২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জীবনকে ঢেলে সাজাবে ॥ সিনথেটিক বায়োলজি

  • এনামুল হক

অপার এক সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে সিনথেটিক বায়োলজি বা কৃত্রিম জীববিজ্ঞান। বিজ্ঞানের এই নতুন শাখা জীবনকে বদলে দেবে, প্রকৃতিকে বদলে দেবে, বদলে দেবে সম্ভবত সভ্যতাকেও। প্রকৌশলের নিয়মসূত্রগুলো জীববিজ্ঞানে প্রয়োগ, জিন সম্পাদনা, ডিএনএর রূপান্তর ইত্যাদির ফলে আজ খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান, জ্বালানি, সুগন্ধীসহ মানুষের প্রয়োজনীয় সবকিছুই মলিকুল পদার্থে তৈরি করা সম্ভব হয়ে উঠেছে। এর ফলে বিশ্বের শিল্পজগতে ঘটে যাবে বিপ্লব। ক্যান্সারসহ দুরারোগ্য রোগব্যাধিকে জয় করবে মানুষ। হয়তবা ফিরিয়ে আনা যাবে ম্যামথ ও অন্যান্য হারিয়ে যাওয়া প্রজাতি।

বিগত প্রায় চার শ’ কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব ও ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রয়োজনে ডিএনএ বা জিনের বিন্যাসক্রম (ঝরয়ঁবহপব) তৈরির একমাত্র উপায়টি ছিল ইতোমধ্যে রয়ে যাওয়া বিন্যাসক্রমের অবিকল প্রতিরূপ (পড়ঢ়ুরহম) সৃষ্টি করা। কখনও কখনও কোন জিন ক্ষতিগ্রস্ত হতো, প্রতিরূপ তৈরির কাজ ঠিকমতো হতো না, কিংবা সেই কাজটি প্রকৃতিকে বার বার করতে হতো। তারপর এক সময়ে এলো এক অবাক করা ব্যাপার, যার নাম প্রাকৃতিক নির্বাচন (হধঃঁৎধষ ংবষবপঃরড়হ)। তবে এর অন্তর্নিহিত বিষয়টি একই থেকে গিয়েছিলÑ জিন থেকে জিনেরই প্রতিরূপ সৃষ্টি হতো। এর ভিন্ন কোন উপায় ছিল না। কিন্তু এখন ব্যাপারটা আর তা নয়। এখন ভিন্ন কৌশলেও জিন পুনরুৎপাদন করা সম্ভব। তবে সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আরও দুটো কথা বলে নেয়া ভাল।

মানুষ ১০ হাজারেরও বেশি সময় ধরে জীববিজ্ঞানকে নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনের কাজে লাগিয়ে এসেছে। তাঁরা জাত নির্বাচন ও প্রজননের (Selective breeding) মাধ্যমে ফসল ও গবাদিপশুকে নতুন চেহারা ও বৈশিষ্ট্য দান করেছে এবং নানা প্রজাতির প্রাণীকে চতুর্দিকে স্থানান্তর করে প্রতিবেশের (বপড়ংুংঃবস) কাঠামোকেই বদলে দিয়েছে।

বিশ্বব্যাপী জীবজগতের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে যাওয়ার একটা লক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হলো পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীর কলম্বীয় বিনিময় (ঈড়ষঁসনরধহ ঊীপযধহমব)। আমেরিকা আবিষ্কারক কলম্বাসের নামে এই নামকরণ। সে সময় নতুন বিশ্ব অর্থাৎ দুই আমেরিকা এবং পুরনো বিশ্ব অর্থাৎ এশিয়া-ইউরোপের মধ্যে মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, রোগব্যাধি এমনকি ধ্যান-ধারণার ব্যাপক স্থানান্তর ও আদান-প্রদান ঘটেছিল। দুই আমেরিকা ঘোড়া, গবাদিপশু ও তুলার সঙ্গে পরিচিত হয়। এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপ প্রবর্তিত হয় ভুট্টা, আলু, মরিচ ও তামাক। মানুষের বাস যে প্রতিবেশে (Ecosystem) তার বিশ্বায়ন ঘটে যায়, যা আগে আর কখনও হয়নি। তবে এর পরিণতি যেমন কল্যাণকর হয়েছে, তেমনি আবার বিপর্যয়ও ঘটেছে। হাম, জলবসন্ত ও অন্যান্য প্যাথোজেন নতুন বিশ্বে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। লাখ লাখ লোক মারা যায়। ইউরোপীয়রা এই বির্যয়ের পূর্ণ সুযোগ নেয়। তারা রোগব্যাধিতে বিরাণ হয়ে পরা ভূখ- দখল করে নেয়।

