২০ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বাধীনতা ও মুজিব বাহিনী

  • মোস্তাফা জব্বার

॥ চার ॥

বঙ্গবন্ধুর সৈনিক যুবনেতাদের সম্পর্কে উবানের ধারণা ছিল অত্যন্ত উঁচু। বিএলএফের প্রধান দুই নেতা সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। শেখ ফজলুল হক মণি সম্পর্কে তিনি বলছেন- ‘হালকা-পাতলা গড়নের মানুষটি যেন এক জ্বলন্ত মশাল। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাভাবিক নেতা বলে মনে হতো তাঁকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন এবং যে কোন আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত ছিলেন তিনি। তোফায়েল ও রাজ্জাক তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। সিরাজও তা করতেন, কিন্তু মাত্র অল্প পরিমাণে। প্রায়ই আলোচনা গরম হয়ে উঠত। সিরাজ অপেক্ষা করতে চাইতেন না। কিন্তু সব সময় তাঁরা একটা টিম হয়ে কাজ করতেন এবং যৌথ নেতৃত্বের ভাল উদাহরণ তুলে ধরতেন। তিনি র‌্যাডিকেল ধ্যানধারণা পোষণ করতেন। আপোসহীন মনোভাবের ছিলেন। যুদ্ধ করতেন বাঘের মতো। কাজ করতেন নিবেদিতপ্রাণ ক্রীতদাসের মতো। একসঙ্গে অনেকদিন তিনি না খেয়ে না ঘুমিয়ে শুধু চায়ের ওপর থাকতে পারতেন। বক্তৃতা দিতে তিনি পছন্দ করতেন না। কথা এমন বলতেন যে, বোঝা যেত তিনি কাজের লোক, কথার নয়। তৃণমূল কর্মীর মতো তিনি কথা বলতেন। তিনি প্রচার অপছন্দ করতেন। মুখ বুজে কাজ করে যেতে চাইতেন। চিরকুমার। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার ধরন ছিল আক্রমণাত্মক। তিনি এমন মানুষ যাঁকে ভালবাসতে হয়। তিনি আত্মোৎসর্গের প্রতীক। আমার শুধু এই ভয়ই ছিল যে দারিদ্র্যমুক্তির পথের ধীরগতিতে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারবেন না এবং হয়ত রূঢ় ও অগ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে অপ্রিয় হয়ে যাবেন। সিরাজুল আলম খানের স্বাধীনতা উত্তর রাজনীতি অবশ্যই আলোচনার বিষয় হিসেবে এখনও ব্যাপক আগ্রহের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। যুদ্ধোত্তরকালে তিনি ছাত্রলীগের সেরা ও মেধাবী মানুষগুলোকে কেন বঙ্গবন্ধু থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন, জাসদ গঠন করেছিলেন, কেন সিপাহী বিপ্লব সংঘটিত করেছিলেন এবং এখনও কোন রহস্যময় ভূমিকা পালন করছেন তা আলোচনার অপেক্ষা রাখে। তার শিষ্যরা-রব, সিরাজ, ইনু যে রাজনৈতিক মেরুকরণকে বহন করছেন তারাই বা কি ভাবছেন তা স্পষ্ট নয়। ফলে মুজিববাহিনীর স্বাধীনতা উত্তর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। জেনেছি সম্প্রতি তার জবানীতে শামসুদ্দিন আহমদের একটি বই বাজারে এসেছে। বইটি পেলে আরও বিস্তারিত কিছু লিখতে পারব।

