২৪ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাকবাহিনীর ত্রিমুখী আক্রমণে বরিশাল দখল ॥ ২৫ এপ্রিল, ১৯৭১

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল দিনটি ছিল রবিবার। পকিস্তানের বিগত চব্বিশ বছরের ইতিহাস মানবসভ্যতার ক্ষেত্রে এক কলঙ্কময় অধ্যায়। এই দীর্ঘ চব্বিশ বছর যাবত পশ্চিম শাসক ও শোষক গোষ্ঠী তাদের শ্রেণীস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বার বার শুধু জনগণের কণ্ঠই রোধ করেনি অধিকন্তু জনগণের অন্তরে আশা ও ভাষার মূর্ত প্রতীক নির্ভীক মুখপত্রগুলোর উপরও চালিয়েছে বিবেকহীন ধারলো কাঁচি। পশ্চিমা হানাদার বাহিনী, যারা পৃথিবীর বুক থেকে বাঙালী জাতিকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিলেন- যাদের আক্রমণে ১৪ লাখ নিরস্ত্র লোক নিহত- যাদের অত্যাচারে ৯০ লাখ নিরপরাধ, নিঃসহায় মানুষ নিজেদের আবাসভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে- তাদের ক্ষমা নেই। বাঙালী জাতি তার সমুচিত প্রতিশোধ নিতে আজ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়। এই দিন দশজন মার্কিন সিনেটর ওয়াল্টার মন্ডেল, এডওয়ার্ড মাস্কি, হিউবার্ট হামফ্রে, বার্চ বে, জর্জ ম্যাকগভার্ন, ফ্রেড হ্যারিস, হ্যারল্ড হিউস, উইলিয়াম প্রক্সমায়ার, টমাস এগ্রেটন ও ক্লিফোর্ড কেস এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, পাকিস্তান সরকার যতদিন না বাংলাদেশের জন্য আপদকালীন ভিত্তিতে ত্রাণ কাজের ব্যবস্থা করবে এবং আন্তর্জাতিক রেডক্রসকে সেখানে কাজ করতে দেবে, ততদিন পাকিস্তানকে সাহায্যদাতা পাশ্চাত্য দেশসমূহ ও জাতিসংঘের উচিত তাদের সমস্ত বৈদেশিক সাহায্য বন্ধ করে দেয়া। তৃতীয় বেঙ্গলের যোদ্ধাগণ পশ্চিম-দিনাজপুরের কামারপাড়া স্কুলে ক্যাম্প স্থাপন করে। পাকবাহিনী বরিশালের ওপর তিন দিক থেকে আক্রমণ চালায়। পাকসেনাদের একটি দল মলাদির দিক থেকে শেলিং করতে করতে এবং অন্য দুইটি দল খুলনা ও ফরিদপুর থেকে মার্চ করতে করতে বরিশালের দিকে অগ্রসর হয়। চারটি জেট বিমান বরিশালের ওপর অনবরত বোমা বর্ষণ করে। ছয়টি হেলিকপ্টারযোগে পাকবাহিনী বরিশালের অসংখ্য ছত্রীসেনা নামিয়ে দেয়। প্রচণ্ড লড়াই শেষে পাকবাহিনী বরিশাল শহর দখল করে নেয়। মুক্তিযোদ্ধারা বরিশাল শহরের চার মাইল দূরে লাকুটিয়া জমিদার বাড়িতে তাদের ঘাঁটি স্থানান্তর করে। বরিশাল শহরের কয়েক মাইল উত্তরে জুনাহার নামক স্থানে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকসেনাদের মধ্যে প্রচণ্ড গোলা বিনিময় হয়। বরিশালের গৌরনদীর উত্তরে কটকস্থল নামক স্থানে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ ব্যুহ রচনা করে। বানিয়াচং উপজেলার পূর্ব সীমান্ত কালাইনঞ্জুরা গ্রামের ঝোঁপঝাড়ে আগুন জ্বলছে, চতুর্দিকে মানুষের আর্তনাদ এবং প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছোটাছুটি। যুদ্ধ বিমান ঘুরপাক খাচ্ছে এদিক হতে ওইদিক, মানুষ প্রাণ বাঁচানোর জন্য যার যার গন্তব্যে ছোটাছুটি করছে। যুদ্ধ বিমান কালাইনঞ্জুরা গ্রামে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়েছে। বিমান হামলার পর প্রতিটি বাড়িতে মাটির নিচে গর্ত করে বাঙ্কার গড়ে তোলা হয়েছিল। বিমানের আওয়াজ পেলেই সবাই এই বাঙ্কারের ভেতর চলে যেত। সেই দিন ১৫-২০ মিনিটের এই বিমান হামলায় লণ্ড-ভণ্ড করে দিয়েছিল কালাইনঞ্জুরা এবং হলদারপুর গ্রাম। বিকেলে পাকবাহিনী গোপালগঞ্জের মানিকদাহ ও হরিদাশপুরে প্রবেশ করে। পাকিস্তানের প্রাক্তন বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াহিদুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত স্বাধীনতা-বিরোধীদলের সহায়তায় পাকবাহিনী গোপালগঞ্জ স্টেডিয়াম, ঈদগাহ মাঠ এবং কলেজে ক্যাম্প স্থাপন করে। এদিন নওগাঁর কুমরিয়া, জাফরাবাজ, লক্ষণপুর, মোহনপুর, হাঁপানিয়া, একডালা ও মাধাইমুরী গ্রামে পাকহানাদার বাহিনী