প্রাণের অস্তিত্ব ও ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রয়োজনে প্রকৃতি জিন থেকে জিনের প্রতিরূপ সৃষ্টি করে থাকে। আজ মানুষ নিজেই তাঁর প্রয়োজনমতো জিন প্রকৌশল দ্বারা বার বার জিন রচনা ও সম্পাদনা (বফরঃরহম) করতে পারছে- ওয়ার্ড প্রসেসরের টেক্স যেভাবে করা হয় ঠিক সেভাবে। এর মধ্য দিয়ে প্রাণময় বস্তু বা জৈবদেহকে (ঙৎমধহরংস) পরিবর্তন, রূপান্তর ও সংস্কার করার ((engineer) যে সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে, তার ফলে এমন অনেক কিছু তৈরি করতে পারা ও কার্য সম্পাদন করা সম্ভব হয়েছে, যা আগে কঠিন এমনকি অসম্ভবও ছিল। আজ খাদ্য থেকে শুরু করে ওষুধপত্র, মুখে মাখার ক্রিম, জ্বালানির নতুন উৎস উদ্ভাবন সবই জিন প্রকৌশলের দ্বারা কোষসমূহ ও তাদের কাজকর্ম বদলে দিয়ে করা সম্ভব হয়ে উঠেছে। শরীরের ইমিউন কোষগুলোকে ডাক্তাররা যেভাবে চান সেভাবে কাজ করতে বলে দেয়া বা কাজ করিয়ে নেয়া যায়। নিষিক্ত ডিম্বাণুকে (ঋবৎঃরষরুবফ বমম) এমনভাবে প্রোগ্রাম করা যায় যে, তা থেকে জন্ম নেয়া প্রাণীট হবে বাবা-মা থেকে একেবারেই অন্যরকম। এরই নাম কৃত্রিম জীববজ্ঞিান (Synthetic biology)।

কৃত্রিম জীববিজ্ঞান বিজ্ঞানের এক নতুন ক্ষেত্র সেখানে প্রকৌশলের নীতিমালা বা সূত্রগুলোকে জীববিজ্ঞানে প্রয়োগ করা হয়। এর লক্ষ্য হচ্ছে প্রকৃতি জগতে যার অস্তিত্ব নেই তেমন জৈবিক উপাদান ও ব্যবস্থাগুলোর রি-ডিজাইন করা ও উদ্ভাবন করা। প্রচলিত সাজসরঞ্জাম ও কলাকৌশল কাজে লাগিয়ে কিভাবে কৃত্রিম জৈব ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, কৃত্রিম জীববিজ্ঞান তা নিয়ে গবেষণা ও চর্চা করে। সোজা কথায় প্রাণের নতুন রূপ ও জীবসত্তা (ড়ৎমধহরংস) সৃষ্টি এর উদ্দেশ্য। জড়জগতে (animate) মানুষের প্রকৌশল জ্ঞান প্রয়োগের ফলে গগনচুম্বী অট্টালিকা থেকে শুরু করে সিলিকন চিপস পর্যন্ত অবিস্মরণীয় সব কিছু তৈরি হয়েছে, যা দু’শ’ বছর আগেও ছিল কল্পনার অসাধ্য। এখন প্রকৌশলের সূত্রগুলো প্রাণময় জগতে (inanrimate) প্রয়োগের ফলে তেমনি ধরনের বিস্ময়কর ব্যাপারগুলো সৃষ্টি হওয়া একান্তই সম্ভব।

