২১ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ওয়াসার পানি দিয়ে বানানো শরবত খেলেন না এমডি

ওয়াসার পানি দিয়ে বানানো শরবত খেলেন না এমডি

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঢাকা ওয়াসার পানি দিয়ে বানানো শরবত পান করেননি ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, আমি তো কারও পানি খাব না। আমি তো খাব আমার পানি। আমি কোনটা খাব না খাব, তা তো আমার ব্যক্তিগত বিষয়। ওয়াসার পানি ‘শতভাগ বিশুদ্ধ’ বলে দাবি করলেও সেই পানি দিয়ে অন্যের বানানো শরবত খেতে আপত্তি জানালেন তিনি।

মঙ্গলবার রাজধানীর জুরাইন এলাকার কয়েকজন ওয়াসার পানি দিয়ে শরবত বানিয়ে এমডিকে খাওয়াতে এসেছিলেন। কিন্তু পুলিশ ও আনসার সদস্যদের বাধার মুখে শরবত নিয়ে তারা ওয়াসা ভবনে ঢুকতে পারেননি। পুলিশ তাদের জানিয়েছেন, এমডি সাহেব অফিসে নেই। এরপর জুরাইনের কয়েকজন ওয়াসা ভবনের সিঁড়িতে বসে পড়েন।

মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে জুরাইন এলাকার কয়েকজনের ওয়াসা ভবনে আসার কথা আগের দিনই সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হয়। এরপর ওয়াসা কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার ওয়াসায় নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য আনসারের পাশাপাশি পুলিশ মোতায়েন করেন। পরিস্থিতি ঘোলা হতে পারে বলে ওয়াসার এমডি মঙ্গলবার কর্মসূচী চলার সময় অফিসে ছিলেন না। এ বিষয়ে ওয়াসার এমডির সঙ্গে কথা বলার জন্য কয়েক দফা ফোন করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে ওয়াসার একজন কর্মকর্তা বলেন, মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে শামিম হাশেম খুকি, তাদের শিশুকন্যা ও বন্ধু মতিউর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ওয়াসা ভবনে এসেছিলেন। কাঁচের জগে করে নিয়ে আসা ওয়াসার পানি দিয়ে শরবত বানিয়ে ওয়াসার এমডিকে খাওয়াতে চেয়েছিলেন তারা।

কিন্তু উপস্থিত পুলিশ ও আনসার সদস্যরা মিজানুর ও তার সঙ্গীদের ওয়াসা ভবনে ঢুকতে বাধা দিয়ে জানালেন, এমডি সাহেব অফিসে নেই। আমরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তিনি অফিসে এলেই আপনাদের জানানো হবে। কর্মসূচী চলা পর্যন্ত ওয়াসার এমডি অফিসে আসেননি।

সম্প্রতি টিআইবির এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাসাবাড়িতে পানি ফোটাতে বছরে পোড়ে ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাস।

টিআইবির (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত ২০ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করে টিআইবির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে ঢাকা ওয়াসা। টিআইবির প্রতিবেদন মনগড়া হিসেবে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী তাকসিম এ খান টিআইবির প্রতিবেদন নিয়ে বলেছেন, ওয়াসার পানি ফুটিয়ে খাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। ওয়াসা যে পানি উৎপাদন করে তার প্রতিটি ফোঁটাই সুপেয়। টিআইবি একপেশে মনগড়া একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনের কোন ভিত্তি নেই। এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করে ঢাকা ওয়াসাকে মানুষের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করেছে। ওয়াসার ওই সংবাদ সম্মেলন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। ওয়াসার এমডি বলেন, গত ১৭ এপ্রিল টিআইবির পক্ষ থেকে ‘ঢাকা ওয়াসা : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসার পানি ফুটিয়ে পান করতে গ্রাহককে প্রতি বছর ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাস পোড়াতে হয়। ৯১ শতাংশ গ্রাহক ওয়াসার পানি ফুটিয়ে পান করেন। ওয়াসার সেবা নিতে হলে সাড়ে ৩৭ শতাংশ গ্রাহককে ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া ঢাকা ওয়াসায় সুশাসনের অভাব, এমডির একনায়কত্ব, অনিয়ম, জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যর্থতাসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয় ওই প্রতিবেদনে।

টিআইবির প্রতিবেদনের জবাব দিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তাকসিম এ খান তার দায়িত্ব পালনের বিগত প্রায় এক দশক সময়ে ওয়াসার সফলতার চিত্র তুলে ধরেন। বিদেশী গণমাধ্যমে ঢাকা শহরের পানি ব্যবস্থাপনার সফলতা সংবলিত বিভিন্ন প্রতিবেদনও সাংবাদিকদের হাতে পৌঁছে দেন। ওয়াসার এমডি বলেন, টিআইবির গবেষণাপত্রের ধরন, কৌশল ও উপস্থাপন দেখে এটা সহজেই দৃষ্টিগোচর হয় যে মনগড়া তথ্য দিয়ে ঢাকা ওয়াসাকে নগরবাসীর কাছে হেয় প্রতিপন্ন করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এটি কোন প্রফেশনাল গবেষণা নয়, এটি একটি একপেশেও প্রতিবেদন। এটি তাদের মনগড়া। এই প্রতিবেদনের ফলে ওয়াসা সম্পর্কে জনমনে একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হবে। যাতে জনমনে কোন ভ্রান্ত ধারণা না থাকে সেজন্য আজকের এই সংবাদ সম্মেলন। ওয়াসার উৎপাদিত প্রতিটি পানির ফোঁটাই সুপেয় হিসেবে উল্লেখের পরই সাংবাদিকদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে শুরু করেন তাকসিম এ খান। একজন সাংবাদিক তার বাসার ট্যাপ থেকে দুই গ্লাস পানি পানের অনুরোধ জানান। আরেকজন সাংবাদিক জানতে চান, এখানে যারা আছেন কেউ ওয়াসার পানি না ফুটিয়ে পান করেন কিনা। এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকরা হাত তুলে জানান তারা প্রত্যেকেই পানি ফুটিয়ে পান করেন। ওয়াসার পানির মানের প্রতি তাদের কোন আস্থা নেই। আরেকজন সাংবাদিক বলেন, সংবাদ সম্মেলনে ওয়াসার দু’জন পরিচালক মঞ্চে বসে আছেন, যাদেরকে ওয়াসার জনবল কাঠামোকে অবজ্ঞা করে অবৈধভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আর ওয়াসার বর্তমান যিনি প্রধান প্রকৌশলী তাকে জ্যেষ্ঠ ছয়জনকে সুপারসিড করে পদোন্নতি দিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর পদে বসানো হয়েছে। এ রকম নানা অনিয়ম নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে অনেক প্রশ্নই তিনি এড়িয়ে যান। এক পর্যায়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকা ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের সদস্য সাংবাদিক শাবান মাহমুদ বলেন, আজ ওয়াসার এমডিকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হচ্ছে। তবে আগে কি হয়েছে তা আমি জানি না। আমি বোর্ডের সদস্য হওয়ার পর থেকে কোন অনিয়ম হয়নি। অনেক সিদ্ধান্ত বোর্ডের আপত্তির কারণে বাস্তবায়িত হয়নি।

এমডি বলেন, ওয়াসার পানি সুপেয়। তবে পাইপলাইনে দু’একটি লিকেজ ও বাসাবাড়ির পানির ট্যাঙ্ক ঠিকমতো পরিষ্কার না করার কারণে পানি দূষিত হয়ে থাকতে পারে। এ বিষয়ে ওয়াসা বিভিন্ন সময় নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষাও করেছে। কিন্ত টিআইবি কোন পরীক্ষা না করেই মনগড়া প্রতিবেদন দিয়েছে। ওয়াসা টিআইবির প্রতিবেদনের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।