২২ এপ্রিল ২০১৯

আলবদর সাক্ষাত আজরাইল ॥ ২২ এপ্রিল, ১৯৭১

১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে দেশের সব পেশার জনগণ এ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকরা রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছিলেন। একইভাবে আমাদের শিল্পী, প্রশাসক, শিক্ষক, এমনকি বিদেশে কর্মরত বাঙালি কূটনীতিকরা এ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিম-লে আমাদের কূটনীতিকদের একযোগে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ বিরাট চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে ও সেসব দেশের প্রশাসনের ওপর বিরাট চাপও সৃষ্টি করে। একাত্তরের এইদিনে কুমিল্লার গঙ্গাসাগরে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সৈন্যদের অ্যামবুশ করে। এই অ্যামবুশে মুক্তিযোদ্ধাদের কোনোরূপ ক্ষতি ছাড়াই ৬ জন পাকসৈন্য নিহত হয় এবং মুক্তিযোদ্ধারা প্রচুর পরিমাণে গোলাবারুদ ও অস্ত্র দখল করে। হিলিতে পাকবাহিনী আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সীমান্ত রেখার ভেতর মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর প্রচন্ড আক্রমণ করে। পরে মুক্তিযোদ্ধারা ভারতের ভূখন্ডে আশ্রয় নেয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোদাগাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ্যে পাকবাহিনী হামলা চালায়। এখানে পাকহানাদারদের বিরাট কনভয় আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে। এ সংঘর্ষে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাৎ বরণ করে। পাক হানাদারদের হাতে বগুড়া শহরের পতন ঘটে। পাকবাহিনী বাঘাবাড়িতে এসে শাহজাদপুর লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ শুরু করে। মুক্তিবাহিনীর সাথে তুমুল সংঘর্ষের পর বাঘাবাড়ি ও শাহজাদপুর পাকবাহিনীর হাতে পতন হয়। পাকহানাদার বাহিনী হেলিকপ্টার থেকে মাদারীপুর শহরের ওপর গোলাবর্ষণ শুরু করে। তাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্যস্থল ছিল সংগ্রাম কমিটির কন্ট্রোল রুম মিলন সিনেমা হল। এ হামলায় কেউ নিহত না হলেও অনেক নিরীহ মানুষ আহত হয়। চট্টগ্রাম নোয়াখালী ও কুমিল্লা এই তিনদিক থেকে পাকবাহিনী একযোগে ফেনী আক্রমণ করে। এ যুদ্ধে পাকসেনারা ফেনী দখলে ব্যর্থ হয়। রাজশাহী থেকে সড়কপথে পাকবাহিনীর একটি কনভয় ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত অবস্থায় নওগাঁ প্রবেশ করে। রাতে পাকবাহিনীর নির্দেশমত পাকিস্তানকে রক্ষা করার লক্ষ্যে ‘শান্তি কমিটি’ গঠন করা হয়। শান্তি কমিটির দাপট ও অত্যাচারে জ্বলে ওঠে নওগাঁ শহর ও তার চারপাশের অঞ্চল। নওগাঁ শহরের লর্ড লিটন ব্রিজের পূর্ব পাশে চকবাড়িয়া গ্রামের ১৯ বছর বয়স্ক আকালু পাকিস্তান বাহিনীর সামনে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান উচ্চারণ করতে করতে ঘাতকদের গুলিতে শাহাদাৎ বরণ করেন। অন্য এক ঘটনায় নওগাঁ নাট্য অঙ্গনের বালা সাহা (৮০) তাঁর নিজ বাসভবনে পাকবাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। ময়মনসিংহের মধুপুরে পাকবাহিনী ব্যাপক শেলিং শুরু করে। এ আক্রমণে মুক্তিবাহিনী পিছু হটে হালুয়াঘাটে একত্র হয় ও অবস্থান নেয়। ১১ নং সেক্টর-এনাজমুল হক তারা, তফাজ্জল হোসেন, এম.