অনেকের মতে চলতি শতাব্দী হবে সিনথেটিক বায়োলজির শতাব্দী, যেমন বিংশ শতাব্দী ছিল পদার্থ বিজ্ঞান ও ঊনবিংশ শতাব্দী ছিল রসায়নের শতাব্দী। সিনথেটিক বায়োলজি প্রাণকে এমনভাবে রিপ্রোগ্রাম করার সম্ভাবনা ধারণ করে আছে, যাতে নতুন নতুন পণ্য উৎপাদনই শুধু নয়, জীবনের নতুন রূপ ধারণ করাও সম্ভব হয়ে উঠবে। জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া প্রাণী ও উদ্ভিদকে ফিরিয়ে আনা যাবে। লোমশ ম্যামথ, প্যাসেঞ্জার পিজিয়ন, গ্রেট অক, আমেরিকান চেস্টনাট ও আরও কিছু। জাদুঘরে কিংবা চিরহিমায়িত অঞ্চলে (permafrost) সংরক্ষিত প্রজাতির জেনোম রিপ্রোগ্রাম করে সেই প্রজাপতিকে অথবা অনুরূপ ধরনের কিছু সৃষ্টি করা যেতে পারে। তা ছাড়া সিনথেটিক বায়োলজি যদি প্রকৃতিজাত মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রীর জায়গায় সস্তায় একই রকম কৃত্রিম দ্রব্যসামগ্রী তৈরি করতে পারে তাহলে প্রকৃতির সঙ্গে তার বন্ধন ছিন্ন হয়ে সেটি মুক্ত হয়ে যাবে। প্রকৃতি তখন তাঁর বশে আসবে। ১৯২৩ সালে এইচজি ওয়েলস রচিত গ্রন্থ ‘মেন লাইক গড্্স’-এ উদ্ভিদকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত ও প্রজনন করা হয়েছে যে, তা থেকে মোম, আঠা, মূল্যবান তেল ইত্যাদি কাক্সিক্ষত গুণগত মানে নজিরবিহীন মাত্রায় ক্ষরিত হয়। ওয়েলসের দেখা সিনথেটিক বায়োলজির সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবায়িত হতে চলেছে।

সিনথেটিক বায়োলজির যাত্রা শুরু

১৯৫০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন যে, জিনগুলো ডিএনএর মলিকুলগুলোর দীর্ঘ রশির গায়ে শেয়ারের দর কিংবা তারবার্তা মুদ্রণকারী যন্ত্রের ফিতা তথা টিকারটেপের মতো লেখা। ১৯৭০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা এক প্রাণীদেহের বৈশিষ্ট্যকে ডিএনএ মলিকুলের রশিতে টিকারটেপের মতো কেটেছেঁটে পেস্ট করে অন্য প্রাণীদেহে স্থানান্তর শুরু করতে সক্ষম হন। সেই সক্ষমতাই হয়ে দাঁড়ায় বায়োটেকনোলজির ভিত্তি।

সিনথেটিক বায়োলজির প্রযুক্তির মূল বিষয়টি হলো প্রকৃতির পুরনো বার্তাগুলোকে এক জেনোম থেকে অন্য জেনোমে স্থানান্তর করার পরিবর্তে টিকারটেপের নতুন টুকরোর গায়ে নতুন রাসায়নিক বার্তা লিখে জেনোমে স্থানান্তর করতে পারার সক্ষমতা। ডিএনএর প্রতিটি বর্ণ সংশ্লেষণে সক্ষম মেশিনের আবির্ভাব ঘটতে শুরু করে আশির দশকের শেষদিকে। এক দশক পর চাহিদামতো ডিএনএ বর্ণগুলোর বিন্যাসক্রম লিখে তা পাঠিয়ে দিতে পারার কোম্পানিও গড়ে ওঠে। এর ফলে প্রকৃতিতে প্রাপ্ত জিনগুলোর দ্বারা আর সীমাবদ্ধ না থেকে বিজ্ঞানীরা সেগুলোকে রিপ্রোগ্রাম করতে অর্থাৎ সেল ও কোষগুলো পরিবর্তন বা সংস্কার করে সেগুলোকে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন উপায়ে কাজ করিয়ে নিতে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে তাদের এই কৌশলের সঙ্গে যুক্ত হয় ডিজিটাল প্রযুক্তি। এতে করে ডিএনএ সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি বিস্ময়কর গতি লাভ করে। এ থেকে বিজ্ঞানীরা উপসংহারে পৌঁছান যে, সার্কিট ও সফট্ওয়্যার যেভাবে পরিবর্তন করা যায় সেই একইভাবে কোষগুলোকেও পরিবর্তন করা সম্ভব।

