২০ এপ্রিল ২০১৯

মোহামেডানের লজ্জার হার

রুমেল খান ॥ মোহামেডান হেরেছে, এটা এখন আর নতুন কোন চমক সৃষ্টিকারী খবর নয়। বরং তারা জিতলেই এটা হবে তাক লাগানো সমাচার। হ্যাঁ, হাস্যকর হলেও এটাই বাস্তবতা। শুক্রবার এমনই আরেকটি বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই ফুটবল ক্লাবটি। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের ৭৬ নম্বর খেলায় তাদের ২-১ গোলে তাদের হাড়ে হাড়ে বাস্তবতা টের পাইয়ে দিয়েছে রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটি। ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে মোহামেডানের জন্য হারটি খুবই যাতনার, কেননা এই ম্যাচে একটি পেনাল্টি মিস করে তারা। তা না হলে অন্তত ড্র করে ‘মহামূল্যবান’ একটি পয়েন্ট পেতে পারতো তারা যা তাদের লীগে অবনমন এড়াতে অনেক কাজে লাগতো। কিন্তু তা আর হলো কই? সৈয়দ গোলাম জিলানীর কৌশলের কাছে মার খেয়ে গেলেন শন লেন। মোহামেডানের নতুন এই ইংলিশ বংশোদ্ভূত ৫৫ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ান কোচ এখন জয়ের ‘হালখাতা’ই খুলতে পারলেন না। এ নিয়ে তিন ম্যাচে ডাগআউটে দাঁড়িয়েছেন। হেরেছেন দুটিতেই, একটিতে ড্র।

মোহামেডানের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আছে- তারা কোচ ধরে রাখতে পারে না, পারিশ্রমিক নিয়ে ঝামেলা করে এবং ম্যানেজারের নেতৃত্বে একটি ‘সিন্ডিকেট’ দল নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে। এ কারণে চলতি মৌসুমে তাদের ছেড়ে গেছেন দু’জন কোচ। এরা হলেন- ইংল্যান্ডের ক্রিস্টোফার ইভান্স এবং বাংলাদেশের আলী আসগর নাসির। এখন দৃশ্যপটে এসেছেন শন লেন। প্রশ্ন হচ্ছে- তিনি কি পারবেন মোহামেডানকে এবারের লীগে পতনের মুখ থেকে বাঁচাতে? লক্ষণ তো খুব একটা সুবিধের মনে হচ্ছে না।

আজব একটা দলই বটে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। এক সময় তারা একের পর এক শিরোপা জিততো। আর এখন তারা একের পর এক ম্যাচ হারে। তাজ্জব ব্যাপার হচ্ছে- হারার পর ক্লাব কর্তাদের কোন বোধোদয় হয় না। দিনের পর দিন যে ক্লাবটি রসাতলে যাচ্ছে সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপই নেই তাদের। তারা ব্যস্ত নিজেদের গদি নিয়ে আর টাকা-পয়সা নিয়ে। ভাবতে অবাক লাগে= ৮৩ বছরের পুরনো যে ক্লাবটি ৩৭টি শিরোপা জিতেছে, যারা পাকিস্তান-বাংলাদেশ আমল সব ধরনের লীগ মিলিয়ে সর্বাধিক ১৯ বারের চ্যাম্পিয়ন, সেই ‘ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট’ খ্যাত মোহামেডান আজ ক্ষয়িষ্ণু এক ফুটবল দল। তারা এখন আর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য দল গড়ে না। দল গড়ে লীগে রেলিগেশন এড়াতে। সর্বাধিক লীগ চ্যাম্পিয়ন হলেও পেশাদার লীগ শুরু হওয়ার পর এখনও তারা একটিও শিরোপা জেতেনি (১০ লীগের মধ্যে)! সর্বশেষ লীগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সেই ১৭ বছর আগে, ২০০২ সালে। ২০১৬ প্রিমিয়ার লীগে অল্পের জন্য অবনমিত হয়নি তারা। ১২ দলের মধ্যে দশম হয়ে কোনমতে ইজ্জত রক্ষা করেছিল। চলতি লীগেও একই করুণ দশা তাদের।

