২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নতুন বছরের নব সম্ভাবনা

  • নাজনীন বেগম

১৪২৬-এর শুরুতেই উল্লেখ করা যায় প্রাপ্তিযোগ বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের এক অবিমিশ্র কর্মদ্যোতনা। উচ্চ, মধ্য, নিম্নবিত্তই শুধু নয়, নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মিলিত ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশটা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়ন দশকের গৌরবময় অধ্যায়ের অনেক সফলতা জনগণের কাছে পৌঁছে দিলেও সবটাই যে পারেননি সেটা বলতেও তিনি দ্বিধা করেননি। ১৪২৫ বঙ্গাব্দে হয়ে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর নিরঙ্কুশ বিজয় তাঁর উন্নয়ন ধারারই এক অবিস্মরণীয় স্বীকৃতি। নির্বাচনের আগেই তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় দেশের হরেক রকম অরাজক পরিস্থিতি, বিশৃঙ্খলা, বিচারহীনতার অপসংস্কৃতিকে মুছে ফেলতে শেখ হাসিনার নিরলস কর্মদ্যোতনা জাতিকে যে সুষ্ঠু, স্বাভাবিক আর সমৃদ্ধির পথ দেখায় সেটাই এই মুহূর্তে দ্রুততার সঙ্গে সামনে চলার নিয়ামক শক্তি। বিসর্জনের অনেক অপকৌশলকে রোধ করা গেলেও সবটা করতে আরও সময় লাগতে পারে বলে বিজ্ঞজনদের অভিমত। ব্যক্তি মানুষের সচেতনতা, দায়বদ্ধতা, নীতি-নিষ্ঠতাই শুধু নয়, জ্ঞান, বিজ্ঞান আর প্রজ্ঞায় সবাইকে দক্ষ ও ক্ষমতাবান হতে হবে। একা কারও পক্ষেই কিছু করা সম্ভব নয়। প্রত্যেককেই নিজের অবস্থান থেকে তার দায়িত্বটুকু পালন করে যেতে হবে। এর অন্যথা হলে বিঘœ আর বিপত্তি পিছু হটবে না। যুগের প্রতিনিধিরা সামনে চলার দিকনির্দেশনা দেন ঠিকই; কিন্তু অনেক সামাজিক অপকৌশল বিদ্যমান ব্যবস্থাকে বেসামাল করে দিতে পারে। সেখান থেক বের হতে না পারলে শুধু উন্নয়ন দিয়ে এগিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। এসব দিকে কড়া নজর দেয়া গণমানুষের স্বার্থেই একান্ত আবশ্যক। ছোটখাটো অনিয়ম, দুর্নীতি, মান্ধাতা আমলের গতানুগতিক অব্যবস্থা, যা আধুনিক বিজ্ঞান যাত্রার সঙ্গে মেলে না, সেসবও অতিক্রম করার শক্তি আর জ্ঞান অর্জন করতে হবে। এখনও চতুর্দিকে ছড়ানো কিছু অপকর্ম সমাজের অভ্যন্তরে গেড়ে বসে আছে, তেমন আবর্তকেও ছিঁড়ে ফেলতে হবে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রায় অগ্রগামিতার সুসংবদ্ধ ধারাকে মেলাতে হবে স্বচ্ছ, জনবান্ধব, আইনসিদ্ধ এবং মানবিকতার সুষ্ঠু বোধে। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি সমৃদ্ধির নিয়ামক হলেও গ্রহণ করার মানসিকতা কিংবা চৈতন্যের আধুনিক বোধ যদি তার অনুষঙ্গ হতে ব্যর্থ হয় তাহলে মাঝে-মধ্যেই অঘটন, দুর্বিপাক, দুর্যোগকে মোকাবেলা করা ছাড়া অন্য কোন রাস্তা থাকে না।