প্রকৃতি জগতে জিন প্রোগ্রামিং ব্যবস্থা আপনা থেকেই রয়েছে। তবে সেটা অতিমাত্রায় জট পাকানো এবং এর পেছনে কোন উদ্দেশ্য বা পথনির্দেশনা নেই। তবে জিনের সংশ্লেষণ ঘটিয়ে নতুন ও সহজতর উপায়ে কিছু করার কৌশল মিলতে পারে। যেমন, এমন এক কৌশল উদ্ভাবন করা যেতে পারে যার ফলে সেল বা কোষ জিনকে চালু ও বন্ধ করতে পারবে। জিন চালু বা সক্রিয় থাকলেই কেবল একটা কোষের পক্ষে জিনের বিন্যাসক্রমে (ংরয়ঁবহপব) বর্ণিত প্রোটিন তৈরি হতে পারে। জিনকে নিষ্ক্রিয় বা দমিয়ে রাখলেই প্রোটিনের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। প্রোটিন হলো সেই মলিকুল যা একটা কোষের মধ্যে চলমান প্রায় সকল কাজই করে থাকে। ২০০০ সালে বিজ্ঞানীরা এক অভিনব জিনেটিক ‘সার্কিটের’ ডিজাইন করেন। সেই সার্কিটের সহায়তায় একটি জিনের অভিব্যক্তিকে (বীঢ়ৎবংংরড়হ) অন্য একটি জিনের প্রোটিন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তৃতীয় একটি বিষয় অধিকতর ব্যবহারিক। সেটা হলো বিপাক প্রকৌশল (সবঃধনড়ষরপ বহমরহববৎরহম)। অনুজীব এনজাইম নামক প্রোটিনকে কাজে লাগিয়ে তার প্রয়োজনীয় অন্য সব মলিকুল তৈরি করে। এনজাইমগুলো রাসায়নিক বিক্রিয়ার অনুঘোটক (পধঃধষুংঃ) হিসেবে কাজ করে। মলিকুল তৈরির প্রতিটি ধাপে ভিন্ন ভিন্ন এনজাইম থাকে। কখনও কখনও এ ধরনের বিপাক প্রক্রিয়ার শেষ উৎপাদিত জিনিসটি এমন একটা কিছু দাঁড়ায়, যা মানুষের কাজে লাগতে পারে- যেমন হরমোন, এ্যান্টিবায়োটিক কিংবা কীটনাশক। একটা আঁচড় থেকে ডিএনএ রচনা করতে পারার সক্ষমতা অর্জনের ফলে বিপাক প্রকৌশলীর পক্ষে ভিন্ন ভিন্ন বেশ কিছু প্রাণের জিন একত্রিত করে মলিকুল তৈরির নতুন পথ উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে রসায়ন শাস্ত্রের গ-ির বাইরে অতি কম খরচে মলিকুল তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জে কিসলিংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি প্রকল্পে মলিকুল তৈরির এমন এক পথ রচিত হয়েছে, যার দ্বারা আর্টিমিসিনের পূর্বসূরি তৈরি সম্ভব। আর্টিমিসিন হচ্ছে চাইনিজ সুইট ওয়ার্মউড নামের এক উদ্ভিদের মলিকুল যা ম্যালেরিয়ার অতি উত্তম ওষুধ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। অন্য আর কোন উপায়ে এই মলিকুল তৈরি ছিল অসম্ভব।

ডিএনএ সংশ্লেষণ ২০০০-এর দশকের প্রথমদিকে আরও ব্যাপক পরিসরে প্রাপ্তি সাধ্য হয়ে ওঠায় জৈবদেহে (ড়ৎমধহরংস) নতুন সক্ষমতা তৈরির নানা পথ উন্মোচিত হয়। ২০০২ সালে আমেরিকার বিখ্যাত এমআইটিতে জিন ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়ার রূপান্তর ঘটানো হয়। ২০১৩ সালে সিনথেটিক বায়োলজির এমন বিকাশ ঘটে যে, এক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় ল্যাবরেটরিগুলো জৈবিক উপায়ে আগে কখনও তৈরি করা যায়নি এমন প্রায় এক হাজার ধরনের মলিকুল তৈরির কৌশল বের করে। এ বছরের জানুয়ারি মাসে সেই মলিকুলগুলোর ১০০০তমটিকে তৈরি করা হয়েছে। একই সময় এক বর্ণের বর্তমান টিকারটেপ পরিবর্তন বা রদবদলের নতুন উপায় তৈরি হয়েছে, যেখানে ২০০০ সালে একটিও ছিল না। এখন ক্রিসপার নামে এক মলিকুলভিত্তিক জিন সম্পাদনা কৌশল বিশেষ শক্তিশালী ও সহজে ব্যবহারযোগ্য প্রমাণিত হয়েছে জেনোমে সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন আনার ধারণায় এটা নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়েছে। এই কৌশলের বদৌলতে বিজ্ঞানীরা এখন যে কোন প্রাণীর কোষের মধ্যকার দুষ্ট জিনকে ঘায়েল করা, নির্দিষ্ট কোন জিনের সঙ্গে নতুন কোন বৈশিষ্ট্য যোগ করা অথবা কোন কিছু বাদ দেয়ার কাজ সহজে করতে পারেন।

