১৮ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’

অসত্যের বাষ্পীয় ইঞ্জিনের কর্কশ চিৎকারে বাঙালীর কান ঝালাপালা হয়ে গিয়েছিল। ধ্বনি-প্রতিধ্বনির অন্তরালে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তার হ্ণেষাধ্বনি প্রকটিত হয়েছে এমনভাবে যে, গোয়েবলসের মিথ্যাও বুঝি হার মেনেছিল তার কাছে। নিত্য নতুন সংজ্ঞা আরোপ করে বলা হচ্ছিল, রাজনীতিকদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে তোলা হবে। করেছেনও তাই। লুটেরা, চোরাকারবারি খুনী, দাগী আসামি, দুর্বৃত্ত, অসৎ, অদক্ষ, অযোগ্যদের ভিড় এমনভাবে বাড়ানো হয়েছিল রাজনীতিতে যে সত্যিকারের রাজনীতিকদের দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। জনসম্পৃক্ত রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে হুলিয়া, মামলা জারি করে তাদের হয় কারাগারে, নয়ত আত্মগোপনে যেতে বাধ্য করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী রাজনীতিক ও দলের ওপর নিপীড়ন, নিষ্পেষণ চালানো অব্যাহত রাখা হয়। স্বাধীনতাবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত যুদ্ধাপরাধী, গণত্যা, নারী নির্যাতন, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে জড়িত পরাজিত শক্তিকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করা হয়। রাজাকার, আলবদরদের রাজনীতিতে যেমন তেমনি ব্যবসাবাণিজ্য, সামাজিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার কাজটিও করা হয় সূচারুরূপে। পঁচাত্তর পরবর্তী ক্ষমতা দখলদাকারী সামরিক জান্তারা প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ করে। তবে নিজেরা দল গঠনের রাজনীতির চর্চা অব্যাহত রাখে। নিজেদের স্বার্থে পরবর্তী সময়ে ঘরোয়া রাজনীতি চালু করে। পত্রিকায় বিবৃতি প্রদান করার সীমিত সুযোগ দেয়া হয় মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক রাজনৈতিক দলগুলোকে। একই সঙ্গে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ ও পাকিস্তানপন্থী রাজনীতিকে। স্বাধীনতার সমস্ত সুফল ও অর্জনকে একে একে নস্যাত করা হয়। মানুষের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। মার্শাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এক ধরনের অপচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়। সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমে সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়। সামরিক জান্তাদের নির্দেশের বাইরে সংবাদ প্রকাশ ছিল দুরূহ বিষয়। সংশয়, উদ্বেগ, আতঙ্ক, ত্রাস আর বিপন্নতায় ভরা ছিল সবকিছু যেন। রাত ১২টা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত সারাদেশ ছিল ‘কার্ফু’র আওতায়। মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হতো যত্রতত্র, যখন তখন। ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ বলে দেশব্যাপী দুর্নীতির বিস্তার ঘটানো হয়। সর্বত্র গড়ে তোলা হয় লুটেরাশ্রেণী। ডান, বাম, মধ্যডান ও মধ্যবামেরা মধু লোভীর মতো জান্তা শাসকের চারপাশে ভিড় জমাতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের বশংবদ বানানোর জন্য নানামুখী টোপ প্রদান করা হয়। সংবিধান সংশোধন করে অবৈধ ক্ষমতা বৈধ করার জন্য গণভোট নামক প্রহসন প্রদর্শন করা হয় দেশজুড়ে। ভোটকেন্দ্রে ভোটার না গেলেও দেখানো হয় ৯৮ ভাগ ভোট পড়েছে জান্তা শাসকের পক্ষে। পঁচাত্তর পরবর্তী সংবিধান লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে নির্বাচনী ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে জেনারেল জিয়া ও তার উত্তরসূরি এরশাদ এবং খালেদা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মূল্যায়ন করেছেন যে, বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে ভাঁওতাবাজি করে মূলত জিয়াউর রহমান কার্ফু গণতন্ত্র দিয়েছিল। দেশব্যাপী প্রচার চালানো হয় জিয়া ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রে’র প্রবর্তক, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দল ভেঙ্গে একাধিক দল গঠন করাই হচ্ছে তার বহুদল। আর্থিক টোপ প্রদান করে, নেতাদের হুমকি-ধমকি, জেল-জুলুমের ভয় দেখিয়ে এমনকি আর্থিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে অজস্র দল গঠন করা হয়। এক আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে আরও ৬টি দল গঠিত হয়। নামসর্বস্ব ভুঁইফোড় দল গঠন করা হয়। স্বয়ং জিয়া ভাসানী ন্যাপ, মুসলিম লীগ, পিডিপি, নেজামে ইসলাম ইত্যাদি পাকিস্তানপন্থী দলকে করায়ত্ত করে বা জবরদখল করে জাগদল হয়ে বিএনপি গঠন করেন। দেশে বিদ্যমান ছোট-বড় প্রায় সব দলই ভাঙ্গনের শিকার হয়। দল ভেঙ্গে অজস্র দল গঠনই ছিল জিয়ার তথাকথিত ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’। বহুদল বৈকি! কিন্তু এর সঙ্গে গণতন্ত্রের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিল না। অসত্য আর মিথ্যাচার দিয়ে সামরিক শাসকদের কুকীর্তি ঢাকার এটাও এক ধরনের প্রয়াস। দেশ, জাতি ও ইতিহাসের স্বার্থে এসব তথ্য উদ্ঘাটন জরুরী।