গত কয়েক বছরে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি। দেশীয় সীমানাকে পার করে আন্তর্জাতিক বলয়েও আমাদের সদর্প অংশীদারিত্ব বিশ্বের বিভিন্ন জরিপে দৃশ্যমান হচ্ছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা সামাজিক অভিশাপ তাড়িত করলেও আধুনিকতার আশীর্বাদও মাথার ওপর থেকে সরে যাচ্ছে না। ফলে আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে লাভবানও হচ্ছি। বিশ্ব জরিপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় নেতৃত্বের আসন অত্যন্ত জোরদার হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের দেশটাকে এগিয়ে নিতে তাঁর সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের রসদ যুগিয়েছে। নিজের দক্ষতার সঙ্গে দেশের অর্ধাংশ নারী জাতিকে দক্ষ করে তোলার যে অবিস্মরণীয় মহাপরিকল্পনা তাকে অবলম্বন করে নারীরা সাহসী, সময়ের বলিষ্ঠ পথিক হতেও বেগ পাচ্ছে না। এই এক ঐতিহাসিক পথযাত্রা, যেখানে মেয়েরাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোতে তাদের সফল অংশীদারিত্ব প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। নতুন বছরে তা আরও শক্তিশালী হয়ে সমাজে নারীর আসনকে দৃঢ় ও মজবুত করে তুলবে। যাত্রাপথ এখন অবারিত ও মুক্ত। পেছনে তাকাবার ফুরসত থাকার কথা নয়। অন্য অনেকের সঙ্গে পিছিয়ে পড়ায় নিজেদের কঠিনভাবে মেলানোর সময়কে আর হেলায় নষ্ট করা যাবে না। যা কিছু মঙ্গল, শুভ এবং নিজেকে সমৃদ্ধ করার নির্ণায়ক, সেসবকে দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রহণ করে নারীত্বের মধ্যে আটকে না থেকে মানুষের মর্যাদায় বাঁচার স্পৃহা অন্তরে জাগাতে হবে। আর সেটাই হবে নারী জাতির চলার পথের দীপ্ত শিখা। যে আলো চলার পথে সমস্ত কূপম-ূকতা এবং অন্ধকারকে সমূলে উৎখাত করে দেবে। যে আলোকিত জগত নারীদের অধিকার, সচেতনতা, মর্যাদা এবং স্বাধীনচেতনায় গড়ে তুলবে।

এর পরও বেদনাঘন অনুভবে মননসত্তায় ভর করে আগুনে ঝলসে যাওয়া নুসরাতের দীপ্ত অঙ্গীকার আর প্রতিবাদ। প্রতিবাদী এই উদীয়মান তরুণী তার ওপর ঘটে যাওয়া শ্লীলতাহানির প্রতিবাদ করতে গেলে প্রতিপক্ষ শক্তি তার শরীর আগুনে দগ্ধ করে দেয়। বিস্ময়করভাবে তার সর্বাঙ্গ আগুনের ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকলেও কথা বলার শক্তি এবং মুখম-ল অনেকটাই অক্ষত থাকে। ফলে হাসপাতালে নেয়ার পথে শেষ নিশ্বাসটুকু থাকা পর্যন্ত প্রতিবাদ জানাতে থাকে অপরাধী যাতে পার পেয়ে না যায়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যেন এমন অমানবিক ঘটনার সুষ্ঠু সমাধানে এগিয়ে আসেন। শরীরের দুঃসহ যন্ত্রণাকে দৃঢ়শক্তিতে দমন করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে বলে যেতে কুণ্ঠিত হয়নি নুসরাত। প্রতিবাদী ও দুঃসাহসিক এই অগ্নিদগ্ধ তরুণীর প্রতিরোধের যে বহ্নিশিখা উদ্ভাসিত হচ্ছিল সেটাই তাকে এক অনন্য মর্যাদায় নিয়ে যায়। শত চেষ্টাতেও মরণকে আটকানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু আমৃত্যু প্রতিবাদের ঝড় এই ঝলসে যাওয়া মেয়েটিকে চিরদিন বাঁচিয়ে রাখবে অনন্য নজির হিসেবে। নুসরাত নিজেই এক বহ্নিশিখা। দুর্বৃত্ত অধ্যক্ষ এমন অপকর্ম এর আগে বহুবার করতে করতে শেষমেশ এসে ধরা পড়ে যাবেন ভাবতেই পারেননি। আরও অনেক ছাত্রীর সঙ্গে অসদাচরণের এক উন্মত্ত, উচ্ছৃঙ্খল ক্ষমতাবান অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কোন মেয়ে দাঁড়াতে পারে সে কল্পনাও কারও মাথায় আসেনি। কল্পনাকে হার মানানো এই তেজী তরুণী যেন বাংলার ঘরে ঘরে নতুন শক্তিতে উজ্জীবিত হয় তেমন প্রত্যাশা সবার। শুধু তাই নয়, যেসব সতীর্থ এমন নৃশংস ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তারাও যেন কোনভাবেই পার পেয়ে না যায়। এমন লোমহর্ষক অগ্নিদাহের ঘটনা মানবসভ্যতার চরম অপমান, মনুষ্যত্বের অবর্ণনীয় অসম্মান। দ্রুত বিচার আইনে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান দিলেও এই গর্হিত অপকর্মের যথার্থ সাজা হয় কিনা জানি না।

নতুন প্রভাতের নববর্ষ যেন পেছনের সমস্ত জঞ্জালকে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না দেয় তেমন ব্যবস্থাই জোরদার করতে হবে। সম্ভাবনাময় বাংলাদেশকে অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে নিতে হলে পুরনো আবর্জনা ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করতে হবে। সম্মান আর মর্যাদায় সবাইকে মানুষ ভাবার অনমনীয় বোধ ভেতর থেকে জাগাতে না পারলে আইন, সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র সবার পক্ষেই উদ্ভূত পরিস্থিতিকে সামলানো কঠিন হবে।

পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা, বনানীর এফআর টাওয়ার ও গুলশানের কাঁচাবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের পর সঙ্গত কারণেই অন্য ভবনগুলোকেও কঠোর নজরদারিতে আনা হয়েছে। প্রায় কোন ভবনই নিরাপদ আর ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিশেষ করে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র এবং জরুরী নিগর্মন পথ সেভাবে জনবান্ধব করে গড়ে তোলা হয়নি, যাতে প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে আগুন নেভানো কিংবা ভবন থেকে সহজভাবে বের হওয়া সম্ভব হয়। এছাড়াও বহুতল ভবনের ভিত্তিতেও অনেক অনিয়ম স্পষ্টভাবে চিহ্নিত হচ্ছে, যা অপরিকল্পিত কিংবা, আইনসম্মত নয়। সুষ্ঠু শিল্প আর নগরায়ণের আনুষঙ্গিক অনেক শর্তই এসব বহুতল ভবনে আমলে নেয়া হয়নি। মাথায় রাখা হয়েছে বাণিজ্যিকভাবে লাভ-লোকসানের অঙ্ক। এসবের অবসান ঘটাতে হবে যে কোন মূল্যে।

গত বছরের ক্রান্তিলগ্নে ঘটে যাওয়া এসব অগ্নিদাহে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে নিরাপদ ভবনই শুধু নয়, সুষ্ঠু নগরায়ণের প্রাসঙ্গিক সমস্ত বিধিনিষেধ প্রয়োগ করতে হবে কঠোরভাবে। নতুন বছরের দ্বারপ্রান্তে পরিকল্পনা করা হচ্ছে পুরো ঢাকা শহরকে ঢেলে সাজানোর এক মহৎ ও বৃহৎ কর্মযোগ। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে শুধু এগিয়েই দেননি, বিশ্ব পরিসীমায়ও দেশের মর্যাদায়কে উজ্জ্বল করেছেন। আগামীর বাংলাদেশ তৈরিতেও তিনি আরও দৃঢ় ও কঠিন সঙ্কল্পে সমস্ত অনিয়মের বেষ্টনী থেকে দেশকে মুক্ত করবেন। এমন প্রত্যয় যেমন শেখ হাসিনার, পাশাপাশি তেমনি সমগ্র জনগোষ্ঠীর। দুর্নীতিমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তৈরিই হোক নববর্ষের অঙ্গীকার।

লেখক : সাংবাদিক