২৪ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকার দিনরাত

  • মারুফ রায়হান

বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ দেখতে দেখতে চলে গেল। গরম কত প্রকার ও কী কী তা টের পেতে শুরু করেছেন ঢাকাবাসী। গত বছর এ সময়টায় তেমন লোডশেডিং হয়নি ঢাকায়। এবার যেন একটু ঘন ঘনই বিদ্যুত যাচ্ছে আমাদের এলাকায়। আবার ঠিক পাশের সেক্টরেই (উত্তরা) শুনি চব্বিশ ঘণ্টায় মাত্র পনেরো মিনিটের জন্য বিদ্যুত থাকে না। দেড় কোটি মানুষের শহরে, বলা ভাল, মহানগরীতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ খুব সহজ কাজ নয়। তবে লোডশেডিং করতে হলে তার একটা ‘সুষম বণ্টন’ থাকাই প্রত্যাশিত।

শব-ই-বরাত পালিত হলো রবিবার, সামনেই রোজা। তবে এরই মধ্যে বাজারে আগুন লাগার পূর্বাভাস মিলেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে না বলে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের পরিকল্পনা নিশ্চয়ই অন্যরকম। তাদের ভাবনাতেই থাকে রমজান মাসে জিনিসের দাম বাড়ানোর। গত কয়েক বছর এমন অভিজ্ঞতাই ঢাকাবাসীর। মানুষ অবশ্য ভালটাই প্রত্যাশা করে।

বৈশাখে গরম পড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে তা যেন সীমা ছাড়ানোর মতো না হয়। গরমে বৈদ্যুতিক পাখা না ঘুরলে পরিস্থিতি অসহনীয় মনে হতেই পারে। তবে পাশাপাশি আমাদের সহ্যক্ষমতাও বাড়ানো দরকার। গরম বেশি পড়লে, আর বৈশাখ রুদ্ররূপ ধারণ করলে আমার অবশ্য তাদের কথা মনে হয় যারা খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে বাধ্য হন। আমরা যারা চার দেয়ালের মাঝে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে কাজ করি দিনভর, তারা কি কল্পনায়ও আনতে পারি যাদের সূর্যালোকের নিচেই শ্রম দান করে যাওয়া নিয়তি?

ঢাকায় নদীর পাড়ে উচ্ছেদ অভিযান

ঢাকার নদীগুলো পুনরুদ্ধার বা দখল দূষণমুক্ত করার জন্য নদীতীর দখল করে তৈরি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু করেছে বিআইডব্লিউটিএ বেশ কয়েক সপ্তাহ হলো। এটি একটি বড় কাজ, যদি না আবার সেসব স্থানে স্থাপনা গড়ার অবৈধ ‘কারিগরেরা’ আগ্রাসন চালান। যাহোক, ইতোমধ্যে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে ১৫৯ বহুতল ভবন। সংখ্যায় একেবারে কম নয়, আবার গোটা পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করলে বলতে হবে, এ খুব বেশিও নয়। তবে উচ্ছেদকৃত মোট স্থাপনার সংখ্যা কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনে ঢাকাবাসীর মনে। ১ হাজার ৭২১টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। অবমুক্ত করা হয়েছে ৮১ একর জমি। আমাদের অভিধানে ‘ভূমিদস্যু’ বলে একটি শব্দ আনুষ্ঠানিকভাবে সংযুক্ত না হলেও দেশবাসীর কাছে শব্দটি বেশ পরিচিত। নদীখেকো শব্দটিও কম পরিচিত নয়। মানুষ সর্বভুক প্রাণী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এই দেশে। তারা নদীও খায়। নদী দখলকারীদের অবশ্য এ শব্দটি শুনে কী প্রতিক্রিয়া হয় জানি না। উচ্ছেদ করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কত বিড়ম্বনা ও বাধা পেরুতে হয়েছে সহজেই অনুমান করতে পারি। তার কিছু কিছু গণ্যমাধ্যমেও এসেছে।