ক’দিন আগে লীগে টানা তিন ম্যাচ হারের পর ড্র করেছিল মোহামেডান। শুক্রবার পুরনো ঢাকার ক্লাব এবং ১৯৭৭ লীগের রানার্সআপধারী রহমতগঞ্জের কাছে হেরে আবারও হারের বৃত্তে ঢুকে পড়লো তারা। ক্রমাগত হারার কারণে এখন আর হারের জ্বালা অনুভূত হয় না মোহামেডানের কর্তাদের। এই যেমন শুক্রবারের হারের পর মাঠ ছেড়ে যাবার সময় তাদের ‘বিশিষ্ট’ ম্যানেজার আমিরুল ইসলাম বাবুর মুখে দেখা গেল একগাল হাসি। মনে হচ্ছিল হার নয়, জিতে গেছে মোহামেডান। একই অবস্থা খেলোয়াড়দের। ম্যাচ শেষে ড্রেসিং রুমে ফিরে যাবার সময় গ্যালারিতে উপস্থিত মোহামেডানের ক্ষিপ্ত সমর্থকদের গালিগালাজ যেন কানেই ঢোকেনি তাদের। একেবারেই যেন গ-ারের চামড়া। নির্বিকার চিত্তে, রোবটের মতো হেলেদুলে ছাড়লেন মাঠ।

নিজেদের দ্বাদশ ম্যাচে এটা মোহামেডানের অষ্টম হার। আগের ‘সবেধন নীলমণি’ এক জয় ও তিন ড্রয়ে ৬ পয়েন্ট তাদের। পয়েন্ট টেবিলে তাদের অবস্থানটাও ‘দারুণ’, ১৩ দলের মধ্যে একাদশ। পক্ষান্তরে ‘আইলো’, ‘ডাইলপট্টি’ এবং ‘জায়ান্ট কিলার’ খ্যাত রহমতগঞ্জের সমান ম্যাচে এটা দ্বিতীয় জয়। আগের ৬ ড্রয়ে ১২ পয়েন্ট নিয়ে তা আছে মোহামেডানের দু’ধাপ ওপরে, অর্থাৎ নবম স্থানে।

খেলার শুরুতে রহমতগঞ্জ খেলে ৪-১-৪-১ এবং মোহামেডান ৪-৩-৩ ফর্মেশনে। রক্ষণাত্মক ফর্মেশন বেছে নিলেও ৪ মিনিটে গোল করে এগিয়ে যায় রহমতগঞ্জই। প্রায় মাঝমাঠ থেকে কঙ্গো ফরোয়ার্ড সিও জুনাপিও লম্বা পাস দেন সতীর্থ মিডফিল্ডার ফয়সাল আহমেদকে। বল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার সময় তাকে আটকাতে পারেননি মোহামেডানের দুই রক্ষণভাগের খেলোয়াড়। প্র্রতিপক্ষ গোলরক্ষক সারোয়ার জাহান পোস্ট ছেড়ে অনেকটাই এগিয়ে এসেছিলেন। ফলে গোলপোস্ট অনেকটাই ফাঁকা ছিল। সেটা বুঝেই বলটা পোস্টে ঠেলে দিয়ে দলকে আনন্দের উপলক্ষ এনে দেন ফয়সাল (১-০)।

১১ মিনিটে সমতা ফেরায় মোহামেডান। কর্নার পায় তারা। কর্নারের উড়ন্ত বল বক্সে হেড করেন নাইজিরিয়ান ফরোয়ার্ড এনকোচা কিংসলে চিগুজি। সেই হেডের বল রহমতগঞ্জের ডিফেন্ডারের মাথায় লেগে বল পেছনে চলে আসে। ডি-বক্সের মাথায় সেখানে ছিলেন রহমতগঞ্জের মিডফিল্ডার হাবিবুর রহমান সোহাগ। সেই উড়ন্ত বলটিকে বাঁ পায়ের বুলেট শটে চমৎকার ভলিতে জালে পাঠান তিনি (১-১)। মোহামেডান গোলরক্ষক ঝাঁপিয়ে পড়েও সেই বলের নাগাল পাননি। অনেকেই বলছেন, গোলটি ছিল বেশ উঁচুমানের।

