২৫ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আবারও প্রশ্নফাঁসে সঙ্কটে কওমি মাদ্রাসার পরীক্ষা

  • বিরোধ বাড়ছে ॥ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষা নেয়ার ঘোষণা এক বোর্ডের

বিভাষ বাড়ৈ ॥ প্রশ্নফাঁসের কবলে পড়ে নির্বিঘ্নে নেয়া যাচ্ছে না সরকারী স্বীকৃতি পাওয়া কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা! সনদ মাস্টার্স (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবী) সমমান করার পর কওমি মাদ্রাসাগুলোর সরকারী সর্বোচ্চ সংস্থা বা বোর্ড আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়্যাহ’র অধীন চলমান এ পরীক্ষা বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় বারের মতো বাতিল করা হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল শুরু হওয়ার পর থেকে অব্যাহত প্রশ্নফাঁসের কারণে ১৩ এপ্রিল বাতিল করে নতুন প্রশ্নে বৃহস্পতিবার থেকে পরীক্ষা নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আবারও প্রশ্ন ফাঁসে পরীক্ষা স্থগিতের ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে।

এদিকে সনদের সরকারী স্বীকৃতি পাওয়ার পর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হওয়া পরীক্ষা নিয়ে দ্বিতীয়বার হোঁচট খেলো এ সংস্থাটি। হেফাজত নেতা আহমদ শফীর নিয়ন্ত্রণাধীন কওমি মাদ্রাসাগুলোর সরকারী সর্বোচ্চ সংস্থার এ পরীক্ষায় দফায় দফায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় চরম সঙ্কটের মুখে পড়েছে পুরো পরীক্ষা। অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে কওমির শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন। সর্বোচ্চ সংস্থা ও এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেখা দিয়েছে বিভক্তি। ইতোমধ্যেই সিলেট অঞ্চলের একটি বোর্ডের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে প্রশ্ন করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষা নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

কওমি মাদ্রাসাগুলোর সরকারী সর্বোচ্চ সংস্থা আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়্যাহ’র পুরো পরীক্ষা কমিটি বাতিলের দাবি উঠেছে। আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়্যাহ’র দায়িত্ব পালনকারীদের অযোগ্য অথর্ব অভিহিত করে সংস্থায় থাকা ব্যক্তি ও পরীক্ষকের অপসারণের দাবি তুলেছেন সনদের স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন করা শিক্ষার্থী ও আলেম সমাজের অনেকে। প্রতিবাদ জানিয়েছেন, সনদের স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন করা শিক্ষার্থীদের সংগঠন কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা সনদ স্বীকৃতি বাস্তবায়ন পরিষদ। জানা গেছে, গত ১৩ এপ্রিল প্রশ্নফাঁসের কারণে পরীক্ষা শেষ করার পরেও বাতিল করতে হয়েছিল।

পরীক্ষা শেষে অব্যাহত প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ওইদিন জরুরী এক বৈঠকে পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ। পরীক্ষায় ফরিদাবাদ মাদ্রাসাসহ দেশে কয়েকটি স্থানে দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ পাওয়ার পরই পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত আসে। বোর্ডের কো-চেয়ারম্যান আল্লামা আশরাফ আলী জানিয়েছিলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ পাওয়ায় তাকমিল হাদিসের পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা হচ্ছিল। এরপর ঘোষণা দেয়া হয়, নতুন করে প্রশ্ন প্রণয়ন শেষে ২৫ এপ্রিল থেকে পরীক্ষা শুরু করা হবে।

তবে সেদিন সমালোচনার মুখে কওমি মাদ্রাসার প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেছিলেন হেফাজতে ইসলামের আমীর শাহ আহমদ শফী। তবে নতুন করে পরীক্ষা নেয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন সকলেই। কিন্তু এবারো প্রশ্ন ফাঁসের কারণে বাতিল হলো পরীক্ষা। বৃহস্পতিবার দাওরায়ে হাদিসের আবু দাউদ শরিফ বিষয়ের পরীক্ষা ছিল। হাইয়াতুল উলয়ার সদস্য মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস সাংবাদিকদের জানান, জরুরী বৈঠক ডাকা হয়েছে। বৈঠকে স্থগিত হওয়া পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হবে। কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের কেন্দ্রীয় সদস্য ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া গওহরডাঙ্গার চেয়ারম্যান মুফতি রুহুল আমিন বলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে দাওরায়ে হাদিস জামাতের আজকের আবু দাউদ শরিফের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ের পরীক্ষা পুনরায় কবে অনুষ্ঠিত হবে? জানতে চাইলে তিনি জানান, সে সম্পর্কে এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী বিষয়গুলোর পরীক্ষা ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হবে কিনা সে বিষয়ে বৈঠক হবে। বৈঠকে আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়্যাহ বাংলাদেশ’র নেতৃবন্দ উপস্থিত থাকবেন। তারাই বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেবেন আগামী বিষয়গুলোর পরীক্ষা ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হবে কিনা। যা পরে জানানো হবে।

