হবে ‘শেখ হাসিনা সড়ক।’ এছাড়া শিল্প নগরীর প্রবেশদ্বার বড় তাকিয়া হওয়ায় বড়তাকিয়া রেল স্টেশনটিও আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ স্টেশনের সুযোগ সুবিধা বাড়াতে ইতোমধ্যেই সমীক্ষার কাজ শেষ হয়েছে। সেখানে যাত্রী সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি নির্মিত হবে পণ্য পরিবহন ও সংরক্ষণের ইয়ার্ড। শিল্পনগর যেন আমদানি রফতানির সহজ সুবিধা লাভ করে সে জন্য ৪০ হাজার টন ক্ষমতার জাহাজ বার্থিং করার মতো সমুদ্রবন্দর নির্মিত হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়, মীরসরাই, সোনাগাজী ও সীতাকুন্ডে প্রায় ৩০ হাজার একর জায়গার ওপর গড়ে উঠছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর। এর মধ্যে ১৬ হাজার একর ভূমি বুঝে নেয়া হয়েছে। প্রায় ৬ হাজার একর জমি বরাদ্দ হয়ে গেছে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীর মাঝে। অভ্যন্তরীণ সড়ক, জলাধার এবং ভূমি ভরাটসহ অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। যে সকল প্রতিষ্ঠান এ শিল্পনগরে বিনিয়োগ করছে তার মধ্যে রয়েছে জাপানের বিখ্যাত নিপ্পন স্টিল, সজিত কর্পোরেশন, ভারতের এশিয়ান পেইন্টস, যুক্তরাজ্যের বার্জার পেইন্টস, চায়না জিনদুন গ্রুপ এবং বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের শিল্পগ্রুপগুলো।

বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীনে এই জোনে ১১৫০ একর জায়গার ওপর গড়ে উঠবে ইপিজেড। প্রায় ৩০ হাজার একর জমিজুড়ে দেশের বৃহত্তম এই অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি সম্পন্ন হলে প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। মীরসরাই সংলগ্ন সীতাকু- ও সোনাগাজী উপজেলা পর্যন্ত এলাকায় এটি হবে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় শিল্পজোন।

চট্টগ্রাম রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের (সিইপিজেড) মহাব্যবস্থাপক খোরশেদ আলম জনকণ্ঠকে জানান, চট্টগ্রাম ইপিজেডে মোট ভূমির পরিমাণ ৪৫৩ একর। মীরসরাইতে ভূমি পাওয়া গেছে প্রায় তিনগুণের কাছাকাছি। সারাদেশের আটটি ইপিজেডের ভূমির পরিমাণ মোট ২৪শ একর। আর শুধু মীরসরাইতে পাওয়া গেছে ১১৫০ একর। এটি হবে বেপজার অধীনে সবচেয়ে বড় শিল্পজোন। তিনি বর্তমানে অনেক বিদেশী বিনিয়োগকারী শিল্প স্থাপনের জন্য ভূমি বরাদ্দ চাইলেও প্রদান করা সম্ভব হচ্ছিল না। মীরসরাইয়ে এতবড় জায়গা পাওয়ায় আমরা বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখতে পারব।

বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর অন্যতম। এটি নির্মিত হচ্ছে সাগর পাড়ে ইছাখালি, চরশরৎ, চর মোশাররফ এবং সাধুর চর এলাকায়। দেশে মোট ১শটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ এগোচ্ছে দ্রুতগতিতে। ইতোমধ্যে অনেক বিনিয়োগকারীকে ভূমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ভরাট হওয়া ভূমিতে স্টিল স্ট্রাকচারে শিল্পের স্থাপনা গড়ার কাজও শুরু হয়েছে।

শিল্পনগর বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে মীরসরাই, সীতাকু- ও সোনাগাজীর সমুদ্র উপকূলে চলছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। চরাঞ্চলে নেমেছে এস্কেভেটর এবং উন্নতমানের যন্ত্রপাতি। শিল্পের জন্য বিদ্যুত, গ্যাস এবং পানি সরবরাহের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। এই শিল্পাঞ্চলকে সেবা দেয়ার লক্ষ্যে মীরসরাই এবং সীতাকু-ের মাঝামাঝি এলাকায় নির্মিত হবে মাঝারি আকারের একটি বন্দর। এছাড়া ছোটখাটো একটি বিমানবন্দরও নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

মীরসরাইয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল যতই দৃশ্যমান হচ্ছে ততই এলাকাবাসী আশায় বুক বাঁধছে উন্নত জীবযাত্রার। যুবকরা আশায় রয়েছে কর্মসংস্থানের। প্রাথমিকভাবে ৫ লাখ কর্মসংস্থানের টার্গেট থাকলেও অর্থনৈতিক অঞ্চল যদি ৩০ হাজার একরে সম্প্রসারিত করা যায় তাহলে সেখানে কমপক্ষে ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। ফলে দেশের অন্যান্য জেলার মানুষও এই জোনে কর্মসংস্থান ও জীবিকার সুযোগ পাবে। অবহেলিত এক চরাঞ্চল পরিণত হচ্ছে শিল্পাঞ্চলে। স্থানীয়রাও এত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মচারীর আবাসনের কথা চিন্তা করে গড়ে তুলছে নানা ধরনের বাড়িঘর।