২৪ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বেলাল চৌধুরী, তার বর্ণাঢ্য বহুমাত্রিকতা

  • ফয়সাল শাহরিয়ার

‘কিছু বা নিয়ম আমি কখনও মানিনি’ : প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত

মৃত্যুই জীবনের শেষ সীমানা, মানতেন তিনি। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, মৃত্যুর এক বছরে পরেও কবি বেলাল চৌধুরী বাঙালী পাঠকের কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন বিভিন্ন কারণে।

বেলাল চৌধুরীর জীবদ্দশায় তাঁর কবিসত্তা ও সম্পাদকসত্তার মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রায় কিংবদন্তিসম খ্যাতি অর্জন করেছিল। অস্বীকার করার উপায় নেই, সম্পাদক হিসেবে উভয় বাংলায় তাঁর অতুলনীয় দক্ষতার ফলে অনেক ক্ষেত্রে ওই পরিচয়ই প্রধান হয়ে দাঁড়াত। কিন্তু সম্প্রতি তাঁর ¯েœহভাজন কবিদ্বয় তারেক সুজাত ও পিয়াস মজিদের সযতœ সম্পাদনায় বেলাল চৌধুরীর ‘সমগ্র কবিতা’ প্রকাশিত হওয়ার ফলে আজকের পাঠকের পক্ষে বেলাল চৌধুরীর প্রবহমান কাব্যচর্চার প্রতি সুবিচার করা সহজতর হয়েছে। পুরনো পাঠকেরা জানেন প্রধানত বিগত শতাব্দীর শেষ ৫০-এর দশকে সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখের ¯েœহছায়ায় বেলাল চৌধুরীর কাব্যচর্চা শুরু হলেও মধ্য-ষাটের দশকে কলকাতা যাওয়ার পরে তা গতি অর্জন করে। বামপন্থী আন্দোলনের ফলে অস্থির, উদ্দাম কলকাতায় বেলাল চৌধুরী কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি কিছুকাল ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা সম্পাদনাও করেন। বেলাল চৌধুরীর কাব্যসমগ্র পাঠান্তে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যেÑ প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা কবিতার মূল স্রোতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কথ্য, ‘অসাহিত্যিক’ শব্দের ব্যবহার, বিপরীতধর্মী ভাবের পাশাপাশি অবস্থান, অস্থির নাগরিকতাÑ ত্রিশোত্তর বাংলা কবিতার সকল লক্ষণই তাঁর কবিতায় স্পষ্টরূপে বিদ্যমান। তাঁর প্রিয় কবি জীবননান্দ দাশের ছায়াও কোথাও কোথাও লক্ষণীয়। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর নাগরিক সমসাময়িকতা। অনন্ত বেলাল চৌধুরীর প্রথম দিককার কবিতা পাঠে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এসব কবিতা ষাটের দশকের উত্তাল কলকাতায় রচিত, যখন অনেক তরুণ কবিই বিশ্বাস করতেন যে অদূর ভবিষ্যতেই প্রতিষ্ঠিত হবে এক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ। একবিংশ শতাব্দীর দৃষ্টিকোণ থেকে ওই বিশ্বাসকে অনেক দূরবর্তী মনে হয়।

বিংশ শতাব্দী পরিণতি লাভ করার সমান্তরালে বেলাল চৌধুরীর কবিতায় ক্রমশ স্থান করে নেয় তাঁর স্বদেশ ও সমসাময়িকতা। তিনি বাংলাদেশকে দেখেন এক অন্য দৃষ্টিতে; তাঁর দেখার ভঙ্গি অনেকটাই অনানুষ্ঠানিক, তাঁর দেখা বাংলাদেশ অনেক ঘরোয়া, আটপৌরে, মায়ের হাতে নিকানো অঙিনার মতো।

সম্পাদনায় বেলাল চৌধুরীর দীক্ষা কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর কাছে মধ্য-ষাটের কলকাতায়। জীবনযাপন ও কাব্যচর্চায় তিনি কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর এক অপরিহার্য সদস্যে পরিণত হন। মধ্য-সত্তরের দশকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্বয়ং ‘দৈনিক কবিতা’ পত্রিকা সম্পাদনায় বেলাল চৌধুরীর অসামান্য অবদানের কথা উল্লেখ করেছিলেন। সম্পাদক বেলাল চৌধুরী কখনোই মনে করতেন না যে সম্পাদিত পত্রিকার জন্য লেখা সংগ্রহের মধ্যেই তার দায়িত্ব শেষ; পত্রিকার অঙ্গসৌষ্ঠবের প্রতি ছিল তাঁর স¯েœহ দৃষ্টি। টাইপোগ্রাফিতে তার ছিল কিংবদন্তিসম খ্যাতি ।

‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে বেলাল চৌধুরী যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, বিগত শতাব্দীর মধ্য-সত্তরের দশকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পরে তিনি বাংলাদেশে তার যথাযথ প্রয়োগ করেন। প্রকৃত পক্ষে বিগত শতাব্দীর সত্তর-আশির দশকে বেলাল চৌধুরী শব্দার্থেই সম্পাদনার জগতে এক প্রবাদ পুরুষে পরিণত হন। সম্পাদক বেলাল চৌধুরীর দরজা তরুণ কবি থেকে প্রৌঢ় ঔপন্যাসিক, সবার জন্যই খোলা থাকত। ফলে ওই সময় তার সম্পাদনায় ‘সাপ্তাহিক সন্ধানী’ ঈর্ষণীয় ঔৎকর্ষ অর্জন করে। তিনিই সম্ভবত একমাত্র বাংলাভাষী সম্পাাদক যিনি একই আকর্ষণে বাধতে পেরেছিলেন সৈয়দ শামসুল হক এবং আবুল খায়ের মোসলে উদ্দিনকে। তাঁর সম্পাদনাকালে ‘সচিত্র সন্ধানী’ পরিণত হয় মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির এক প্রাণকেন্দ্রে। শুধু সাহিত্যিকরাই নয়, ‘সচিত্র সন্ধানীর’ কার্যালয়ে জড়ো হতেন মোঃ খসরু অথবা আলমগীর কবিরের মতো চলচ্চিত্র আন্দোলনের পথিকৃৎরাও। এ সবই আজকে সুদূর স্মৃতির সুরভি।

