২৩ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিমানবন্দর এলাকায় কাটা হয়েছে সাত হাজার গাছ

  • বিক্রিও হয়েছে পানির দামে

মশিউর রহমান খান ॥ নিকুঞ্জ থেকে বিমানবন্দর গোলচত্বর হয়ে উত্তরা পর্যন্ত সব গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। গোটা এলাকা এখন মরুময়। গাছের সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। বিক্রিও করা হয়েছে পানির দামে। পরিবেশবিদরা বলছেন, উন্নয়নের জন্য এত গাছ কাটার প্রয়োজন ছিল না। অন্তত অর্ধেক গাছ বাঁচিয়ে রাখা যেত। সিভিল এভিয়েশন বলছে, থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের স্বার্থেই বন বিভাগের অনুমতি ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এ উদ্যান খালি করতে হয়েছে। বন বিভাগ বলছে, সিভিল এভিয়েশনের পরামর্শেই একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ওই জায়গা খালি করে দিতে হয়েছে।

বনবিভাগ সূত্র জানিয়েছে, নিকুঞ্জ থেকে বিমানবন্দরের গোলচত্বর হয়ে উত্তরা পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার জুুড়ে ছড়িয়ে থাকা ওই উদ্যানে ছোট বড় অন্তত হাজার সাতেক গাছ ছিল। কুর্মিটোলা নামে পরিচিত এই এলাকায় শতবর্ষী বহু গাছ ছাড়াও ১৯৬২ সালে কুর্মিটোলা বিমানবন্দর নির্মাণের মহাপরিকল্পনায় ও পরবর্তীতে লাগানো হয় অনেক গাছ। এইসব গাছের বয়স ৫০ থেকে ৬০ বছর। সিভিল এভিয়েশন ও বনবিভাগের সম্মতিক্রমে এ উদ্যানের সবগুলো বৃক্ষ কাটার দরপত্র আহ্বান করে। দরপত্রে সবগুলো গাছ মাত্র ৯৯ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, গাছগুলো যথাযথ দরপত্রে বিক্রি করা হলে অন্তত ছয় কোটি টাকায় বিক্রি করা সম্ভব ছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অত্যন্ত তাড়াহুড়া করে গাছগুলো বিক্রি করে কেটে ফেলা হয়েছে। এত তাড়াতাড়ি এগুলো কাটার কোন প্রয়োজনই ছিল না। বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের কাজ এখনও অনেক দেরি। এখনও প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যাদেশই দেয়া হয়নি। আগামী জুলাই-আগস্ট মাসে কার্যাদেশ দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি আরও পেছাতে পারে। নির্মাণ কাজ শুরুর আগেই কি কারণে তড়িঘড়ি করে গাছগুলো কেটে গোটা এলাকা মুরুভূমিতে পরিণত করা হয়েছে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পর প্রয়োজনমত গাছ কাটা হলে অনেক গাছই রক্ষা পেত। পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে বৃক্ষরোপণ ও বনায়নের গভীর সম্পর্ক থাকায় নক্সা অনুযায়ী আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জীবন্ত গাছ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে এবং অনেক গাছই রেখে দিয়ে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের সুযোগ ছিল। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আরও সতর্ক হতে পারতেন।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষ রোপণ ও বনায়নের ওপর বিশ্বব্যাপী সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। বতর্মান সরকার বৃক্ষরোপণ ও বনায়নে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মান ‘চ্যাম্পিয়নস অফ দ্য আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজে বৃক্ষরোপণ করেন এবং সব সময় বনজ ও ফলদ বৃক্ষ রোপণের জন্য তাগিদ দিয়ে থাকেন। গত বছরের জুলাইয়ে জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও মাসব্যাপী বৃক্ষমেলার উদ্বোধনকালে নিজ দেশের কথা চিন্তা করে পরিবেশ রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী সকলকে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান। সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি দেশের সকল নাগরিককে কমপক্ষে তিনটি করে গাছ লাগানোর জন্য তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এখন রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের দায়িত্ব। অথচ বিমানবন্দর এলাকায় গাছ কাটার সময় প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে। বেবিচক ও বন অধিদফতরে অনুসন্ধানে জানা যায়, বেবিচকের মালিকানাধীন জমিতে আলোচ্য গাছগুলো থাকলেও এসব গাছের মালিকানা বন অধিদফতরের সামাজিক বনায়ন বিভাগের। টার্মিনাল ভবন নির্মাণের জন্য গাছগুলো কেটে অপসারণ করতে বন বিভাগকে বেবিচক থেকে তাগিদ দেয়া হয়েছে। গাছ বিক্রির জন্য ৬০টি লটে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে মোট ৯৯ লাখ টাকা দর পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, লট ও গাছ সংখ্যার তুলনায় দরপত্রে প্রাপ্ত দর খুবই কম। এতে সরকারের বিশাল অংকের টাকা ক্ষতি হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিমানবন্দর রোডের পশ্চিম দিকে বর্তমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১ ও ২ এবং অভ্যন্তরীণ ও ভিভিআইপি টার্মিনালসমূহের দক্ষিণে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়।

এখানে টার্মিনাল ভবন ছাড়াও বহুতল কারপার্কিং তৈরি হবে। এ জন্য ঢাকা-ময়মনসিংহ রোড থেকে পশ্চিম দিকের বিশাল এলাকা জুড়ে থাকা হাজার হাজার গাছ কেটে সাফ করে ফেলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের পশ্চিম পার্শ্বের গাছসমূহ কাটার প্রয়োজন ছিল না। এ ছাড়া নক্সার খালি জায়গার গাছগুলোও রেখে দেয়া যেত। টার্মিনাল নির্মাণের জন্য একান্তই যেসব গাছ কাটার প্রয়োজন হত-তাও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জীবন্ত অবস্থায় গাছ তুলে নিয়ে বিমানবন্দরের অন্য এলাকায় স্থানান্তর সম্ভব ছিল। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সহায়তায় তৃতীয় টার্মিনাল নির্মিত হচ্ছে।