২১ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সানাই ও বাঁশির অন্তঃপ্রাণ মূর্তজা কবির মুরাদ

  • তৌফিক অপু

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে দিনের শেষ ভাগ এবং রাতের শুরু। আপন ধ্যানে বেজে যাচ্ছে বাঁশি। একটু কান পাতলেই বোঝা যায় সান্ধ্যকালীন রাগ ‘মারোয়া’ ভেসে বেড়াচ্ছে বাঁশির সুরে। কেমন যেন এক বিমোহিত শক্তি আছে বাঁশিতে। নিজের অজান্তেই মন কেড়ে নেয়। আর এ কারণেই হয়ত কবির কবিতায় লেখকের গল্পে কিংবা নাটক-সিনেমায় বাঁশি যেন অন্যতম এক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আদি বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে বাঁশি একটি। বাদ্যযন্ত্র সৃষ্টির প্রথম যুগের সন্ধান মেলে বাঁশির। এক সময় শহর-নগর কিংবা গ্রামে বাঁশির যেন ছিল প্রধান বাদ্যযন্ত্র। কবে কালের প্রবাহমানতায় যেন আবেদন এখন অনেকটাই ম্লান বিশেষ করে শহরের মানুষ যেন ভুলতেই বসেছে বাঁশিকে। এমনই এক ক্লান্তি লগ্নে বাঁশি নিয়ে এই ঢাকা শহরে বসেই নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন বাঁশি ও সানাই শিল্পী মূর্তজা কবির মুরাদ। তার সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে বাঁশি ও সানাই শিল্পের নানা দিক।

বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনা

প্রথমেই জানতে চাইলাম তরুণ প্রজন্মের কাছে বিশেষ করে ঢাকায় যারা অবস্থান করছে তাদের মধ্যে বাঁশি নিয়ে আগ্রহ কেমন? এর উত্তরে মুরাদ জানান, একেবারেই মিশ্র এক প্রতিক্রিয়া। বর্তমানে তরুণদের বেশ ভাল সারা পাচ্ছি আবার অন্যদিকে কষ্টের বিষয় হচ্ছে তারা কেউ বাদক হয়ে উঠছে না, অর্থাৎ পরিপূর্ণভাবে না শিখে নিজেকে বাঁশি বাদক হিসেবে শামিল করতে পারছে না। অর্থাৎ কেউ শিক্ষক হতে পারছে না। তাহলে বাঁশি শিল্প এগুবে কিভাবে। অবশ্য এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে বাঁশি নিয়ে প্রফেশনাল প্লাটফর্ম গড়ে না ওঠা।

আমি আমার দিক থেকে বিবেচনা করে যদি বলি, সেই ১৯৮৭ সাল থেকে আমি বাঁশি বাজানো শুরু করি। এখন পর্যন্ত বাঁশি নিয়েই আছি কিন্তু দীর্ঘ পথ চলায় বেশ কিছু প্রাপ্তি থাকলেও সেটা ফুলে-ফেঁপে বড় কিছু দেখার মতো হয়নি। ২০০১ সাল থেকে যখন বাঁশি শেখানো শুরু করি তখন বাদক হয়ে ওঠার মতো কিছু স্টুডেন্ট পেয়েছিলাম, কিন্তু যখন দেখলাম এই বাঁশি নিয়ে রেগুলার রোজগার করার মতো ভাল কোন প্ল্যাটফর্ম নেই তখন আর জোর করে তাদের এই পেশায় রাখতে পারিনি বা বলা যায় আমিও চাইনি। জীবন তো চালাতে হবে। এভাবেই শিক্ষার্থী হয়ত আসছে কিন্তু বাঁশি এগিয়ে নেয়ার জন্য শিক্ষক তৈরি হচ্ছে না। ব্যাপারটা বেশ কষ্ট দেয়। আমার বাবাও কিন্তু চায়নি আমি এ পেশায় থাকি। কিন্তু চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ হরতে আমি পিছপা হয়নি। তবে ফলাফলও যে খুব বেশি সুখকর তা নয়। শুধু এতটুকু বলতে পারি দায়িত্ব নিয়ে এদেশের বাঁশি শিল্পে কিছু হলেও দিতে পেরেছি।