পরবর্তীকালে বিগত শতাব্দীর মধ্য-আশির দশকে বেলাল চৌধুরী দীর্ঘকালের জন্য ‘মাসিক ভারত বিচিত্রা’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সম্পাদনা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক, উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর ‘মুক্তদ্বার নীতি’ ভারত বিচিত্রা পত্রিকায় অব্যাহত ছিল। আসতেন কবি রফিক আজাদ থেকে শুরু করে তৎকালীন তরুণতম কবিরাও। আরও আসতেন এমন অনেকেই যাদের সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে সাহিত্যের কোন সম্পর্কই নেই। ওই পর্যায়ে ধানম-ির ‘ভারত বিচিত্রা’ কার্যালয় পরিণত হয় বিশ্বের সকল বাংলা ভাষাভাষীর এক মিলন ক্ষেত্রে। আসতেন কলকাতার কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত অথবা বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, বাংলাদেশের কবি রবিউল হুসাইন অথবা কবি হাবিবউল্লাহ সিরাজী।

আরও আসতেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা কানাডা প্রবাসী কবি-গল্পকাররা। বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বাংলা ভাষার সাম্রাজ্য যে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত, ওই সময় ‘ভারত বিচিত্রা’ কার্যালয়ে গেলে তা বোঝা যেত সহজেই।

কবিতা ও সম্পাদনার বাইরেও বেলাল চৌধুরীর ব্যক্তিত্বের এক অন্য মাত্রা ছিল। কোন অর্থেই সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত নন, এমন অনেক অপরিচিত, অর্ধপরিচিত ব্যক্তি বেলাল চৌধুরীর সংস্পর্শে এসে তাৎক্ষণিকভাবে উপকৃত হয়েছেন। স্বভাবসুলভ ঔদার্যে বেলাল চৌধুরী এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা সযতেœ রেখে দিয়েছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে।

সম্প্রতি প্রকাশিত তারেক সুজাত ও পিয়াস মজিদ সম্পাদিত ‘বেলাল চৌধুরীর সমগ্র কবিতা’ বইটির মনোযোগী পাঠকের মনে এক গভীর বিষণœতার জন্ম দেয়। একখ-ে বেলাল চৌধুরীর সারাজীবনের কাব্য ফসল পর্যালোচনান্তে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যেÑ স্বভাবসুলভ ঔদাসীন্যে তিনি তাঁর নিজের কাব্য প্রতিভার প্রতি কি নিষ্ঠুর অবিচার করেছেন। তাঁর নিজস্ব নাগরিক সমসাময়িকতার জন্য যে কবি বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা কবিতার মূলস্রোতের অংশ হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন, স্পষ্টতই তিনি তাঁর জীবনের মধ্য ও শেষ পর্যায়ে তাঁর ঈশ্বর প্রদত্ত কাব্য প্রতিভার প্রতি সুবিচার করেননি। সম্পাদকীয় ব্যস্ততাই এর একমাত্র কারণ নয়; যে কোন ধরনের বৈষয়িক অর্জনের প্রতিই কবি বেলাল চৌধুরীর ছিল এক দুর্লভ নির্লপ্ততা। এক অর্থে বলা যায়, নিজের কাব্য পরিণতির তুলনায়, তাঁর কাছে কোন ¯েœহভাজন তরুণ কবির উন্নতি ছিল অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তরুণ লেখকরা নিঃসন্দেহে উপকৃত হয়েছেন, কিন্তু বেলাল চৌধুরীর নিজস্ব কাব্য প্রতিভা অকল্পনীয়রূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পাঠক পেয়েছেন এক কিংবদন্তি প্রতিম সম্পাদককে, কিন্তু হারিয়েছেন এক গুরুত্বপূর্ণ কবির কাছে পাঠকের যা প্রাপ্য। তবে স্পষ্টতই এ অনুুযোগ আজকে অর্থহীন। মৃৃত্যুর এক বছর পরে বরঞ্চ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বেলাল চৌধুরীর বহুমাত্রিকতা: কবি-সম্পাদক বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে প্রায় সমান উজ্জ্বলতায় উঠে এসেছে সাহিত্য সংগঠক হিসেবে তাঁর অবিস্মরণীয় দক্ষতা। একবিংশ শতাব্দীর একমাত্রিকতার যুগে কোন লেখকের এ ধরনের বিবর্তন অত্যন্ত দুর্লভ। বেলাল চৌধুরী ছিলেন প্রকৃত অর্থেই বিংশ শতাব্দীর এক প্রকৃষ্ট সন্তান, যে শতাব্দীতে একজন দার্শনিক চিরায়ত উপন্যাস রচনা করেছেন এবং একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছেন। সম্ভবত আশা করা অন্যায় হবে না যে পরবর্তী বাঙালী প্রজন্মসমূহও বেলাল চৌধুরীর ওই দুর্লভ বহুমাত্রিকতার যথাযথ মূল্যায়নে সক্ষম হবে।

লেখক : প্রবন্ধিক ও জীবনানন্দ গবেষক