২৪ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গণরুমের দিন-রাত্রি

  • আলী ইউনুস হৃদয়

শুক্রবার দুপুর ৩টা। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শাহ মখদুম হলের একটি রুমের দরজায় লেখা ‘অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করুন’। দরজার উপরের দেয়ালে লেখা ‘স্পেশাল রুম।’ অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতেই দেখি রুমের মধ্যে অনেকেই ঘুমিয়ে আছেন। এরমাঝে নিঃশব্দে দুইজন পড়ছেন। জানতে পারি এই হলের দুইটি গণরুমের একটি এই ‘স্পেশাল রুম।’ অনেকে আবার এই রুম গুলোকে বলেন ‘গেষ্ট রুম’। ঘুরে দেখলাম, ঘুমানোর খাট আর পড়ার টেবিলের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। মাথার কাছেই কোনমতে ব্যবহৃত জামা-প্যান্ট গুছিয়ে রেখেছেন। দেশের বিভিন্ন সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুমের চিত্র এটি।

কথা হয় গণরুমে অধ্যয়নরত দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তারা বললেন, সমস্যা কিংবা ভাললাগা সবাই একসঙ্গে ভাগাভাগি করে থাকি। আর এখানে থাকার কিছু সমস্যা তো থাকেই তবুও থাকতে হয়। আবার এরমাঝেই আমাদের ছোট-বড় সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একে-অপরের প্রয়োজনে সবাই এগিয়ে আসে। অসুস্থ হলেও খোঁজ নিতে কেউ পিছিয়ে থাকেন না। বলতে পারেন, সুখ, দুঃখ কিংবা হাসি-কান্নার সঙ্গী আমরা।

বেগম খালেদা জিয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ফারজানা ইভা। দেড় বছরেরও বেশি সময় গণরুমে থেকেছেন। এখন রুম পেয়েছেন। জানতে চেয়েছিলাম গণরুমের সেসব দিন-রাত্রির কথা। বেশ আগ্রহ নিয়েই ইভা বললেন, এইচএসসি পরীক্ষার পর বিশ^বিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিংয়ের জন্য রাজশাহী আসি। তখন ক্যাম্পাসের এক আপুর সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি হলে থাকতেন আর তার মাধ্যমেই হলের গণরুমের সঙ্গে পরিচিত হই। প্রথমবার গণরুম দেখে অবাক হয়েছিলাম। মনে মনে ভেবেছিলাম, কিভাবে এখানে ১০০-১২০ জন মেয়ে গাদাগাদি করে থাকতে পারে। বরাবরই এই ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু কয়েক মাস পরেই বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হলে গণরুমে থাকার সুযোগ হয়। এমন একটা রুমেই যে আমাকে থাকতে হবে সেটা তখন পর্যন্তও ভাবিনি!

এই মেয়েটিই গণরুমের সুখ-দুঃখের কথা হাসিমুখে বললেন, গণরুমে উঠার পর যে মেয়েটির সঙ্গে আমার কথা কাটাকাটি হতো সেই মেয়েটিই আজ আমার প্রিয় বান্ধবী। আর রুমের মধ্যে জোরে কথা না বলা, কারোর অসুবিধা না হয় এমন কিছু না করা ইত্যাদি সবকিছু মেনে চলতে বিরক্ত লাগলেও প্রত্যেকেই গণরুম পরিবারের সদস্য ছিলাম। ঘিঞ্জি পরিবেশে মানিয়ে চলা, সবার সঙ্গে পরিচিত হওয়া আবার সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়া সত্যিই অন্যরকম আনন্দের। এতগুলো দিন, রাত গণরুমে কাটিয়েছি যে এসব স্মৃতি কখনও ভুল যাওয়া সম্ভব নয়। আর গণরুম ‘একটি শৃঙ্খলিত জীবনের’ নাম, একটি ‘ভালবাসার’ নাম।

অসহ্য গরম! পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের পরিবেশও নেই। বেডের সামনে-পেছনে রাখা দড়িতে ঝুলছে জামা-কাপড়। একটি রুমে একসঙ্গে দিন-রাত্রির পার করছে শত শিক্ষার্থী। তাদেরই একজন রূপা (ছদ্মনাম) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হলের গণরুমে থাকেন। রূপার বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। পরিবারে আছেন মা আর ছোটভাই। বাবার রেখে যাওয়া কৃষি জমি থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে তার মা আর ভাইয়ের খাওয়া-পড়া অনেক কষ্টে চলে যায়। টাকা পাঠানোর সামর্থ্য তার মায়ের নেই। বড়জোর মা তাকে খাওয়ার জন্য চাল-ডাল ও কিছু সবজির ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। যা তাদের জমিতে ও বাড়ির আশপাশে চাষ করা হয়। আর রূপা একটি টিউশনি করিয়ে মাস শেষে এক হাজার টাকা পায়। এই টাকা দিয়ে দিনে একবেলা খেয়ে তাকে মাস পার করতে হয়। বাড়তি ভাড়া দিয়ে বাইরে কোন মেসে বা বাসায় থেকে পড়াশোনা করা সম্ভব নয়। তাই গণরুমের অন্য সব সমস্যা তার কাছে মূল্যহীন। তবে গণরুমে রান্না করে খাওয়ার সুযোগ থাকলে রূপা তিন বেলা রান্না করে খাওয়ার সুযোগ পেত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুননাহার হলের গণরুমে অবস্থান করা নাম প্রকাশে গণরুমের আরেক শিক্ষার্থী রিজিয়া পারভিন বলেন, হলের গণরুমে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। রান্না করে খাওয়ার কোন সুযোগ নেই। হলের ডাইনিংয়ে খেতে হয় কিন্তু সেখানকার খাবারের মানও ভাল না। বাড়ি থেকে বলেছে হলে থাকতে। পরিবারের সদস্যরা হলকে অন্যসব জায়গা থেকে নিরাপদ মনে করেন। এভাবেই নতুন বন্ধুত্ব তৈরির আনন্দ, নিরাপদে থাকতে পারার নিশ্চয়তা ও কম খরচে পড়াশোনা করার সুযোগ থাকায় এতসব খারাপ লাগাকে সঙ্গী করে বছরের পর বছর দিন-রাত্রি পাড়ি দিচ্ছেন গণরুমের শিক্ষার্থীরা...