এ. আলম ও নাজমুল আহসানের নেতৃত্বে চারটি সাব সেক্টর বিভক্ত করা হয়। চট্টগ্রামের দোহাজারীতে মুক্তিবাহিনী ও পাকবাহিনীর মধ্যে দখল প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রচন্ড সংঘর্ষ হয়। পাকবাহিনীর অপর একটি কনভয় ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত অবস্থায় রাজশাহী থেকে সড়ক পথে নওগাঁয় প্রবেশ করে। তাদের নির্দেশমতো ঐ দিন রাতে পাকিস্থান রক্ষার লক্ষ্যে শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। এ সময় নওগাঁর মুক্তিযোদ্ধারা সাময়িকভাবে পিছু হটে ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নেয়। ভোরবেলা প্রতিরক্ষার স্বার্থে রায়গঞ্জ ব্রীজটি উড়িয়ে দেয়া হয়। অন্যদিকে ধরলা নদীর পূর্বপাড়ে বিশাল এলাকা নিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যুহ্য গড়ে তোলা হয়। এখানে ধরলা নদীর পশ্চিম পার্শ্বে অবস্থানরত পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায়ই প্রচন্ড গোলাগুলি হতো। এদিকে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে আসা সেনাবাহিনীর সুবেদার আলতাফ ১৭ জন জোয়ান নিয়ে যাদুরচরে এসে পৌঁছান। তিনি স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি বাহিনী তৈরি করেন, যা আলতাফ বাহিনী নামে পরিচিতি লাভ করে। সে সময় রৌমারী সি.জি. জামান হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ আজিজুল হক, তাঁর সম্পাদনায় মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক পত্রিকা ‘‘অগ্রদূত’’ এর নিয়মিত প্রকাশনা শুরু করেন। ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশের অধিকাংশ শহরাঞ্চল হানাদার কবলিত হলেও বৃহত্তর নোয়াখালীর সমগ্র এলাকা ছিল পাক হানাদার মুক্ত। ২২ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিল এবং এখানকার প্রশাসন নোয়াখালী কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ইতিমধ্যে পাক সেনাদের আগমন পথে বাধা সৃষ্টির জন্য লাকসাম, নীলকমল, চর জব্বার, শুভপুর প্রভৃতি স্থানে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় । অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম ম্যাকমোহন ক্যানবারায় বলেন, জীবনহানির জন্য আমরা নিশ্চয়ই দুঃখিত। আমরা চাই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করুন, যত শিগগির সম্ভব তিনি বেসামরিক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করবেন এবং তা প্রতিষ্ঠা করবেন। আমরা আশা করি আর কোন জীবন হানি হবে না এবং পাকিস্তানের পার্লামেন্টে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আওয়ামী লীগের নেতৃবর্গকে ক্ষমতা দেয়া হবে। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, পূর্ব বাংলার মুক্তি সংগ্রাম পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার হতে পারে না। অবিভক্ত ভারতের ১০ কোটি মুসলমান যে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তান তাকে অবজ্ঞা করেছে। পাকিস্তান আন্দোলনের এই মৌলিক প্রস্তাবটিকে অবজ্ঞা করে বিগত ২৩ বছর ধরে তারা পূর্ব বাংলাকে তাদের কালোনী করে রাখে। এই সংগ্রাম বীর বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সংগ্রাম। শোষণ থেকে মুক্তি ও হৃত স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের লড়াই। মওলানা ভাসানী নবগঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীন সরকারকে অবিলম্বে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য