আক্রমণ চালায়। পাক বর্বরদের অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ডে গ্রামের পর গ্রাম ভস্মীভূত হয় এবং কুমরিয়া গ্রামের মেরু ম-ল, জাফরাবাজ গ্রামের আকালু মণ্ডল, ফয়েজ মণ্ডল, আলী মণ্ডল ও মোহনপুর গ্রামের ১১ জন নিরীহ মানুষ শহীদ হন। নওগাঁ জেলার তিলকপুর ইউনিয়নের ফতেপুর গড়ের হাটে পাকহানাদার বাহিনী হামলা চালায়। বর্বরদের এ হামলায় ১৩ জন নিরীহ মানুষ শাহাদাতবরণ করেন। মুক্তিবাহিনী করেরহাট থেকে পিছু হটে রামগড়ে চট্টগ্রাম সেক্টরের সদর দফতর স্থাপন করে। সামরিক কর্তৃপক্ষ খ-অঞ্চল (বাংলাদেশ)-কে তিনটি সামরিক সেক্টরে ও ১০টি সাব-সেক্টরে ভাগ করে। সেক্টর তিনটি হচ্ছে- ঢাকা, কুমিল্লা ও বগুড়া। কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কমিটির মিশন সফল করার উদ্দেশ্যে জেলা ও মহকুমা সদরে শান্তি কমিটি গঠনের জন্য কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির প্রতিনিধিদের পাঠানোর ঘোষণা দেয়। রাজশাহীতে আয়েন উদ্দিনের নেতৃত্বে জামায়াত নেতা আফাজউদ্দিনকে আহ্বায়ক করে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট জেলা ‘শান্তি কমিটি’ গঠিত হয়। ঢাকা পিডিপি-র সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল হান্নান এক বিবৃতিতে জানান, পূর্ব পাকিস্তানের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাবলীর জন্যে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণরূপে দায়ী। তাদের আসল উদ্দেশ্য আমাদের পবিত্র ইসলামী রাষ্ট্রের অংশকে ছিনিয়ে নিয়ে ভারতের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা। নিউইয়র্কে পাকিস্তান হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারির পদপর্যাদায় ভাইস কনসাল আবুল হাসান মাহমুদ আলী পদত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। মওলানা ভাসানী সোভিয়েত রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের কাছে পাকিস্তান বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে বর্বরোচিত অত্যাচার চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। একাত্তরের এই দিনে দৈনিক যুগান্তর ময়মনসিংহ ও ফরিদপুরে পাক আক্রমণ প্রতিহত শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মুক্তিফৗজ আজ বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ খণ্ডে ময়মনসিংহ ও ফরিদপুরে পাকিস্তানী সৈন্যদের আক্রমণ প্রতিহত করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের বাড়ি যে জেলায় সেই ফরিদপুরে মুক্তিফৗজ একটি পাকিস্তানী সৈন্যদলের সঙ্গে প্রচণ্ড লড়াইয়ে নিযুক্ত আছেন। এই সৈন্যদলটি গতকাল গোয়ালন্দঘাটে এসে নামে। তারা রাজবাড়ীর দিকে অগ্রসর হলে তাদের সেই অগ্রগতি প্রতিহত করা হয়। পাকসৈন্যরা কামারখালীতে নদী পার হবার চেষ্টা করলে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সেই চেষ্টাও ব্যর্থ করে দেন। ময়মনসিংহ শহরে পাক সৈন্যদল ও মুক্তিবাহিনীর মধ্যে এখন প্রচ- লড়াই চলছে। কুষ্টিয়ায় পাকসৈন্য ও মুক্তিফৌজের মধ্যে যুদ্ধ চলছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। ময়মনসিংহে প্রচণ্ড যুদ্ধ সীমান্তের ওপার থেকে খবর এসেছে যে, বাংলাদেশের উত্তর খণ্ডে ময়মনসিংহে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য ও মুক্তিবাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড লড়াই হচ্ছে। পাকসৈন্যদের একটি অগ্রবর্তী দল গতকাল ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশ করে এবং ডেপুটি কমিশনারের বাংলো ও বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চলে তুমুল লড়াই হয়। মুক্তিযাদ্ধারা ময়মনসিংহ থেকে ৬ মাইল দূরে মধুপুর থেকে আগত আর একটি পাকসৈন্যদলের সঙ্গে এখনও লড়াই করেছেন।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

sumahmud78@gmail.com