১৯ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পোশাক খাতে অগ্রগতি হলেও শ্রমিক অধিকারে গুরুত্ব নেই

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সাভারের রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পরবর্তী ছয় বছরে তৈরি পোশাক খাতে অনেক অগ্রগতি হলেও মালিকপক্ষ শ্রমিক অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তাকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ফলে গার্মেন্টস সেক্টরের বিভিন্ন উদ্যোগ ধীরগতিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ অবস্থা নিরসনে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তৈরি পোশাক খাতে দুর্ঘটনাজনিত মামলাসমূহ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনসহ ১২ দফা সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্টদের তাগিদ দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি)। মঙ্গলবার রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে তৈরি পোশাক খাতে সুশাসন ঃ অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান, আউটরিচ এ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মনজুর-ই-আলম এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও গবেষণাটির তত্ত্বাবধায়ক আবু সাঈদ মোঃ জুয়েল মিয়া। গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রণয়ন ও উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের এ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল হুদা মিনা এবং ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোঃ মোস্তফা কামাল উপস্থিত ছিলেন।

তৈরি পোশাক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে টিআইবির প্রস্তাাবিত ১২ দফা সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে তৈরি পোশাক খাতে তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য একক কর্তৃপক্ষ গঠন করা। শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করার বিষয়ে নিয়োগকারীর একচ্ছত্র ক্ষমতা বিলোপ করা, শ্রমিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বৃদ্ধি করা। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাসমূহের দ্রুত নিষ্পত্তি করা, শ্রম অধিদফতরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রসমূহ তৈরি পোশাক শিল্পাঞ্চলসমূহে প্রতিস্থাপন করা। শ্রমিক আন্দোলন পরবর্তী চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের চাকরিতে পুনর্বহালের ব্যবস্থা গ্রহণ ও দায়েরকৃত উদ্দেশ্যমূলক মামলাসমূহ প্রত্যাহার করে ভয়-ভীতিহীন শান্তিপূর্ণ শ্রম পরিবেশ সৃষ্টি করা। ত্রিপক্ষীয় কাউন্সিল কার্যকর করার লক্ষ্যে সুস্পষ্ট কার্যবিধি প্রণয়ন, নির্দিষ্ট আলোচ্যসূচী অনুসরণ, সকল পক্ষের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত এবং পর্যবেক্ষক হিসেবে নাগরিক সমাজকে অন্তর্ভুক্ত করা। সরকার, বায়ার ও আইএলওর সমন্বিত উদ্যোগে আরসিসির আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়, অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগের ফলে কারখানা নিরাপত্তা, তদারকি, শ্রমিকের মজুরি, সরকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মালিকপক্ষ এখনও ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এবং রফতানি প্রবৃদ্ধিকে প্রাধান্য দিলেও শ্রমিক অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তাকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এছাড়া বিভিন্ন অংশীজন কর্তৃক গৃহীত উদ্যোগসমূহের ৩৯ শতাংশ বাস্তবায়িত হলেও অপর ৪৯ শতাংশ উদ্যোগের বাস্তবায়ন এখনও চলমান এবং ১২ শতাংশ উদ্যোগ ধীর গতিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে বা স্থবির হয়ে আছে।

গবেষণায় বলা হয়, গত ছয় বছরে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগের ফলে তৈরি পোশাক খাতে আইন প্রয়োগ, ব্যবসা বান্ধব নীতি সহায়তা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও কারখানার নিরাপত্তা বৃদ্ধি, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, শ্রমিক অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং শুদ্ধাচার চর্চাসহ নানা খাতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ও অগ্রগতি হয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে এখনও নানাবিধ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আইনী ক্ষেত্রে দেখা যায়, গেজেট আকারে প্রকাশিত বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন ২০১৮-এ ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে কারখানার মোট শ্রমিকের ৩০ শতাংশের সমর্থনের পরিবর্তে ২০ শতাংশ সমর্থনের বিধান করা হয়েছে এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা স্থায়ী অক্ষমতার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ যথাক্রমে দুই লাখ ও দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া শ্রম বিধিমালা ২০১৫ প্রণয়ন করে শ্রমিকদের জন্য বছরে দুটি উৎসব ভাতার বিধান এবং ইপিজেড শ্রম অধ্যাদেশ ২০১৯ প্রণয়ন করাসহ আরও বেশ কিছু আইনী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে উৎসবকালীন ছুটি, প্রসূতিকালীন সুবিধা, মালিকের শাস্তি কমানো, শ্রম আইনের বিভিন্ন ধারা অপপ্রয়োগের সুযোগ ইত্যাদি নানাবিধ চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে।

সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনা পরবর্তী ছয় বছরে তৈরি পোশাক শিল্পখাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় লক্ষণীয় উন্নতি হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনগত দুর্বলতা ও প্রায়োগিক ঘাটতির কারণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে। গবেষণা প্রতিবেদনে চিহ্নিত ঘাটতিগুলো উত্তরণ বিলম্বিত হলে অর্জিত অগ্রগতির টেকসই-এর সম্ভাবনা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। আইনী প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে রানা প্লাজায় দুর্ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ন্যায়বিচার হয়নি। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে কয়েক হাজার মামলা ঝুলে আছে। আমরা দাবি জানাচ্ছি যে, রানা প্লাজা ট্রাজেডিসহ অত্যন্ত গুরুতর অপরাধের মামলাসমূহ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল করে দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করতে হবে এবং যারা অপরাধের জন্য দায়ী তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। সেটি করতে না পারলে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাবে। কারণ যারা মালিকপক্ষ তারা ভেবে নিবেন যে- অন্যায় করে, অপরাধ করে, আইনের লঙ্ঘন করে পার পাওয়া যায়।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন রেয়াতসহ যে সমস্ত সুবিধা পান রাষ্ট্রীয় বৃহত্তর স্বার্থে তা অনেকাংশেই যথার্থ বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়গুলোর প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে আমরা প্রত্যাশিত দৃষ্টির ঘাটতি দেখতে পাই। মালিকপক্ষ এ বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব দিতে সবসময়ই অনীহা দেখিয়েছেন। বিদেশী ক্রেতারাও আমাদের দেশে কমপ্লায়েন্স কার্যকরে যেভাবে ভূমিকা রেখেছেন এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পণ্যমূল্য নির্ধারণে তারা সেভাবে রাজি হননি।

গবেষণায় দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাদিহিতা নিশ্চিতে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যেমন, কলকারখানা অধিদফতরের পরিদর্শনে জবাবদিহিতা নিশ্চিতে অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে মনিটরিং টিম গঠন এবং ডিজিটাল মনিটরিং-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ে গণশুনানি, পরিদর্শন, মামলা দায়ের, হেল্পলাইনে অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করা হয়েছে।