ট্রাভেল ও ট্যুরিজম মেলায়

ঢাকায় কত ধরনের মেলাই যে হয় বছরভর। সদ্যসমাপ্ত হলো ট্রাভেল ও ট্যুরিজম মেলা। প্রতিটি মেলারই থাকে কিছু না কিছু উপযোগিতা। থাকে দর্শক ও সুবিধা গ্রহণকারী। বিশেষ করে ভ্রমণ করতে যারা পছন্দ করেন এ মেলাকে ঘিরে তাদের মধ্যে থাকে উৎসাহ ও কৌতূহল। আমাদের ভ্রমণপ্রিয় কবিবন্ধু কামরুল হাসান এই মেলা নিয়ে আকর্ষণীয় পোস্ট দিয়েছেন ফেসবুকে। আমার সময় ও সুযোগ হয়নি মেলায় যাওয়ার। তাই এই পোস্ট পড়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর অবকাশ পাই। তিনি লিখেছেন : ‘আমাদের ব্রেকফাস্ট আড্ডার তিন মূল উদ্যোক্তার একজন সৈয়দ আবু জাফরের চোখে গত দশ দিন ধরে ঘুম নেই। এর কারণ তিনি ট্রাভেল ও ট্যুরিজম মেলায় স্টল নিয়েছেন ও তা সাজাচ্ছেন। ১৮-২০ এপ্রিল এই তিনদিনের মেলায় অন্তত যেন একদিন যাই সে অনুরোধ তিনি বহুদিন আগেই করে রেখেছেন। মাহমুদ হাফিজ ‘ভ্রমণগদ্য’ নামের ভ্রমণ বিষয়ক বিরল পত্রিকাটি প্রকাশ করেন। তিনিই এর সম্পাদক। এর দ্বিতীয় সংখ্যাটি সদ্য প্রেস থেকে নিয়ে এসেছেন। স্বভাবতই তিনি কিছুটা উত্তেজিত। সে উত্তাপ তিনি আমার মাঝে ছড়ালেন একটি কপি আমার হাতে তুলে দিয়ে। সবুজ খয়েরি হলুদের প্রচ্ছদটি আমার দেখামাত্র পছন্দ হয়ে যায়। সম্পাদক যারা হন, তাদের নানাগুণে গুণান্বিত হতে হয়। এই চমৎকার প্রচ্ছদটি মাহমুদ হাফিজের করা, এমনকি পত্রিকার নামলিপিটি পর্যন্ত তার সুন্দর হস্তাক্ষরের পরিচায়ক। আমরা যখন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পৌঁছাই তখন শেষ বিকেল। ২০১৯ সালের ১৯ এপ্রিলের সূর্য শেষবারের মতো এ গোলার্ধের লোকদের মুখ দেখাচ্ছে (ভয় পাবেন না, আগামীকালও সূর্য উঠবে)। যা ভেবেছিলাম, মেলাপ্রাঙ্গণ লোকে লোকারণ্য। অতিউৎসাহীদের ঠেকাতে মেলা কর্তৃপক্ষ টিকিটের ব্যবস্থা রেখেছে। বাজারের সংজ্ঞায় আমরা যে বলি প্রকৃত ও সম্ভাবনাময় ক্রেতার সমষ্টি, এসব মেলায় উপচে পড়া দর্শকদের এক বিরাট অংশ সম্ভাবনাময় ক্রেতাও নয়, এরা ¯্রফে দর্শক। তারা স্টল, স্টলের লোকজন, প্রদর্শিত সামগ্রী দেখতে আসে, আর কুড়াতে আসে রাশি রাশি ছাপানো চিত্রিত লিফলেট, পুস্তিকা, উপহার, ব্যাগ প্রভৃতি। আমি গার্মেন্ট মেশিনারিজের মেলায় দেখেছি প্রচুর লোক এসে বিভিন্ন কাপড় সেলাই করার যন্ত্রপাতির ছবিঅলা প্রচারপত্র সাগ্রহে সংগ্রহ করে, যারা কোনদিনই ঐসব যন্ত্রপাতি কিনবে না, তবে তারা সেলাই করা কাপড় চোপড় কেনে। আমরা সরাসরি চলে যাই জাফর ভাইয়ের স্টলে, দেখি সত্যি তিনি একখ- উজবেকিস্তান বসিয়েছেন বাংলাদেশে। ঐতিহ্যবাহী উজবেক পোশাক পরা এক অতিদীর্ঘ উজবেক রমণী, নাম তার গুলসিনা বাইসভা সকলের নজর কাড়ছিল। বিভিন্ন স্টলে আঁখিতে আরাম আনে এমন অনেক রমণীকে সাজিয়ে রাখে ট্যুর অপারেটররা, কেননা তারা জানে দর্শককুলে পুরুষের বিপুলাধিক্য আর তাদের আগ্রহ কোন বিন্দুতে। স্টলটি সাজানো হয়েছে সেই মনোরম ও একই সঙ্গে ঐতিহাসিক দেশটির বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও মানুষের ছবি দিয়ে। বড় ফ্রেমে বাঁধানো ছবিগুলো রঙিন উজ্জ্বল। ঝলমলে ছবিসমূহ ছাড়াও যা চোখ টানে তা হলো স্টলটির তাঁবুর মতো চূড়া, যা তৈরি হয়েছে উজবেকিস্তানের ট্রাডিশনাল প্রিন্টের কাপড় দিয়ে। লম্বা ফালিগুলো চূড়ায় গিয়ে তৈরি করেছে এমন এক নান্দনিকতা, যা অন্য কোন স্টলেই দেখলাম না।’