এ ছাড়াও জীববিজ্ঞানের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে নতুন নতুন ক্ষেত্র। জিন সংশ্লেষণের খরচও বহুলাংশে কমে এসেছে। ২০০০ সালের খরচের তুলনায় এখন হয়েছে এক হাজার ভাগের এক ভাগ। এর সঙ্গে আবার যোগ হয়েছে ‘মেশিন লার্নিং’-এর মতো প্রযুক্তি। সিনথেটিক বায়োলজির সক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই কমে আসছে ভেষজ বা ওষুধ শিল্পের গুরুত্ব। ওষুধ উৎপাদনের খরচ অনেক কমে এসেছে এবং আরও কমবে। ওষুধের প্রতি নতুন কৌশলের ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ সঞ্চারিত হয়েছে। এক্ষেত্রে সেল বা কোষকে রিপ্রোগ্রাম করে সহায়ক কার্যকর ওষুধ বের করা যেতে পারে। স্বভাবতই এ ব্যাপারে যে ক্ষেত্রটি সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে তা হলো ইমিউন ব্যবস্থা। দ্বিতীয় গুরুত্ব পাচ্ছে পেট্রোলিয়াম শিল্প। বায়োফুয়েল বা জৈব জ্বালানি তৈরির ব্যাপারে সিনথেটিক বায়োলজি বেশ জোরেশোরে উদ্যোগ নিয়েছে। অশোধিত তেলের শেষ উপজাত থেকে সুগন্ধী ও খাদ্যের এডিটিভ তৈরিতে অনেক কোম্পানি সিনথেটিক বায়োলজিকে কাজে লাগাচ্ছে। তৃতীয়ত হলো প্লাস্টিক শিল্প। সিনথেটিক বায়োলজির কল্যাণে পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিক তৈরি সম্ভব হয়ে উঠেছে।

ব্যবসার ক্ষেত্রে বায়োটেকনোলজি ব্যবহার অধিকতর লাভজনক বলে দেখা গেছে। জিন প্রকৌশলজাত প্রাণীদের থেকে অর্থোপার্জনের পরিমাণ ২০১৭ সালে মার্কিন জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ ছিল। ওষুধপত্র ও ফসল উৎপাদনেও এই প্রযুক্তি বেশ লাভজনক হয়েছে। প্লাস্টিক, ফুড এডিটিভ, কিছু কিছু সুগন্ধী ও বায়োফুয়েলের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য রাসায়নিক ইতোমধ্যে বৃহৎ পরিসরে ফার্মেন্টেশন ট্যাঙ্কে অনুজীবের পরিবর্তন ঘটিয়ে ব্যাপক আকারে উৎপাদন করা হচ্ছে। অনেক কোম্পানি শিল্পোৎপাদনের কাজে মাইক্রোব ব্যবহার করে থাকে। ক্যালিফোর্নিয়ায় জাইমারজেন নামে একটি কোম্পানি আছে, যার ব্যবসার ৭৫ শতাংশই হলো শিল্পোৎপাদনের কাজে বিভিন্ন কোম্পানি ব্যবহৃত মাইক্রোবগুলো পুনর্প্রকৌশল (ৎব-বহমরহববৎ) করা, যাতে করে উৎপাদন বাড়ানো ও খরচ কমানো যায়। সিয়াটলের আর্জেদা ও বোস্টনের গিংকো কোম্পানিও রকমফের একই কাজ করছে। এরা কেউ কৃত্রিম ডিএনএ, কেউ প্রোটিন আবার কেউবা অনুজীব (সরপৎড়নব) নতুন করে তৈরি করছে এবং সবাই এসব কাজে মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

গিংকো বেয়ার নামক বিখ্যাত রাসায়নিক কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এমন মাইক্রোব তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে, যা উদ্ভিদের শিকড়বাকরের ভেতরেই সার তৈরি করবে। তারা এমন এক উদ্ভিজ্জ প্রোটিন তৈরিরও উদ্যোগ নিয়েছে, যা মাদকের বিকল্পসহ সবজি জাতীয় খাদ্যে ব্যবহার করা যাবে। গিংগো, জাইমেরজেন, আর্দেজা ও অন্যান্য কোম্পানি বিপুল পরিমাণে কৃত্রিম ডিএনএ ব্যবহার করছে, যে শিল্প পরিসরে সেগুলো উৎপাদনের এক নতুন পথ উন্মোচিত হচ্ছে। আজ গিংগো বিপুল হারে কৃত্রিম ডিএনএ সিকোয়েন্সের ফরমায়েশ দেয় এবং সেগুলোকে হাজার হাজার জৈবদেহের জেনোম পরিবর্তনের কাজে ব্যবহার করে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট