১৫ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাক বাহিনীর গণহত্যায় বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া ॥ ২৩ এপ্রিল, ১৯৭১

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল দিনটি ছিল শুক্রবার। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সরকার পূর্ব পাকিস্তানে নারকীয় সামরিক হস্তক্ষেপকেও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে। কিন্তু সব মার্কিন পত্রিকা পাকিস্তানের বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডের নিন্দা করেছে। পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ থেকে বিরত রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ওপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করেছে। চীনের পত্রিকায় ইয়াহিয়া খানকে বলা হয়েছে স্বৈরাচারী চেঙ্গিস খান। সিঙ্গাপুরের সরকারপ্রধান যেখানে মেপে মেপে কথা বলেছে, সেখানে সে দেশের জাতীয় পত্রিকা দ্য নিউ নেশন বলেছে, ‘পূর্ব পাকিস্তানে নৃশংস হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতেই হবে। অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের পা-িত্যপূর্ণ ব্যাখ্যা শুনিয়ে বিশ্ববিবেকের কণ্ঠ রোধ করা যাবে না।’ ওয়াশিংটন ডেইলি নিউজ লিখেছে, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে থাকা কিংবা নিশ্চুপ থাকা দুটোর মানেই আরও বাঙালী নিধনে সহায়তা করা।’ এমনকি ঘানার একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা দ্য পালভার উইকলি লিখেছে, ‘ইয়াহিয়া খান সংখ্যালঘুর একচেটিয়া শাসন কায়েম করতে চান। বিশ্বের শান্তিপ্রিয় দেশগুলোর উচিত সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর ত্বরান্বিত করা।’ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বেনাপোলে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটিতে ব্রিটিশ এমপি ডগলাস ম্যানকে স্বাগত জানান। এখানে উভয়ের মধ্যে এক ঘণ্টাব্যাপী আলোচরা হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দুই ব্যাটালিয়ন সৈন্য যশোরের কাগজপুকুর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের মূল ঘাঁটির ওপর আক্রমণ করে। দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা তুমুল যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা বেনাপোল কাস্টম কলোনি ও চেকপোস্ট এলাকায় বিকল্প প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেয়। এ যুদ্ধে ইপিআর বাহিনীর নায়েক সুবেদার মজিবুল হকসহ ১৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাতবরণ করেন। অন্যদিকে পাকবাহিনীর ৫০ জন সৈন্য নিহত ও অনেক আহত হয়। পাক বাহিনী দোহাজারীতে ঘাঁটি স্থাপন করে। পাকবাহিনীর ২০০ সৈন্য রাঙামাটি থেকে মহালছড়ির দিকে যাত্রা করলে ক্যাপ্টেন কাদের ও লে. মাহফুজের নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পাকিস্তানিদের কাছে ফেনীর পতন হলে মুক্তিযোদ্ধারা ভারতের বিভিন্ন সীমান্তে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। পাকিস্তান বাহিনীর ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লাকসাম পরিদর্শন করেন। তিনি লাকসাম শহরের প্রবীণদের এক সমাবেশে প্রতিশোধ গ্রহণের হুমকি দিয়ে বলেন, ‘গত দুদিনে আপনাদের মুক্তিরা আমাদের বেশ ক্ষতি করেছে। আমরাও তাই করব।’ অতঃপর পাকবাহিনী নজিরবিহীন নারকীয় হত্যাকা-ে মেতে ওঠে। সকাল ৯টায় নেত্রকোণা শহরের উপর পাকিস্তানীদের দুটি সুরমা রঙের যুদ্ধবিমান গুলিবর্ষণ করে চলে যায়। এতে নেত্রকোনার সাধারণ মানুষ ভীতু হয়ে পড়ে। প্রশিক্ষণ শিবিবের ইপিআর সদস্যরা বিষয়টি অনুধাবন করে বিমান বিধ্বংসী অস্ত্র ছাড়াই রাইফেল দিয়ে বিমানের দিকে গুলি ছুড়ে সাধারণ মানুষদের ভীতিহ্রাস করার চেষ্টা করেন। এতে তেমন কোন ফল আসেনি। দুপুর নাগাদ নেত্রকোনা শহর জনমানব শূন্য হয়ে যায়। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাও নেত্রকোনা শহরকে নিরাপদ মনে করেননি। এই দিনই তারা নেত্রকোনা সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ের শিবির পূর্বধলায় স্থানান্তর করেন। মুক্তিযুদ্ধের অর্থ সংগ্রহ করতে ওই রাতে নেত্রকোনার ন্যাশনাল ব্যাংকের লকার ভেঙ্গে টাকা পয়সা ও স্বর্ণ সংগ্রহ করেন। খাদ্য সংগ্রহ করতে জারিয়া সরকারী খাদ্যগুদাম থেকে চাল, চিনিসহ প্রচুর খাদ্য সামগ্রী সীমান্তের ওপারে বাঘমারায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। নেত্রকোনা অস্ত্রাগার থেকে সংগৃহীত অস্ত্রসহ বেশকিছু ব্যক্তি মালিকাধীন অস্ত্র নিয়ে ভারতের বাঘমারা ও মহেষখলার গড়ে তোলেন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প। এছাড়া মদন থানার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে আটক করে থানার অস্ত্রগুলো নিয়ে মহেশখলা ক্যাম্পকে আরও শক্তিশালী করে তোলেন। পাক হানাদার বাহিনী নোয়াখালী জেলা দখল করে নেয়। তারা আলবদর রাজাকারদের সহযোগিতায় জেলার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়, অনেক নারীকে ধর্ষণ করে, বাড়িঘরে লুটপাট চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। পাকবাহিনী তিস্তা ও লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি থেকে প্রবল গুলিবর্ষণ করতে করতে কুড়িগ্রামের দিকে অগ্রসর হয়। বর্বর পাকবাহিনীর ভারি অস্ত্রের তীব্র আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অবস্থান ছেড়ে দিয়ে পিছু হটে নিরাপদ স্থানে প্রতিরক্ষা ঘাঁটি স্থাপন করে। যুক্তরাজ্যের কমন্স সভায় শ্রমিক দলীয় সদস্য ও অর্থনৈতিক সাহায্য বিষয়ক কমিটির সাবেক সচিব পিটার শোর বলেন, ‘পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান সরকারের আচরণ সর্বপ্রকার নীতিবহির্ভূত বন্য আচরণ। এ অত্যাচার উৎপীড়ন উপেক্ষা করা লজ্জাজনক হবে। আমি অনুরোধ করছি, শ্রমিক দল যেন এ বিষয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলে এবং পশ্চিম পাকিস্তানকে সর্বপ্রকার অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্যদান অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।’ পাকিস্তান সরকার ২৬ এপ্রিল ১২টা থেকে কলকাতার পাকিস্তানী ডেপুটি হাই কমিশন বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং একই সময়ে ঢাকায় ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশন বন্ধ করে দেয়ার জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়।