৫৬ মিনিটে পেনাল্টি পায় সাদা-কালোরা। কর্নার পায় তারা। বক্সের ভেতরে জটলার মধ্যে মোহামেডানের

কিংসলেকে ফাউল করে ফেলে দেন রহমতগঞ্জের নাইজিরিয়ান মিডফিল্ডার ড্যামিয়েন চিগুজি। রেফারি সুজিত ব্যানার্জী ড্যামিয়েনকে হলুদ কার্ড এবং পেনাল্টির নির্দেশ দেন। কিন্তু ভিডিও রিপ্লেতে দেখা গেছে কিংসলে পড়ে যাবার ভান করেছেন, ড্যামিয়েন তাকে স্পর্শই করেননি। কিন্তু তারপর উপহার পাওয়া এই পেনাল্টিরও সুবিধা নিতে পারেনি মোহামেডান। কিংসলের ডান পায়ের শটটি বারপোস্ট ঘেঁষে চলে যায় মাঠের বাইরে। রহমতগঞ্জের এক রসিক সমর্থক ম্যাচ শেষে এ নিয়ে মন্তব্য করেন, ‘অন্যায় পেনাল্টি পেয়েও ওরা গোল করতে পারে নাই। এইটা হইলো গিয়া আল্লাহ্র উচিত বিচার।’ ৭০ মিনিটে বাঁপ্রান্ত থেকে মিডফিল্ডার কায়সার আল রাব্বির শট বারে লেগে ফেরত আসায় নিশ্চিত গোলবঞ্চিত হয় মোহামেডান। ৭৪ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে রহমতগঞ্জ। ডানপ্রান্ত দিয়ে বক্সের সামান্য বাইরে থেকে ডান পায়ের উড়ন্ত ক্রস করেন ফরোয়ার্ড সোহেল রানা। পেনাল্টি বক্সের ভেতরে পৌঁছে যাওয়া ও আনমার্কড সিও জুনাপিও’র চমৎকার হেড ফেরানোর কোন উপায় জানা ছিল না মোহামেডানের গোলরক্ষকের (২-১)।

শেষ পর্যন্ত অনেক চেষ্টাতেও আর গোল শোধ করতে পারেনি মোহামেডান। যথারীতি আরেকটি হারের স্বাদ নিয়ে মাঠ ছাড়ে তারা। গোপালগঞ্জে সাইফ হারাল মুক্তিযোদ্ধাকে ॥ একইদিনে গোপালগঞ্জের শেখ ফজলুল হক মনি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত নিজেদের হোম ম্যাচে সাইফ স্পোর্টিংয়ের কাছে ২-০ গোলে হেরেছে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র।

৫৮ মিনিটে মোহাম্মদ রাফির পাসে গোল করে সাইফকে এগিয়ে দেন রাশিয়ান মিডফিল্ডার দেনিস বলশাভক (১-০)। ৫২ মিনিটে মিডফিল্ডার জাভেদ খান যে গোলটি করেন তার বলের এ্যাসিস্ট করেন সেই বলশাভকই (২-০)।

১২ ম্যাচে মোট ২৩ পয়েন্ট সংগ্রহ করেছে সাইফ স্পোর্টিং। কিন্তু টেবিলে নিজেদের পূর্বের চতুর্থ স্থানেই থাকল তারা। কারণ ২৪ পয়েন্ট নিয়ে শেখ রাসেল আছে তৃতীয় স্থানে। ১৫ পয়েন্ট নিয়ে ষষ্ঠ স্থানে মুক্তিযোদ্ধা।