মহিউদ্দিন আহমদ তার বইতে লিখেছেন, ‘বিএলএফের (তখনও মুজিব বাহিনী নামকরণ হয়নি) প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছিল উবানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের (এসএফএল) একদল প্রশিক্ষকের হাতে। এর দুটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র ছিল, একটা দেরাদুনের চাকরাতা, অন্যটি অসমের হাফলং। প্রশিক্ষণার্থী বাছাই করার জন্য চারটি ট্রানজিট ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এগুলোর অবস্থান ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য ব্যারাকপুর। আঞ্চলিক অধিনায়ক ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তাঁর সহকারী ছিলেন নূরে আলম জিকু। উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের ট্রানজিট ক্যাম্প ছিল জলপাইগুড়ির কাছে পাংগা নামক স্থানে। এই অঞ্চলের অধিনায়ক ছিলেন সিরাজুল আলম খান। তাঁর সহকারী ছিলেন মনিরুল ইসলাম (বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি মার্শাল মনি নামে পরিচিত ছিলেন)। মধ্যাঞ্চলের ক্যাম্প ছিল মেঘালয়ের তুরা শহরে। এই অঞ্চলের অধিনায়ক ছিলেন আবদুর রাজ্জাক। তাঁর সহকারী ছিলেন সৈয়দ আহমদ। পূর্বাঞ্চলের (ঢাকাসহ) ক্যাম্প ছিল আগরতলায়। এই অঞ্চলের অধিনায়ক ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি। সহকারী ছিলেন আসম আব্দুর রব। কাজী আরেফ ছিলেন বিএলএফের গোয়েন্দা-প্রধান। বিএলএফের পক্ষ থেকে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার কাজটি করতেন শাজাহান সিরাজ। চার যুবনেতা নিজেদের নতুন নামকরণ করলেন। তাঁরা নতুন নামেই অনেক জায়গায় নিজেদের পরিচয় দিতেন। নামগুলো সংক্ষেপে ছিল মনো (মনি), সরোজ (সিরাজ), রাজু (রাজ্জাক) ও তপন (তোফায়েল)। বিএলএফের চার আঞ্চলিক অধিনায়ককে লে. জেনারেল মর্যাদা ও প্রটোকল দেয়া হয়েছিল।

প্রশিক্ষণার্থী বাছাই করা হতো মূলত ছাত্রলীগের সদস্যদের মধ্য থেকে। এছাড়া শ্রমিক লীগের অনেক সদস্যকেও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজটি শুরু হয় মে মাসের শেষ সপ্তাহে এবং তা একটানা চলে অক্টোবর পর্যন্ত। প্রশিক্ষণ ছিল ছয় সপ্তাহের। প্রশিক্ষণে হালকা ও মাঝারি অস্ত্র চালনা, বিস্ফোরক তৈরি ও পরিকল্পনা- এই তিনটি বিষয়েই গুরুত্ব দেয়া হয়। মোট কতজন প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন, তার সঠিক হিসাব জানা যায়নি। উবানের হিসাবমতে সংখ্যাটি ১০ হাজার। প্রকৃত সংখ্যাটি ছিল সাত হাজার। নির্দেশ ছিল, প্রশিক্ষণ শেষে দেশের ভেতরে গিয়ে প্রত্যেক সদস্য আরও ১০ জনকে প্রশিক্ষণ দেবেন এবং এভাবেই ৭০ হাজার সদস্যের একটি যোদ্ধা বাহিনী গড়ে উঠবে। দেশের ভেতরে গিয়ে ছাত্রলীগের কর্মীদের খুঁজে বের করা, চারটি বেইস ক্যাম্প চালানো, প্রশিক্ষণার্থীদের বেইস ক্যাম্পে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদির খরচ মেটানোর জন্য ৭৬ লাখ টাকার একটা বাজেট তৈরি করে উবানের হাতে দেয়া হয়। বরাদ্দ হয়েছিল ৭০ লাখের কিছু বেশি। কয়েক কিস্তিতে টাকাটা দেয়া হয়।

অস্ত্র চালনার পাশাপাশি রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছিল। ছাত্রলীগের চারজন নেতাকে প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়মিত রাজনৈতিক পাঠ দেয়ার জন্য বাছাই করা হয়। তাঁরা হলেনÑ হাসানুল হক ইনু, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, আফম মাহবুবুল হক ও মাসুদ আহমেদ রুমি। তাঁরা সবাই ছিলেন সিরাজপন্থী।

আওয়ামী লীগের নেতারা প্রথাগত সরকার-পদ্ধতির বাইরে অন্য কিছু ভাবার অবকাশ পাননি। তাঁদের অনেকেই মনে করতেন, দলের মধ্যকার ‘চরমপন্থী যুবকদের হঠকারী কার্যকলাপের’ ফলেই তাঁদের ভারতের মাটিতে এত কষ্ট করতে হচ্ছে। এ জন্য তাঁরা বিএলএফের ব্যাপারে খুবই ক্ষুব্ধ ছিলেন। সেক্টর কমান্ডাররা, যাঁরা অস্থায়ী সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন, বিএলএফের ব্যাপারে তাঁদেরও অনেক ক্ষোভ ছিল। তাঁরা যুবকদের জন্য যাঁর যাঁর সেক্টরে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের হাতে সম্পদ ছিল অপ্রতুল। অন্যান্য অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা ছিল না বললেই চলে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা পাঁচ-ছয় দিনের একটা মামুলি প্রশিক্ষণের পর তরুণদের নামমাত্র অস্ত্র দিয়ে দেশের ভেতরে পাঠিয়ে দিতেন। তাঁরা চেয়েছিলেন বিএলএফ আলাদা বাহিনী হিসেবে না থেকে তাঁদের কমান্ডে থাকুক। তাঁরা এটা বুঝতে অক্ষম ছিলেন যে বিএলএফ প্রথাগত সেনাবাহিনী নয়, এটা একটা রাজনৈতিক সংগঠন। তাজউদ্দীন বিএলএফের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। কিন্তু তিনি না পারতেন এদের তাঁর নিয়ন্ত্রণে আনতে, না পারতেন এদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে। তিনি ভাল করেই জানতেন, বিএলএফ ছিল শেখ মুজিবের নির্দেশিত একটি ‘অপশন’।