তবে বৃহস্পতিবারের পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে একটি বৈঠক করেই। যেখানে একাধিক আলেম একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেন। পরেও কয়েকজন তথ্য প্রমাণ তুলে ধরেন। এরপরই সকলে একমত হন পরীক্ষা বাতিলের বিষয়ে। প্রশ্নপত্র পরিবহন, কেন্দ্রে কেন্দ্রে নেয়া, বিশেষ তালার ব্যবস্থা করা, তালার চাবি সুনির্দিষ্ট এক থেকে দুজনের কাছে রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন বোর্ডের দায়িত্বে থাকা আলেমরা। বৈঠকে অংশ নেয়া একাধিক সদস্য জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে যেসব মাদ্রাসার নাম এসেছে, কেন্দ্রের তালিকা থেকে সে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাতিল করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়।

কিন্তু এ ধরনের কথা আগেও বলা হয়েছিল। তাহলে তা বাস্থবায়ন হয়নি? এমন প্রশ্নে বোর্ডে থাকা কেউ কথা বলতে রাজি হলেন না। তবে বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর রীতিমতো বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন কওমি শিক্ষার সঙ্গে জড়িত কর্তব্যরত ব্যক্তিরা। ইতোমধ্যেই সিলেট অঞ্চলের একটি বোর্ডের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে প্রশ্ন করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষা নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

সিলেট আজাদ দ্বীনি এদরার মহাসচিব মাওলানা আবদুল বসির বলেছেন, তারা আলাদাভাবে প্রশ্ন করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই বোর্ডের অনেকেই বলছেন, অযোগ্য অথর্বদের খপ্পরে পরে পরীক্ষা আজ সঙ্কটের মুখে।

কথা বলে জানা গেছে, যারা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে পরীক্ষা নেয়ার দাবি করেছিলেন শুরু থেকেই তারা ঘটনাকে বলছেন, ‘যা হওয়ার কথা তাই হচ্ছে’। এদিকে সনদের স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন করা শিক্ষার্থীদের সংগঠন কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা সনদ স্বীকৃতি বাস্তবায়ন পরিষদের সংগঠনিক সম্পাদক সদরুদ্দিন মাকনুন অব্যাহত প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়্যাহ বাংলাদেশ’র এ ধরনের কর্মকা-ের কারণে বাইরের হস্তক্ষেপ নিয়ে আসার পায়তারা চলছে। কওমি শিক্ষার্র্থী ও আলেম সমাজের অনেকেই অভিযোগ তুলেছেন, কওমির সর্বোচ্চ সংস্থায় পরীক্ষার সঙ্গে যারা আছেন তাদের প্রত্যেকেরই অসংখ্য মাদ্রাসা আছে। যাদের কর্মকা- তাই সমস্যা সমাধানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িছে। যাদের মাদ্রাসা আছে তারা স্বচ্ছ পরীক্ষা নেয়ার পক্ষে ভূমিকা পালন করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর আগে গত ৮ এপ্রিল থেকে দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা শুরু হয়। ১৮ এপ্রিল পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা ছিল। ছয়টি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে মোট ২৬ হাজার ৭২১ শিক্ষার্থী এ বছর পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। ছয়টি শিক্ষাবোর্ড হলো- বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ, বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওহরডাঙ্গা বাংলাদেশ, আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ, আজাদ দ্বীনি এদারায়ে তালিম বাংলাদেশ, তানজিমুল মাদারিসিল দ্বীনিয়া বাংলাদেশ এবং জাতীয় দ্বীনি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড।

২০১৭ সালের গণভবনে প্রধানমন্ত্রী আলেমদের উপস্থিতিতে কওমি মাদ্রসারা দাওরায়ে হাদীসের সনদকে মাস্টার্স (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) এর সমমান স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে সময় গঠিত হয় দেশের ছয়টি কওমি মাদ্রসা বোর্ডের সমন্বয়ে গঠিত হয় আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়্যাহ বাংলাদেশ’ নামের এ সংস্থাটি।