এছাড়া মওলানা ভাসানী চীনের নেতা মাও সেতুং, চৌ এন লাই এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে তারবার্তা পাঠিয়ে তাদের অবহিত করেন যে, পূর্ববঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যাপকহারে গণহত্যা চালাচ্ছে। সেজন্য তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে অনুরোধ করেন এই মর্মে যে, তিনি যেন পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ না করেন। উপরন্তু মওলানা ভাসানী প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানান। এইদিন আনন্দবাজার পত্রিকায় আরও কয়েকটি অঞ্চলে মুক্তিফৗজের সাফল্যÑকসবা স্টেশন ও পাকশী সেতু পাক হানাদার কবলমুক্ত শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী আজ ভোরের দিকে আখাউড়া-ব্রাহ্মণবাড়িয়া উপকণ্ঠে কসবা রেলস্টেশনটি পাকিস্তানী সৈন্যদের কবল থেকে মুক্ত করে নিয়েছেন। সীমান্তের ওপার থেকে সর্বশেষ প্রাপ্ত খবরে এই তথ্য জানা গেছে বলে ইউএনআই জানিয়েছেন। কৃষ্ণনগর থেকে আমাদের নিজস্ব সংবাদদাতা জানাচ্ছেন, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম খ-ের অধিনায়ক এম এ ওসমান চৌধুরীর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানা গেছে যে, মুক্তিফৌজ প্রচ- লড়াইয়ের পর পাকশী সেতু থেকে সৈন্যদের হটিয়ে দিয়েছে। উত্তর পাকশী সেতু থেকে শুরু করে দক্ষিণে শিবতলা, বড়বাজার ও ঝিকরগাছা লাইন পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল অধিকার করে নিয়েছে। যশোরের পাকসৈন্যরা এখন কেবল ক্যান্টনমেন্ট এলাকাতেই আবদ্ধ আছে। সীমান্তের ওপার থেকে জানা গেছে যে, বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা আজ বাংলাদেশের এক অজ্ঞাত স্থানে তাঁদের রাজধানীতে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হয়ে কতগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কসবার যুদ্ধে মুক্তিফৗজ পাক বাহিনীর কয়েকজন অফিসারসহ অন্তত ৫০ জনকে গ্রেফতার করেন। পাক সৈন্যরাও মর্টার আর হালকা ফিল্ড গান থেকে গুলি চালায়। দ্য পিস নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয় ‘পনেরো লাখ মানুষ বর্তমানে অনাহারে রয়েছে (অথবা বলা যায় যে, তারা সপ্তাহ খানেকের মধ্যে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়বে যদি না বাহিরের দেশ থেকে সাহায্য তাদের কাছে না পৌঁছায়)। এরা হলো সেই সম্পূর্ণ নিঃস্ব মানুষ, যারা গত বছরের ঘূর্ণিঝড় থেকে বেঁচে ফিরেছিল এবং যারা সম্পূর্ণভাবে বাইরের ত্রাণের উপর নির্ভরশীল, যখন দেশের বাকি অংশের শস্য নষ্ট হয়ে যায়। আরও ত্রিশ লাখ মানুষ এই দুর্দশাপূর্ণ অবস্থার মুখে পড়বে। তারাও সম্পূর্ণ রূপে বাইরের ত্রাণের উপর নির্ভর করতে শুরু করবে এবং এই ত্রাণ তাদের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তারাও কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়বে.’...

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

sumahmud78@gmail.com