রাতভর তালাবন্দী!

সেদিন জনকণ্ঠের প্রধান শিরোনাম ছিল- ‘রাতবন্দী জীবন- ভাড়াটিয়ারা আগুন ও ভূমিকম্প ঝুঁকিতে’। আগ্রহ নিয়ে আমার মতো নিশ্চয়ই অনেকে লেখাটি পাঠ করেছেন। গেটে তালা দিয়ে নিজের কাছে চাবি রাখেন অধিকাংশ বাড়ির মালিক- এমনটাই নিয়ম হয়ে গেছে ঢাকা শহরে। তাতে কী কী ঝুঁকি বাড়ছে সেটি নিয়ে প্রতিবেদন। আমরা ভুক্তভোগী ভাড়াটিয়ারা জানি এসব কথা কত সত্যি। প্রতিবেদক রহিম শেখ লিখেছেন: ‘ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে ভাড়াটিয়ার সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি। রাজধানীর বাড়িভাড়ার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন না থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাড়ির মালিকের কথাই হয় শেষ কথা। যদিও ভাড়ার ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি হওয়ার বিধান আছে। রাজধানীর অধিকাংশ বাড়ির মালিকই রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে গেটে তালা দিয়ে চাবি নিজের কাছে রাখেন। এরপর ভাড়াটিয়ারা বাড়ি থেকে বের হতে বা ঢুকতে পারেন না। এ কারণে অনেককেই পড়তে হয় দুর্ভোগে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভূমিকম্প বা অগ্নিকা-ের মতো বড় ধরনের দুর্যোগে এই ‘কঠোর নিয়মের’ কারণে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে। জাতীয় ভাড়াটিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মীর মোফাজ্জল হোসেন মোস্তাক বলেন, এ শহরে বেশিরভাগ মানুষ ভাড়া থাকেন। কিন্তু ভাড়া থাকা এ মানুষগুলোর অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে না। বাড়িওয়ালারা ইচ্ছেমতো নিয়ম করেন, যা মানতে হয় ভাড়াটিয়াদের। ১১টার পর গেট বন্ধ করার নিয়ম কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এমনও ঘটনা শুনেছি, কেউ পরিবারের অসুস্থ সদস্যকে রাতে হাসপাতালে নিতে গেটের চাবি চাইতে গেছেন, কিন্তু বাড়িওয়ালা খারাপ ব্যবহার করেছেন। অগ্নিকা- ঘটলে তাদের উদ্ধার করে বের করে নিতে হলেও গেটের তালা ভাঙতে হবে। সব সময় হাতের কাছে গেটের তালা ভাঙার উপকরণ তো থাকে না।’