বিশ্বের সকল শান্তিকামী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সরকার ও জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি দলমত, পেশা, বয়স নির্বিশেষে সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। ময়মনসিংহ জেলা ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি মুহাম্মদ আশরাফ হোসাইনের নেতৃত্বে জামালপুর শহরে প্রথম আলবদর বাহিনী গঠিত হয়। পরবর্তীকালে বদর বাহিনী জামায়াতে ইসলামীর নিজস্ব বাহিনীতে রূপ নেয়। বদর বাহিনীর নিষ্ঠুরতা সীমাহীন। এর চিত্র ফুটে উঠে তাদের এক পত্রিকার লেখায়- ‘আলবদর একটি ন্যায়! একটি বিস্ময়! আলবদর একটি প্রতিজ্ঞা! যেখানে তথাকথিত মুক্তিবাহিনী, আলবদর সেখানে। যেখানেই দুষ্কৃতিকারী (মুক্তিযোদ্ধা) আলবদর সেখানেই। ভারতীয় চর কিংবা দুষ্কৃিতকারীদের কাছে আলবদর সাক্ষাৎ আজরাইল।’ এইদিন দৈনিক যুগান্তর ”বাংলাদেশে লড়াইয়ের দ্বিতীয় পর্যায়,মুক্তিফৗজের সাঁড়াশী আক্রমণে পাকবাহিনী পর্যুদস্ত” শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়,গতকাল বিকেলে বাংলাদেশে লড়াইয়ের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে। এতদিন যা হচ্ছিল, তা হল মুক্তিফৗজ কর্তৃক পাকিস্তানী সৈন্যের প্রতিরোধ করা এবং তা ছিল একরকম বিচ্ছিন্নভাবেই। অর্থ্যাৎ মুক্তিফৗজ তেমন সংগঠিত ছিল না। বিভিন্ন সেক্টরের সঙ্গে যুদ্ধনীতি অনুযায়ী সমঝোতাও ছিল না। কিন্তু গতকাল থেকে মুক্তিফৗজ পরিকল্পিতভাবে সংগঠিত হয়ে যুদ্ধনীতি অনুযায়ী পাল্টা আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে। ইতিমধ্যে মুক্তিফৗজের সংগ্রামীরা অনেক অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। তাদের প্রথম পাল্টা আক্রমণ পশ্চিম সেক্টর থেকেই শুরু হল এবং ক্রমে অন্যান্য সেক্টরেও এই পাল্টা আক্রমণ আরম্ভ হবে। গতকাল বিকেলেই মুক্তিফৗজ বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তবর্তী বুড়িপোতা, গবীপুর ও দৌলতপুর দিয়ে তিন পথে এক সঙ্গে সাঁড়াশী আক্রমণ চালিয়েছে। এই সাঁড়াশী আক্রমণের উদ্দেশ্য হল- মেহেরপুর, চুয়াঁডাঙ্গা অঞ্চল দখল করা এবং মেহেরপুর থেকে সাত মাইল ূূরে আমঝুপিতে পাকসৈন্য যে ঘাঁটি স্থাপন করেছে তাকে দখল করা এবং যশোর ক্যান্টনমেন্ট দখল করা। আজ সকাল পর্যন্ত খবর নিয়ে জানা গেছে যে, মুক্তিফৗজ ইতিমধ্যেই কোর্ট এলাকা দখল করে নিয়েছে এবং মুক্তিফৗজের তীব্র আক্রমণের মুখে পাকিস্তানী সৈন্যরা পিছু হটতে শুরু করেছে এবং পাকবাহিনী পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে। মুক্তিফৗজের জনৈক মুখপাত্র জানিয়েছেন। মুজিবনগর আক্রমণের চেষ্টা ব্যর্থ : এদিকে গতকাল মঙ্গলবার পাকিস্তানী সৈন্যরা মুজিবনগর আক্রমণের চেষ্টা ও পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু বিকেল থেকে প্রবল বৃষ্টি হওয়ায় এবং রাস্তাঘাট চলাচলের পক্ষে সুবিধাজনক না হওয়ায় পাকবাহিনীর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যায়। মুজিবনগরে মুক্তিফৗজের ট্রেনিং ক্যাম্পঃ গতকাল বাংলাদেশের মুজিবনগরে মুক্তিফৗজের ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয়েছে এবং আজ সকাল থেকে তার কাজ শুরু হয়েছে। এই ক্যাম্পে ২০০জন করে শিক্ষার্থীকে সমরশিক্ষা দেওয়া হবে এবং শিক্ষা শেষে তাদের লড়াইয়ে পাঠানো হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক