২০ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ পবিত্র শব-ই-বরাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য মুক্তির রাত নিষ্কৃতির রাত

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

রাত, দিন, কাল সবই আল্লাহর সৃষ্টি। কিন্তু কতকগুলো দিবস, কতকগুলো রজনীকে খাস মরতবায় ভূষিত করা হয়েছে খাস ফজিলত ও বরকতের কারণে। বিশ্ব মুসলিম মননে যে রাতগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, শব-ই-মেরাজ, শব-ই-কদর, দুই ঈদের রাত, জুমার রাত, হজ পালনকালে ১০ জিলহজ মুজদালিফায় অবস্থান করার রাত এবং শব-ই-বরাত। আরবীতে শব-ই-বরাতকে বলা হয় লাইলাতুল বরাত অর্থাৎ নিষ্কৃতির রাত, মুক্তির রাত। এ রাতে সুযোগ আসে গুনাহ থেকে মুক্তি পাবার, বিপদ-আপদ থেকে নিষ্কৃতি পাবার। ফারসীতে একে শব-ই-বরাত বলা হয়েছে এ কারণে যে, এ রাতে সৌভাগ্য অর্জনের সুযোগ আসে। আর এসব সুযোগ আসে সারা রাত জেগে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর মহান দরবারে গুনাহ মাফ করে দেয়ার জন্য কান্নাকাটি করা, বিপদ-আপদ, বালা মসিবত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য দোয়া খায়ের করা, আল্লাহর খাস বান্দা এবং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লামের খাস উম্মত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জনের তাওফিক ইনায়েত করার জন্য আল্লাহর মহান দরবারে মোনাজাত করা, সেই সঙ্গে এটাও কামনা করা হে আল্লাহ, দেশের শান্তি দাও, সমৃদ্ধি দাও, ঐক্য ও সংহতি দাও, বিশ্ব মুসলিমের ওপর থেকে সকল বিপদ ও অপশক্তির কালো থাবা দূর করে দাও, বিশ্বে শান্তি দাও।

কুরআন মজিদের সূরা দুখানের ৩ থেকে ৫ নম্বর আয়াতে কারিমায় একটি মুবারক রাতের উল্লেখ করে সেই রাতের মাহাত্ম্য তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : আমি তা নাজিল করেছি এক মুবারক রাতে, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এই রাতে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমার আদেশক্রমে নির্ধারিত হয়।

কয়েকখানি বহুল প্রচলিত হাদিস শরীফে লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান অর্থাৎ মধ্য শাবানের রাতের বৈশিষ্ট্য মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে যে সমস্ত কথা বলা হয়েছে তার সঙ্গে সূরা দুখানের ওই মুবারক রাতের বৈশিষ্ট্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সূরা দুখানে যে গুরুত্বপূর্ণ তথা প্রজ্ঞাময় বিষয়াদি নির্ধারণের রাত হিসেবে লাইলাতুল মুবারাকার উল্লেখ আছে তাতে হাদিস শরীফে বর্ণিত মধ্য শাবানের রাতের বৈশিষ্ট্যই প্রস্ফুটিত হয়েছে। মধ্য শাবানের এ রাতের মাহাত্ম্য সম্পর্কে বেশ কয়েকখানি হাদিস রয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন যে, মধ্য শাবানের রাতে হযরত জিবরাঈল ‘আলায়হিস সালাম আমাকে বললেন : আপনার মাথা আকাশের দিকে তুলুন, কেননা এ রাত অত্যন্ত প্রাচুর্যম-িত। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম : এতে কোন্ ধরনের প্রাচুর্য (বরকত) রয়েছে? উত্তরে হযরত জিবরাঈল ‘আলায়হিস সালাম বললেন : এই রাতে আল্লাহ্্ তায়ালা রহমতের তিন শ’ দরজা খুলে দেন। অন্য একখানি হাদিসে আছে যে, মধ্য শাবানের রাতে সূচনা হলেই পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমান থেকে আল্লাহ জাল্লা শানুহু ঘোষণা করতে থাকেন, এমনকি কেউ আছ যে আমার কাছে ক্ষমা চাও? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব, এমনকি কেউ আছ যে আমার কাছে বিপদ থেকে মুক্তি পেতে চাও? আমি তার সমস্ত বিপদ-আপদ দূর করে দেব, এমনকি কেউ আছ যে আমার কাছে রিযিক চাও? আমি তাকে অঢেল রিযিক দান করব। এমনকি কেউ আছ? এমনকি কেউ আছ? এমনকি কেউ আছ? এমনিভাবে সেই আহ্বান ফজর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

এই হাদিস শরীফ থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, শব-ই-বরাত হচ্ছে আল্লাহর কাছে বিশেষভাবে কোন কিছু চাওয়ার রাত। এ রাতে কায়মনোবাক্যে আল্লাহ্র কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ তা পূরণ করে দেন।

এই রাতে খাসভাবে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মদিনার বিখ্যাত কবরগাহ জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে কবর জিয়ারত করতেন। এক মধ্য শাবানের রাতে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হযরত ‘আয়িশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহার হুজরা শরীফে প্রবেশ করে কোন দিকে নজর না দিয়ে সোজা জায়নামাজে গিয়ে নফল সালাত আদায় করে সিজদায় পড়ে উম্মতের গুনাহখাতা মাফ করে দেয়ার জন্য আল্লাহর মহান দরবারে কাঁদতে লাগলেন। হযরত ‘আয়িশা রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহা ভাবলেন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বোধহয় তার প্রতি নাখোশ হয়েছেন। তিনি তাই অত্যন্ত নম্রস্বরে বললেন : হে আল্লাহর রসূল! আমার আব্বা-আম্মা আপনার জন্য কোরবান হোক! আমি এখানে উপেক্ষিতা হালতে আপনার জন্য ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছি আর আপনি ওখানে জায়নামাজে গিয়ে কান্নাকাটি করছেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম সিজদা থেকে মাথা তুলে হযরত ‘আয়িশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহাকে সম্বোধন করে বললেন : আজ কোন্ রাত তা কি তুমি জানো?

উত্তরে হযরত ‘আয়িশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহ তায়ালা আনহা বললেন : আল্লাহ ও তাঁর রসূলই জানেন। তখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : এ হচ্ছে লায়লাতুন নিসফি মিন শাবান- মধ্য শাবানের রাত। এ এমন এক রাত, যে রাতে আল্লাহর কাছে কোন দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। কারও গুনাহ যদি পাহাড় সমানও হয় আল্লাহ তা মাফ করে দেন। হযরত আয়িশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহ তায়ালা আনহা থেকে বর্ণিত অন্য এক হাদিসে আছে যে, একটি রাতে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন; তোমরা কি জানো আজকের এই রাতে কি আছে? সেখানে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা বললেন : হে আল্লাহর রসূল! এ রাতে কী আছে তা আমাদের জানিয়ে দিন। তখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : এ বছর যত মানব সন্তান পয়দা হবে এবং যত মানব সন্তানের ময়ুত হবে তা এ রাতে লিপিবদ্ধ করা হবে এবং তোমাদের আমলসমূহ উপরে ওঠানো হবে আর তোমাদের রিযক অবতীর্ণ হবে।

মূলত মধ্য শাবানের এ রাতের মাহাত্ম্য অপরিসীম। এ রাত ভাগ্য নির্ধারণের রাত। আগামী এক বছরের হায়াত, ময়ুত, রিযক, দৌলত, উত্থান-পতন প্রভৃতি তকদির নির্ধারণ করা হয়। তাই বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি করার মধ্য দিয়ে এ রাত অতিবাহিত করা উচিত।

কুরআন মজিদে আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : আমি কোন জাতির অবস্থার পরিবর্তন করি না, যতক্ষণ না সেই জাতি নিজের অবস্থার পরিবর্তন করে। (সূরা ১৩ রা’দ : আয়াত ১১)। মানুষ যে চেষ্টা-তদ্বিরের মাধ্যমে, আল্লাহকে খুশি-রাজি করার মাধ্যমে, আমল করার মাধ্যমে নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন সাধন করতে পারে সূরা রা’দের ওই আয়াতে কারিমার দ্বারা তা স্পষ্ট হয়ে যায়। শব-ই-বরাতে সেই সুযোগটা বিশেষভাবে আসে।

বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম প্রচার শুরু হয় ৬৪০ খ্রিস্টাব্দের দিকে। সেই তখন থেকেই এ দেশের যে সমস্ত সৌভাগ্যবান ব্যক্তি আল্লাহর মনোনীত দীন ইসলামে দাখিল হন তাঁরা ইসলামের তাবত আচার অনুষ্ঠান, হুকুম-আহকাম প্রভৃতি পালনে তৎপর হয়ে ওঠেন। লায়লাতুন নিসফি মিন শাবান তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাত হিসেবে গৃহীত হয় যা ফারসী প্রভাবে শব-ই-বরাত নামে পরিচিত হয়। লায়লাতুন নিসফি মিন শাবানের মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম এই রাতে ইবাদত-বন্দেগী করতে এবং দিবসে সিয়াম পালন করতে বলেছেন।

শব-ই-বরাত বা বরাতের রাত বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষের সাংস্কৃতিক বৃত্তে এক সুদৃঢ় অবস্থানে অবস্থিত। এই রাতকে কেন্দ্র করে গরিব-মিসকিনদের মধ্যে, পাড়া প্রতিবেশী এবং আত্মীয়স্বজনের মধ্যে হালুয়া-রুটি ও অন্যান্য মিষ্টান্ন কিংবা খাদ্যসামগ্রী বিতরণ ও আদান-প্রদানের মধ্যে এক গভীর সৌভ্রাতৃত্ব বন্ধনের শোভা বিভাসিত হয়ে ওঠে। এ ছাড়াও ইবাদতের জন্য মসজিদে মসজিদে মুসল্লিদের উপচে পড়া ভিড় এবং সারা রাত ধরে নফল নামাজ আদায়সহ অন্যান্য নফল ইবাদতে নিমগ্ন হওয়ার দৃশ্য লক্ষণীয়। কবরস্থানগুলোতেও জিয়ারতকারীদের দারুণ ভিড় জমে। কিন্তু একশ্রেণীর লোকের এ রাতে পটকা ফোটানো, আতশবাজি জ্বালানো কিংবা কবর জিয়ারত করতে গিয়ে কবরে মোমবাতি জ্বালানো, ফুল দেয়া, আগরবাতি জ্বালানো প্রভৃতি কার্যকলাপ করতে দেখা যায় তার কোনটাই শরিয়তসম্মত কাজ নয়, ফলে এগুলো করলে কঠিন গুনাহ হবে। এই রাতে বেশি বেশি করে তিলাওয়াতে কুরআন, যিকর-আযকার, নফল নামাজ আদায়, মিলাদ মাহফিল, তওবা, ইসতিগফার, দান-খয়রাত ইত্যাদি করার মধ্য দিয়ে এ রাতের ফায়দা হাসিল করা যেতে পারে। এ রাতে ইলমে তাসাওউফের তরিকতের নিয়মে তওবার ফয়েযে মশগুল হওয়াও যেতে পারে। এই ফয়েযে রাব্বানা জালামনা আনফুসানা ওয়া ইললাম তাগফিরলানা ওয়া তারহামনা লানা কুনান্না মিনাল খাসিরীন- হে আমাদের রব, আমরা আমাদের নিজের ওপরই জুলুম করেছি, আপনি যদি ক্ষমা না করেন, রহম না করেন তাহলে আমরা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।

এই রাতে কমপক্ষে এক শ’ রাক’আত নফল নামাজ আদায় করা ভাল, দোয়া-দরুদ, সওয়াব রিসানি তো করতেই হবে। যারা এ রাতে ইবাদত-বন্দেগীতে রত না হয়ে সারারাত হৈ-হুল্লোড়, আনন্দ-ফুর্তি করে রাতটি অতিবাহিত করে তাদের জন্য এ রাত সৌভাগ্য রজনীতে পরিণত হয় না। অতএব, আমাদের সবারই উচিত শব-ই-বরাতের যথাযথ ফায়দা হাসিল করার লক্ষ্যে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পালন করা উচিত?

লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