আগ্রহীরা গুগলে শিরোনাম দিয়ে অনুসন্ধান করলে পেয়ে যাবেন পুরো প্রতিবেদন। শুধু এর সঙ্গে যোগ করতে চাই, ২০১৯ সালে আমরা ঢাকার বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। তাই আশা করতেই পারি যে ঢাকায় যারা সংখ্যাগুরু মানুষ, অর্থাৎ ভাড়াটিয়া, তাদের কল্যাণে সত্যি সত্যি এবার আইনানুগ কিছু উদ্যোগ গৃহীত হবে যাতে করে কোন বাড়িওয়ালাই স্বোচ্ছাচারী জমিদারের মতো আচরণ না করতে পারেন। সার্ভিস চার্জের নামে বড় অঙ্গের টাকা যোগ করা হয় বাড়িভাড়ার সঙ্গে যার ভেতরে থাকে লিফটের চার্জ ও কেয়ারটেকারের বেতন। এখানে একদিকে যেমন অতিরিক্ত অর্থ জোরপূর্বক আদায়ের দৃষ্টান্ত রয়েছে, তেমনি আবার কেয়ারটেকারকেও কাজের সময় পান না ভাড়াটিয়ারা। অথচ বাড়িওয়ালারা তাকে দিয়ে নানা ধরনের পারিবারিক কাজ করিয়ে নেন। বেতন দিচ্ছেন ভাড়াটিয়ারা অথচ সার্ভিস পাচ্ছেন কেবল বাড়িওয়ালা। গভীর রাতে, ধরা যাক রাত একটায় ফিরতেই পারেন কোন ভাড়াটিয়া। আবার ঘর থেকে বেরুতেও পারেন অনিবার্য দরকারে (যেমন বিমান-বাস-ট্রেন ধরা বা ওষুধ কেনা), তাই প্রত্যেক ভাড়াটিয়ার কাছে ডুপ্লিকেট চাবি থাকতেই পারে। তা না হলে কেয়ারটেকারের মাধ্যমে বাইরের গেট খোলার বন্দোবস্ত থাকাই সমীচীন।

‘আলফা’র বিশেষ প্রদর্শনী

‘একাত্তরের যিশু’ ও ‘গেরিলা’র পর নিজের তৃতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন মুক্তিযোদ্ধা ও নাট্যকর্মী নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। ছবির নাম ‘আলফা’। শনিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে হয়ে গেল ছবিটির বিশেষ প্রদর্শনী। মূলত শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিকর্মীরাই ছিলেন আমন্ত্রিত দর্শক। পরিচালক বললেন, তিনি আশা করেছিলেন একশ’জন দর্শক পাবেন, কিন্তু পেয়েছেন মিলনায়তনপূর্ণ (প্রায় ৩০০) দর্শক।

দেড় ঘণ্টার ছবিটি প্রদর্শনের সময় দর্শকরা মনোযোগীই ছিলেন, উশখুশ করা বা আসন ছেড়ে না যাওয়াটাই বলে দিচ্ছিলো দর্শকেরা ছবিটি উপভোগ করছেন। প্রধান প্রধান চরিত্রে নবীন শিল্পীরাই অভিনয় করেছেন। কিন্তু মনে হয়নি যে তারা নবাগত। খুব গোছালো গল্প হয়তো পাবেন না প্রথাগত সিনেমার দর্শকরা। তবে চারপাশের বয়ে চলা জীবনের অনেক গল্পই বহমান থেকেছে চলচ্চিত্রটিতে। পটভূমির কথা নিজেই বললেন নির্মাতা প্রদর্শনের আগে। পেট্রোল বোমার সন্ত্রাস সমাজের সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে ছবির মুখ্য চরিত্র চিত্রশিল্পীর ( রিক্সাপেইন্টিং ও গ্লাস পেইন্টিং করেন) মনোজগতে কী বিপুল প্রতিক্রিয়া ঘটায়, সেটি স্পষ্ট করা হয়েছে ছবিতে। তবে সময়ের বয়ান দিতে গিয়ে সত্যপ্রকাশের দায়বোধ থেকে ক্রসফায়ারে অপমৃত্যুর প্রসঙ্গটি নাটকীয়ভাবে এসেছে। এতে বাস্তব-পরাবাস্তব মিলেমিশে গেছে। ছবিটি দেখতে দেখতে আমার অবশ্য নাট্যকার সেলিম আল দীনের কথা, যিনি ছবির নির্মাতার আমৃত্যু শিল্পসখা, মনে পড়ে যাচ্ছিলো। বিত্তহীন শ্রমজীবী মানুষের জীবনধারার দর্শনীয় উপস্থাপনা, নানা শ্রেণিপেশার মানুষের বৈচিত্র্যময় সংগীত যোজনা, সব মিলিয়ে এক কথায় অনবদ্য এ চলচ্চিত্র। চিত্রশিল্পীর শিল্পীসত্তাটি তাৎপর্যপূর্ণভাবেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। শিল্পীর মানসভ্রমণ আকর্ষণীয়। আরেকটি বিষয় হলো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। টুপিখোলা অভিনন্দন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুকে।