সরাসরি শিক্ষার পাশাপাশি আপনার তো অনলাইনে বাঁশি শিক্ষার স্কুল রয়েছে। এ প্রসঙ্গে কিছু জানতে চাইলে মুরাদ বলেন, গত ২০১৭ সাল থেকে অনলাইনে বাঁশি শিক্ষার স্কুলটি চালু করেছি। এরই মধ্যে প্রায় ৭০ হাজারের বেশি সাবস্ক্রাইবার তবে চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে এই সাবস্ক্রাইবারের ৭৫ ভাগ হচ্ছে ভারতীয়, ৬ ভাগ বাংলাদেশী এবং বাকিগুলো ইউরোপ-আমেরিকার। অথচ ভারতে কিন্তু অনলাইনে শেখার স্কুল অনেক রয়েছে। আমি এতটুকু জোর দিয়ে বলতে পারি অনলাইনে বাঁশি শিক্ষার স্কুলগুলোর মধ্যে আমারটা প্রথম সারিতেই রয়েছে। ‘ইজি ফ্লুয়েট স্কুল নামে সার্চ দিলেই আমার স্কুলেই যাবতীয় লেসনগুলো দেখতে পাবে। ইতোমধ্যে ৩৮-৪০টি লেসন রয়েছে। বেশ ভাল সাড়া পাচ্ছি দেশ-বিদেশের নানা ধরনের স্টুডেন্ট রয়েছে আমার। কিছুদিন আগেই এই স্টুডেন্টদের নিয়ে ছায়ানটে বাঁশির ওপর এক অনুষ্ঠান করলাম। ব্যাপক সাড়া মিলেছে। কিন্তু চাইলেই এ ধরনের অনুষ্ঠান বেশি করে করতে পারছি না। এর মূল কারণ স্পন্সর। এ বিষয়ে স্পন্সররা তেমন সাড়া দিতে চায় না।

বাঁশি শেখার অনুপ্রেরণা কিংবা হাতেখড়ি নিয়ে মুরাদ বলেন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন সাহেবের কাছে বাঁশির হাতেখড়ি তবে মূল প্রেরণাদায়ক হিসেবে কাজ করেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত বাঁশি শিল্পী ওস্তাদ হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া। ১৯৮৭ সালে আমার বাঁশি শেখার শুরুতেই তিনি একবার ঢাকায় আসেন। সে সময় অল্প কিছু সময়ের জন্য হলেও তার সান্নিধ্য পাই। অনেক বড় মনের মানুষ তিনি। অল্প কথা হলেও সে সময় সিদ্ধান্ত নেই আমি বাঁশি শিল্পী হব। সে সুবাদে আজও দেশের ক্লাসিক্যাল বাঁশির অনুষ্ঠানে বাজিয়ে যাচ্ছি এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসরেও বাজিয়েছি। আমার এ ধারা অব্যাহত থাকবে, আমি চাই আমাদের দেশের বাঁশি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক এবং বাঁশি শিল্পে গড়ে উঠুক প্রফেশনাল প্ল্যাটফর্ম। এ ছাড়াও ২০০১ সাল থেকে সহজ বাঁশি শিক্ষা নামের একটি বই বাজারে রয়েছে।

যদি একটু সানাই প্রসঙ্গে আসি সে ক্ষেত্রে কিছু বলবেন? এর জবাবে মুরাদ অকপটে স্বীকার করলেন যে, আমি ছাড়া এখন হয়ত আমাদের দেশে সানাই শিক্ষায় শিক্ষিত বাদক নেই। ওস্তাদ সামশুর রহমানের কাছে আমি সানাইয়ের তালিম নেই। সেই থেকে বাজিয়ে যাচ্ছি কিন্তু দুঃখের বিষয় সানাই শেখার প্রতি তেমন কারও আগ্রহ নেই। সানাই বাজানো একটু কঠিন তবে বেশ মজার। এখনও সময় আছে যদি সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা মেলে তবে এ দুটি শিল্পকে বহুদূর এগিয়ে নেয়া সম্ভব।