২১ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যেভাবে ঘুরে দাঁড়াল অদম্য অস্ট্রেলিয়া

  • মোঃ রাশেদুল হক

ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়াকে বলা হয় অদম্য এক দল। কোন অবস্থাতে হার না মানা, হাল না ছেড়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়া তাদের রক্তে মিশে আছে। অতীতে একাধিকবার ফেবারিট না হয়েও অসিদের বিশ্বকাপ জয় অদম্য মানসিকতারই উদাহরণ। গত বছর কেপটাউন টেস্টে বল টেম্পারিংয়ের কারণে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ হন স্টিভেন স্মিথ ও ডেভিড ওয়ার্নার। বড় দুই তারকাকে হারিয়ে হঠাৎ পতনের মুখে পড়ে কুলিন অসিরা। ২৬ ওয়ানডের ২২টিতে হারের পর অনেকে অস্ট্রেলিয়ার কোন আশাই দেখছিলেন না। আরেকটি বিশ্বকাপ যখন দ্বারে সেই তারাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে দুর্দান্ত প্রতাপে। হারিয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের মতো পরাশক্তিকে। নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষে স্মিথ-ওয়ার্নারকে জায়গা করে দিতে নির্বাচকদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে। বাদ পড়তে হয়েছে পিটার হ্যান্ডসমম্বের মতো ফর্মের তুঙ্গে থাকা ব্যাটসম্যানকে।

ভারত সফরে প্রথম দুই ওয়ানডেতে পরাজিত হওয়া সত্ত্বেও শেষ তিনটি জিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে সিরিজ জিতে নেয় বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। ২০০৯ সালের পর ভারতের মাটিতে এটা ছিল অস্ট্রেলিয়া দলের প্রথম ওয়ানডে সিরিজ জয়। এর মাধ্যমে ভারত-পাকিস্তান মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়া দল এক নাগারে ৮ ওয়ানডে ম্যাচ জয়ের রেকর্ড গড়ে। আরব আমিরাতের মাটিতে সবশেষ সিরিজ থেকে দেশের বাইরে পূর্ণাঙ্গ জয়ের ধারায় ফেরে দলটি। স্মিথ-ওয়ার্নারবিহীন অজি বাহিনীর কাছে ঘরের মাঠে ৫ ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজে ধবল ধোলাই হয় স্বাগতিক পাকিস্তান। অসিদের পারফর্মেন্স কেবলমাত্র ক্রিকেট বিশ্বকে বিস্মিত করেনি, দীর্ঘ ১৮ মাস ধুঁকতে থাকার পর দলটির পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠার প্রথম লক্ষণও ফুটে ওঠে। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে ফিরে যাওয়া যাক। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারি ক্রিকেট পাগল অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটা বড় ধাক্কা হয়ে আসে। কেপটাউন টেস্টে কলঙ্কজনক এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে দলটির তৎকালীন অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ, সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নারকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। যার কারণে ক্যাঙ্গারুদের মনোবল একদম ভেঙ্গে যায়। এমনকি নিজেদের লড়াকু মানসিকতা পর্যন্ত দেখাতে পারেনি দলটি। পুরো ২০১৮ সালে ১৩ ম্যাচের মধ্যে মাত্র দুটি ওয়ানডে ম্যাচ জয় করতে সক্ষম হয় পাঁচ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলটি। দলটির অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, ২০১৮ সালের নবেম্বরে নিজ মাঠে চিরপ্রতিদ্বন্দী দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে প্রথম তিন ওয়ানডে পরাজিত হতে হয়। এরপর ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে নিজ মাঠে ভারতের কাছে ১-২ ব্যবধানে সিরিজ হারে অস্ট্রেলিয়া। এই পরাজয়ের পর বিশ্বকাপ শিরোপা অক্ষণœ রাখার আগে মুক্তি পেতে তাদের হাতে ছিল মাত্র দশটি ওযানডে। ভারত সফরে প্রথমবারের মতো সঠিক কম্বিনেশন খুঁজে পেতে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া।

উসমান খাজা ও অধিনায়ক এ্যারন ফিঞ্চ দলকে যথার্থ ওপেনিং পার্টনারশিপ এনে দিতে শুরু করেন। ভারতে তিন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাটিতে চার ম্যাচে তাদের ওপেনিং জুটি অর্ধ শতক ছাড়িয়ে যায়। যার মধ্যে তিন ম্যাচেই তাদের ওপেনিং জুটি শত রান ছাড়িয়ে যায়। দুই সিরিজেই পারফর্মেন্সের ধারাবাহিকতা দিয়ে শেষ পর্যন্ত দলে নিজের জায়গা পোক্ত করতে সক্ষম হন খাজা। ভারতে পাঁচ ইনিংসে দুটি করে হাফ সেঞ্চুরি ও সেঞ্চুরিতে মোট ৩৮৩ রান করে ‘সিরিজ সেরা’ খেলোয়াড় নির্বাচিত হন তিনি। পাকিস্তানের বিপক্ষেও তিনি একই ফর্ম অব্যাহত রাখেন। শেষ ওয়ানডেতে ৯৮ বলে ১১১ রানসহ তিনটি হাফ সেঞ্চুরি করেন খাজা।

ভারতের বিপক্ষে সিরিজে ফর্ম ফিরে পেতে কিছুটা ধুঁকেছেন ফিঞ্চ। তবে তবে পাকিস্তান সিরিজে ছিলেন তুঙ্গে। প্রথম ও দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ক্যারিয়ার সেরা অপরাজিত ১৫৩ রানসহ দুটি সেঞ্চুরি করেন তিনি। অল্পের জন্য তৃতীয় ম্যাচে শত রান থেকে বঞ্চিত হন তিনি। ১১২ দশমিক ৭৫ গড়ে মোট ৪৫১ রান করে ‘সিরিজ সেরা খেলোয়াড়’ নির্বাচিত হন এ তারকা ওপেনার। রান পেয়েছেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েলও। স্ট্রাইক রেট ছিল অবিশ্বাস্য। সংযুক্ত আরব আমিরাতে তার স্ট্রাইক রেট ছিল প্রায় ১৪০। পাকিস্তানী বোলারদের বেধড়ক শায়েস্তা করে তিন ম্যাচেই করেছেন হাফ সেঞ্চুরি। প্রয়োজনের সময় মিডল অর্ডারে রান পেয়েছেন শন মার্শ, মার্কাস স্টয়নিস, এ্যাস্টন টার্নার এবং এ্যালেক্স ক্যারি। এশিয়ান কন্ডিশনে স্পিন এবং পেস উভয় বোলিংয়ের বিপক্ষেই খুবই ভাল করার প্রমাণ দিয়েছেন ব্যাটসম্যানরা। স্পিনে এ্যাডাম জাম্পা ও নাথান লেয়নের পারফর্মেন্স ছিল দৃষ্টিকাড়া। জাই রিচার্ডসন, জেসন বেহেনডর্ফ, নাথান কুল্টার নাইলদের সঙ্গে ইনজুরি কাটিয়ে মিচেল স্টার্ক যোগ দেয়ায় চ্যাম্পিয়নদের পেস আক্রমণও হয়েছে নিজেদের মতো দুর্ধর্ষ।

স্মিথ-ওয়ার্নারের জন্য যা ‘পৌষ মাস’, হ্যান্ডসকম্বের জন্য সেটি ‘সর্বনাশ।’ ব্যাটসম্যানদের তীব্র লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ স্কোয়অডে জায়গা পাননি সম্প্রতি ভারতে দারুণ পারফর্ম করা হ্যান্ডসকম। আর চোটের কারণে নেই জশ হ্যাজেলউড। হ্যান্ডসকমের বাদ পড়া বিস্ময়ের। এ বছর ১৩ ওয়ানডেতে এক সেঞ্চুরি ও তিন ফিফটিতে তার গড় ৪৩.৫৪, স্ট্রাইক রেট ৯৮.১৫। গত মাসে ভারত সফরে ৩৫৯ রান তাড়া করে জয়ের ম্যাচে খেলেছিলেন ১০৫ বলে ১১৭ রানের দুর্দান্ত ইনিংস। সবশেষ অস্ট্রেলিয়ার টানা আট ওয়ানডে জয়ে ১০০’র বেশি স্ট্রাইক রেটে ব্যাটিং করা অস্ট্রেলিয়ার তিন ব্যাটসম্যানের একজন তিনি। হ্যান্ডসকমের জায়গা অনেকটা নিশ্চিত ধরা হয়েছিল আরেকটি কারণেও। দলে সম্ভাব্য দ্বিতীয় উইকেটরক্ষক ছিলেন তিনি। কিন্তু তাকে না রাখায় স্কোয়াডে একমাত্র কিপার এখন এ্যালেক্স ক্যারি। দলে ব্যাটসম্যানদের আধিক্যের কারণে কাউকে বাইরে থাকতেই হতো, দুর্ভাগা হ্যান্ডসকমের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচক।

মোহালিতে ৩৫৯ রান তাড়া করে পাওয়া সেই জয়ে ৪৩ বলে ৮৪ রান করা এ্যাশটন টার্নারও স্কোয়াডে জায়গা পাননি। দলের বাইরে থাকাদের তালিকায় দারুণ সব ক্রিকেটারের নামই প্রমাণ করছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের শক্তির গভীরতা। বিশ্বকাপ এলেই যেন জেগে ওঠে ট্রফিটাকে প্রায় পৈত্রিক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলা অসিরা!