২৪ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ধর্মীয় সন্ত্রাস নাকি অস্ত্রবাণিজ্য?

  • মিলু শামস

যুতসইভাবে দোষটা এবার নন্দ ঘোষের ওপর চাপানো যাচ্ছে না। প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুয়ান বিজয় বর্ধনে চব্বিশ জনকে আটক এবং অপরাধীদের শনাক্ত করার কথা বলেছেন। কিন্তু তারা কারা তা স্পষ্ট করে বলেননি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাজিথা সেনারত্নে হামলার পেছনে ‘ন্যাশনাল তাওহীদ জামাত’ নামে শ্রীলঙ্কার একটি উগ্রপন্থী মুসলিম সংগঠন রয়েছে বলে ‘ধারনা’ করার কথা বলেছেন। উত্তেজনা ও গুজব না ছড়ানোর জন্য দেশটিতে সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ রয়েছে।

কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা নয়। জঙ্গী হামলার সঙ্গে উগ্রপন্থী মুসলিম সংগঠন জড়িত থাকলে তা শত মুখে উচ্চস্বরে প্রচার করা হয়। বিশেষ করে সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডে প্রার্থনারত মুসলমানদের ওপর হামলা হওয়ার পর দুইয়ে দুইয়ে চার মেলানো যেখানে সোজা হিসাব। তবে কি অস্ত্র ব্যবসার ধরন পাল্টাচ্ছে? পাল্টাচ্ছে কি রাজনৈতিক চাল?

একটু পেছন ফিরলে দেখবো ২০১৫ সালের সাত জানুয়ারি প্যারিসের শার্লি এবদো পত্রিকায় সন্ত্রাসী হামলার ছ’মাস আগে ‘টাইম ম্যাগাজিন’ তাদের প্রচ্ছদ শিরোনাম করেছিল ‘দ্য ফেস অব বুদ্ধিস্ট টেরর।’ এতে অশিন ভিরাথু নামে মিয়ানমারের এক চরমপন্থী বৌদ্ধ ধর্মগুরুকে তুলে ধরেছিল তারা। তার আগে শ্রীলঙ্কার চরমপন্থী বৌদ্ধ গ্রুপ বোডুবালা সেনার (ইধফঁ নধষধ ংবহধ) নেতা গালাগোদাত্থে নানাসারা (এধষধমড়ফধঃযঃযব এহধহধংৎধ) এক অনুষ্ঠানে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘বৌদ্ধদের আন্তর্জাতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময় এসেছে।’ অশিন ভিরাথু ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন।

‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল নিউইয়র্ক টাইমস’ ষোলো অক্টোবর দু’হাজার চৌদ্দ সংখ্যার সম্পাদকীয় কলামে লিখেছে, ‘দালাইলামা মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ ধর্মীয় চরমপন্থী গ্রুপগুলোর প্রতি মুসলমান সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক আচরণ বন্ধ করার আহ্বান জানান। এ ধরনের উস্কানির ফলে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। জুলাই মাসে দালাইলামা তার ঊনআশিতম জন্মদিনে এ আহ্বান করেছিলেন, কিন্তু এতে তারা সাড়া না দিয়ে সাধারণ জোট গঠনের ঘোষণা দেন।’ এর কিছু দিন আগে শ্রীলঙ্কার মুসলমান ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ওপর বৌদ্ধ সন্ত্রাসী হামলায় অনেক মানুষ নিহত হয়েছিলেন। এসব বিষয় খেয়াল রাখলে মনে করা অসঙ্গত হবে কি যে, ধর্ম নিয়ে কলকাঠি নাড়ার পুরনো কৌশলের পাশাপাশি এখন নতুন চাল সংযোজন হচ্ছে? প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে শক্তিবানদের কাছে ধর্ম সব সময়ই প্রিয়। এ ধরনের ঘটনা তাদের জন্য অব্যহত রাখা জরুরী। আর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র ব্যবসায়ী কারা তা কারোরই অজানা নয়। যুদ্ধ অবস্থার টান টান উত্তেজনা বজায় রাখতে এবং অস্ত্র ব্যবসার মুনাফাকে আরও ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলার জন্য, নিজের নিরাপত্তার জন্য তারা সামরিক খাতে নিরন্তর ব্যয় বাড়িয়ে চলে। আর বিভিন্ন দেশে সংঘাত বা যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে চড়া দামে অস্ত্র বিক্রি করে। এতেও মুনাফার ক্ষিধে মেটে না। তাই দুনিয়াজুড়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে অস্ত্র বাণিজ্য চাঙ্গা রাখতে হয়। ইসলামী জঙ্গীবাদের নামে অস্ত্র বাণিজ্যের প্রথম সফল প্রকল্পের নাম ‘আল কায়েদা।’ ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে সংগঠনটি দুর্দান্তগতিতে বিকশিত হয়েছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদার সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতায়। তারপর সব জল গড়িয়েছে বিশ্ববাসীর সামনেই। হারাবার যাদের তারা সব হারিয়েছে। আর অস্ত্র বাণিজ্যের নেট মুনাফা ঘরে তুলে যুক্তরাষ্ট্র নবনবরূপে রণক্ষেত্রে। বিন লাদেনের প্রয়োজন ফুরিয়েছে এক সময়। আইএসএর দাপটও স্তিমিত। সৌদি আরব, কাতার প্রভৃতি দেশের মাধ্যমে অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য পাঠিয়ে আইএসকেও যথেষ্ট স্বাস্থ্যবান ও শক্তিশালী করেছিল এক সময়।

ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশেসহ দক্ষিণ এশিয়ায় চলছে নতুনরূপে সন্ত্রাসের পরিবর্ধিত সংস্করণের কাজ। পাকিস্তান তো ইসলামী জঙ্গী সংগঠনের পীঠস্থান হয়েই আছে। আল কায়েদা-তালেবানের পর লস্কর-ই-তৈয়েবা ও নানা নামের অনেক জঙ্গী গ্রুপ সে দেশের শোভা বর্ধন করেছে। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী আশির দশক থেকে সন্ত্রাসের যে ধারা তৈরি করেছে তার অনুকূল স্রোতে বেড়ে উঠেছে আরও অনেক সন্ত্রাসী গ্রুপ। আইএসসহ অন্যান্য ইসলামী জঙ্গী গ্রুপ দিয়ে মুসলিম বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হয়েছে। হাতের পাঁচ হিসেবে এখন অন্য ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘শান্তি এলাকা’। প্রয়োজনে এই শান্তির দূতদের অশান্ত করতে তারা সিদ্ধহস্ত হবে তা আর আশ্চর্য কি।

ক্ষমতাশালী দেশগুলো নিজেদের প্রয়োজনে সন্ত্রাসী সংগঠন গড়ে। অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা দিয়ে পরিপুষ্ট করে এবং সবচেয়ে ভয়াবহ হলো এই সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে জড়িয়ে ফেলে।

দার্শনিক টমাস হব্্স বিজ্ঞানের মতো দর্শনকে ধর্মতত্ত্ব থেকে আলাদা করে দেখার কথা বলেছেন। কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিলÑ বিজ্ঞান ঈশ্বরের সৃষ্টি সম্পর্কে আরও অনেক কিছু আবিষ্কার করবে এবং তাতে ঈশ্বর সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বাড়বে। তবে আশঙ্কা করেছেন, ধর্ম হয়ে উঠতে পারে মানব সম্প্রদায়ের বিরোধের উৎস।

টমাস হব্্স দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্ম নিয়ে যা বলেছেন তার দার্শনিক ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই আছে। তবে আজকের দিনে বিশেষ করে এ মুহূর্তে নানাভাবে ধর্মের সরব উপস্থিতির দিকে তাকালে হঠাৎ মনে হতে পারে দুর্দান্ত এক ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন তিনি। আসলেই কি তাই? ‘ধর্ম’ বলতে তিনি কি রাজনীতির মোক্ষম অস্ত্রটির কথা বুঝিয়েছেন? সম্ভবত নয়। সেই নবম থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত ইমাম ফারাবী, ইবনে সিনা, ইমাম গাজ্জালী, ইবনে রুশদসহ অনেক দার্শনিক, বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ যেভাবে লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত হয়েছিলেন আজকের অস্ত্র ঠিক সে রকম নয়। সেকালে অন্ধকার থেকে আলোতে বেরিয়ে আসার পথ রোধের কাজটি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছে ধর্ম। কিন্তু অন্ধকার কেটে আলোর বন্যায় ভেসে যাওয়া যুগে পৌঁছেও ধর্মকে বার বার অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে এবং তার প্রয়োগ অনেক বেশি শাণিত ও কৌশলী।