ঢাকার অতিথি অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

ঢাকায় প্রথমবারের মতো এসেছিলেন ভারতীয় লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। অবশ্য দীর্ঘকাল তিনি আমেরিকায় বসবাস করছেন। আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন, দুটো পত্রিকায় কলাম লেখেন। বাংলায় কবিতাগ্রন্থও আছে তার। ঢাকায় চলচ্চিত্র বিষয়ক বেশ ক’টি আনুষ্ঠানিক আলাপচারিতায় অংশ নেন অনামিকা। বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রে সেরকম একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে তাঁর দীর্ঘ বক্তব্য শুনেছিলাম। আয়োজকেরা ইংগিত দিয়েছিলেন তাঁর নির্মিত দ্য থার্ড ব্রেস্ট ছবিটি সেখানে দেখানো হবে। দেখার ইচ্ছে পূরণ না হওয়ায় আমার পুরনো দু’জন বিশ্বস্ত বন্ধুকে বলে রেখেছিলাম (যারা অনামিকারও বন্ধু) সিনেমাটা দেখানো হলে যেন খবর পাই। বন্ধুরা কথা রাখেননি। তাই ছবিটি আর দেখা হয়ে ওঠেনি। তবে ছবি নিয়ে অনামিকার বক্তব্য শুনেছি। অনামিকা বলছিলেন, ‘আমি ট্যাবু নিয়ে কাজ করি। এ ছবিটির বিষয় যৌনতা এবং যৌন শিক্ষা নিয়ে ভারতীয় মানসিকতার ট্যাবু। ভারতে যৌন শিক্ষার পরিবেশ নেই। সরকারের পক্ষ থেকেও এখনও সে পরিবেশ তৈরির যথেষ্ট উদ্যোগ নেই। ভারতীয়রা এখনও যৌন শিক্ষার জন্য প্রস্তুত নন। যদিও সেখানে কিছু লিবারেল ফর্মস আছে- যেমন খাজুরাহ এবং কামসূত্র লেখা হয়েছিল। সেই দেশের মানুষই এতটা ট্যাবুগ্রস্ত হয়ে পড়লেন কেন, যেসব কারণে আমরা ক্ষতিগ্রস্তই হচ্ছি, বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। সেইসব বিবেচনায় এটা একটা চেষ্টা যে, আমরা ট্যাবুগুলোকে জয় করতে পারি কিনা।’

পরিশিলীত বাচনে ও উচ্চারণে সুন্দর বাংলা বলেন তিনি এবং অবাক ব্যাপার তাতে টিপিক্যাল কলকাতার টান নেই। অনামিকার সোজাসাপ্টা কথাবার্তা, মানবিক বোধ, ব্যক্তিস্বাধীনতাকে উচ্চমূল্য দেয়া এবং নারীর ওপর পুরুষতান্ত্রিক আচরণ নিয়ে তির্যক সমালোচনা বিশেষ ভালো লেগেছে। মনে হয়েছে তিনি সত্যিকারের একজন মুক্ত মানুষ, সৃষ্টিশীল ব্যক্তি। স্বচ্ছ স্পষ্টভাবে নিজের মত প্রকাশ করেন সাতপাঁচ না ভেবে।

কলাকাতায় ফিরে অনামিকা ঢাকা শহরকে মিস করার কথা জানিয়েছেন। ঢাকার বন্ধুরাও নিশ্চিত তাকে মিস করছেন। ভাবছিলাম, আমাদের এই শহরে কি একজনও অনামিকা নেই!

২১ এপ্রিল ২০১৯

marufraihan71@gmail.com