মুজিব বাহিনী প্রসঙ্গে আলাপচারিতায় আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন- ১৮ ফেব্রুয়ারি ৭১ বঙ্গবন্ধু আমাদের চারজন- মণি ভাই, সিরাজ ভাই, আমি আর তোফায়েলকে ডাকলেন। ব্রিফিং দিলেন- ‘ওরা আমাদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেবে না, তোমার প্রস্তুতি সংঘবদ্ধ কর, সশস্ত্র বিপ্লব করে দেশ স্বাধীন করতে হবে।’ তাজউদ্দীন ভাই একা উপস্থিত ছিলেন। আরও বললেন, ‘আমি না থাকলে এই তাজউদ্দীন হবে তোমাদের নেতা।’

মহিউদ্দিন আহমদ তার বইতে মুজিব বাহিনী সম্পর্কে বেশ কিছু মন্তব্য করেছেন। বিশেষ করে মুজিব বাহিনী গঠন ও তার কার্যক্রম নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বিবেচিত হতে পারে। তার মতে, ভুল বোঝাবুঝির জন্য মুজিব বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর মাঝে বেশ কয়েক স্থানে সংঘাত হয়। বিশেষ করে তিনি ২ নম্বর সেক্টরের কথা উল্লেখ করেছেন।

মহিউদ্দিন মনে করেন শেখ মণি তাজউদ্দীন ও খালেদ মোশাররফ উভয়ের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তাঁর অভিযোগ ছিল, খালেদ তাঁর সেক্টরে বামপন্থী ছাত্রদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিচ্ছেন। দেশের অন্য তিনটি অঞ্চলে এ ধরনের কোন সংঘাত ছিল না। সেসব অঞ্চলে তাঁরা সবাই পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ করতেন। দেখা গেছে, অনেক জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান নেতা ছিলেন বিএলএফের কমান্ডার। খুলনা, যশোর, বগুড়া, রংপুর- এসব জেলায় বিএলএফের জেলা ও মহকুমা কমান্ডাররা সব মুক্তিযোদ্ধারাই নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেসব জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কোন বিভাজন ছিল না।

২ নম্বর সেক্টরে ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিনের বাহিনীর সঙ্গে বিএলএফের একটি দলের সংঘর্ষ হয়েছিল। বিষয়টি সুরাহা করার জন্য আওয়ামী লীগের নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী আইনউদ্দিনের কাছে গেলে তিনি বাংলাদেশ সরকারের একটা চিঠি দেখান। চিঠিতে লেখা ছিল, ‘আমাদের সরকারী বাহিনীর অনুমতি ছাড়া কেউই সশস্ত্র অবস্থায় দেশের ভেতরে যেতে পারবে না। এ ব্যাপারে উবানের সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক লে. জেনারেল অরোরার কথা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, সীমান্তের ভেতরে ২০ মাইল পর্যন্ত এলাকায় মুক্তিবাহিনী কার্যকর থাকবে এবং বিএলএফ দেশের অভ্যন্তরে দায়িত্ব পালন করবে। দেশের ভেতরে যাতায়াতের জন্য সীমান্তে বিএলএফের সদস্যরা নির্দিষ্ট কয়েকটা করিডর ব্যবহার করবেন।

বামপন্থীদের ব্যাপারে প্রবাসী সরকারের উৎকণ্ঠা ছিল। বামপন্থীদের অভিযোগ ছিল, বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ক্ষেত্রে বামপন্থী, বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। বিএলএফের নেতারাও সতর্ক ছিলেন, যাতে বামপন্থীরা ভাতরীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র না পায়।’

ঢাকা, ২৬ মার্চ ১৯, আপডেট ১৭ এপ্রিল ১৯ ॥

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান-সম্পাদক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার-এর জনক