২৬ এপ্রিল ২০১৯

ঘুষ খাই না কাউকে খেতেও দেব না

ঘুষ খাই না কাউকে খেতেও দেব না

স্টাফ রিপোর্টার ॥ হয় দুর্নীতিবাজরা থাকবে, না হয় আমি থাকব। আমার মন্ত্রণালয়ের অধীনে কোন দুর্নীতিবাজ থাকতে পারবে না ও কেউ দুর্নীতি করতে পারবে না। আমি যেহেতু কোন কাজের কমিশন নিই না, তাই কাউকে পার্সেন্টেজ নিতে দেয়া হবে না। সিন্ডিকেট করে ব্যবসা করলে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে। নিজ মন্ত্রণালয় ও এর অধীনে থাকা সেবাদানকারী সকল সংস্থার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে উদ্দেশে এমনটিই ঘোষণা দিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এমপি। একইসঙ্গে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সহজে সেবাপ্রদানের ২৬টি পর্যায়ের বিন্যাস করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সম্মেলন কক্ষে সংস্থাটির সেবা সহজীকরণ বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোঃ রাশিদুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ আখতার হোসেনসহ সংস্থাটির উর্ধতন কর্মকর্তা ও সকল স্তরের কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন।

গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, আমি নিজে ঘুষ খাই না, কমিশন নেই না। কাউকে ঘুষ খেতে দেব না, কমিশন খেতে দেব না। সিন্ডিকেটের ব্যূহ আমি ভেদ করবই, এটা আমার আত্মবিশ্বাস। ব্যূহ ভেদ করতে না পারলে আমি হারিয়ে যাব অথবা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, যাদের কারণে মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে তারা হারিয়ে যাবে। সিন্ডিকেটের ব্যবসা কেউ করতে চাইলে তাদের ভয়াবহ পরিণতি বরণ করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, মনে রাখবেন সরকারের চেয়ে শক্তিশালী কেউ নেই।

মন্ত্রী বলেন, আমরা আসব যাব, কাঁধে কোন দায় নেব না, এটা হতে পারে না। যারা স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করবেন, তারা চাকরিতে থাকবেন। যারা অস্বচ্ছ হবেন, দুর্নীতির সঙ্গে থাকবেন, তাদের চাকরি ছেড়ে বাড়ি চলে যেতে হবে অথবা অন্য কোথাও চলে যেতে হবে। আমি যতদিন এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছি, আমি চাইব মন্ত্রণালয়সহ দফতর-সংস্থার সবাইকে সততার সঙ্গে, স্বচ্ছতার সঙ্গে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির ওপর জিরো টলারেন্স। দুর্নীতি দূর করতে তিনি সরকার গঠন করেছেন। সে সরকারের আমি একজন মন্ত্রী। আমার অধীনে কেউ দুর্নীতি করতে পারবে না। তাই দুর্নীতিবাজরা সাবধান হোন। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সেবা প্রদান সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি শুনতে চাই কারা দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, জানতে চাই কাদের কারণে মানুষ কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না, বুঝতে চাই মানুষ কতটা সেবা পাচ্ছে। সেবা সহজীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হলে আমরা মন্ত্রণালয়সহ প্রতিটি দফতরে একটা অভিযোগ বাক্স রাখব। কারণ আমাদের দায়িত্ববোধের জায়গা আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, আবাসন নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার। সকলের জন্য আবাসন, কেউ থাকবে না গৃহহীন। সেই লক্ষ্যে শেখ হাসিনা সরকার কাজ করছে। যখন দেখি নাগরিকরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অথবা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছ থেকে কাক্সিক্ষত আচরণ না পেয়ে অসহায় অবস্থায় ঘুরছে, তখন মনে হয় ওই জায়গায় আমি থাকলে একই কষ্ট আমার হতো। সেজন্য দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটাতে হবে, মানুষের ভোগান্তির অবসান ঘটাতে হবে, সেবা সহজ করতে হবে, স্বচ্ছতা আনতা হবে, সততা আনতে হবে। সুশাসন যদি আমরা নিশ্চিত করতে না পারি, মানুষের কাক্সিক্ষত স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে না, নাগরিকরা মৌলিক অধিকার পাবে না। যারা দায়িত্বে আছি সকলকে ভাবতে হবে জনগণ মালিক, তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে।

গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নানা অনিয়মের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অনেক ভোগান্তির অভিযোগ আমার কাছে এসেছে। দেড় কাঠা বা পৌনে দুই কাঠা জমির মালিকের একটা বিক্রয় অনুমতি বা একটা মিউটেশনের জন্য অনেক কষ্ট করতে হয়। নাগরিক সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে আমরা চিন্তা করলাম, গবেষণা করা দরকার মানুষের ভোগান্তি কেন। নাগরিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অচলায়তন ভাঙ্গার জন্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ১২টি সংস্থা নিয়ে আমরা কাজ করছি। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের পিয়ন থেকে শুরু করে চেয়ারম্যান প্রত্যেকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।

রেজাউল করিম বলেন, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সেবা প্রদানের ২৬টি পর্যায়ের বিন্যাস করা হয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থে সেবা সহজীকরণের প্রক্রিয়া আমরা শুরু করেছি। বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়েই প্রথম মানুষের সেবা সহজ করার জন্য, ভোগান্তি কমানোর জন্য আমরা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছি। এটা একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সরকার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান নয়, প্রয়োজনে রাজউক ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে সরকার ভর্তুকি দেবে, কিন্তু জনগণের ঘাড়ে অতিরিক্ত ট্যাক্স চাপিয়ে তাদের কষ্ট বাড়ানো এবং তার ভেতর থেকে আমাদের সুবিধা নেয়া, এটা কাক্সিক্ষত নয়, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।

মন্ত্রী আরও বলেন, স্বচ্ছতার ব্যাপারে অনাকাক্সিক্ষত অনেক অভিযোগে আমরা জর্জরিত। সে জন্য স্বচ্ছতার জায়গায় আসার জন্য আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে ১ জুন থেকে এবং রাজউকে ১ মে থেকে সমস্ত ব্যবস্থা আমরা অটোমেশন অর্থাৎ ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিয়ে আসছি। বাড়িতে ল্যাপটপের মাধ্যমে অনলাইনে প্ল্যান সাবমিট করা যাবে, মিউটেশন আবেদন করা যাবে। রাজউক বা গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অফিসে যাওয়া লাগবে না। বাড়িতে বসে অগ্রগতি জানা যাবে। আমরা চাই আধুনিক বিশ্ব যেভাবে চলছে, আমরাও সেভাবে চলব। নথি হারিয়ে যাওয়া থেকে উত্তরনের জন্য আমরা ডাটাবেজ সিস্টেম চালু করছি। সব নথি কম্পিউটারে অনলাইনে থাকবে, আপনিও আপনার ফাইলের অবস্থা দেখতে পাবেন। এই জাতীয় পরিবর্তনের জন্য আমরা ২৬টি পর্যায়ে অভাবনীয় পরিবর্তন এনেছি। সাধারণ মানুষকে এই পরিবর্তনের ব্যাপারে জানাতে মন্ত্রী উপস্থিত সাংবাদিকদের অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, আমি নিজে ঘুষ খাই না। কমিশন খাই না, কমিশন বাণিজ্যও করি না। আমার অধীন কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও ঘুষ খেতে দেব না, কমিশন বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট করতেও দেব না। সিন্ডিকেট বাণিজ্য বন্ধ। আমি সাড়ে তিন মাস হলো দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। অনেক কিছু টেকনিক্যাল বিষয় বুঝে উঠতে সময় লাগছে।

গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ও রাজউকের বেশকিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমার কাছে রয়েছে। আমরা সবাইকে একটা সুযোগ দেয়ার জন্য বলেছি। ভাল হতে হবে। ভাল যাদি না হয় খুব শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সিন্ডিকেট আমি ভাঙবই। মন্ত্রী বলেন, রাজউকে ১ হাজারের বেশি ফাইল পাওয়া যাচ্ছিল না। আমরা কিন্তু ইতোমধ্যে ৭০০ ফাইল উদ্ধার করেছি। অনেক ডেস্কের তালা ভেঙ্গে ফাইল বের করেছি। আর বাকিগুলোর জন্য ১ মাস সময় দিয়ে এসেছি। ফাইল বের হতে হবে। হয় ফাইল বের হবে, না হয় অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বের হয়ে যেতে হবে। যেহেতু আমার ব্যক্তিগত কোন চাওয়া নেই, তাই কাউকে অনুকম্পা দেখানোর প্রয়োজন নেই। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ফাইলও সেভাবে উদ্ধার করা হবে। যদি কেউ সিন্ডিকেট বাণিজ্য করতে চান সাবধান হয়ে যান। আমি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।