২১ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেশে নাশকতার ছক কষছে ‘বাংলাদেশী জিহাদী গ্রুপ’

  • অনলাইনে তৎপরতা চালাচ্ছে

শংকর কুমার দে ॥ ‘বাংলাদেশী জিহাদী গ্রুপ’ নামে একটি উগ্রপন্থী সংগঠনের অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমের তৎপরতার খোঁজ পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ বোমা হামলার পর বাংলাদেশভিত্তিক এই ধরনের উগ্রপন্থী সংগঠনের কার্যক্রমের তৎপরতার খোঁজ পাওয়া গেছে। গ্রুপটিই নতুন করে বাংলাদেশে জঙ্গী হামলার মাধ্যমে বড় ধরনের নাশকতার ছক কষছে এমন আশঙ্কার তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এই উগ্রপন্থী সংগঠনটির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে জঙ্গী সংগঠন জেএমবি, নব্য জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলাটিম আনসার আল ইসলাম, হিযবুত তাহরীরসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত পলাতক জঙ্গীরাও। যুক্ত থাকতে পারে উচ্চ শিক্ষিত, শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, ধনাঢ্য পরিবার থেকে এসে বিদেশে যাওয়া তরুণ-যুবকরা। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নজরদারি শুরু করেছে গোয়েন্দা সংস্থা।

গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক জঙ্গীগোষ্ঠী আইএসের দায় স্বীকারের পর বাংলাদেশে পলাতক জঙ্গীরা উৎসাহিত হতে পারে এমন ধারণা করছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। দেশে পলাতক জঙ্গীদের সঙ্গে বিদেশে যাওয়া জঙ্গীদের যোগাযোগ হতে পারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অনেক বাংলাদেশী তরুণ সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তানে গিয়ে উগ্রপন্থীদের হয়ে যুদ্ধ করেছে এমন তথ্য আছে গোয়েন্দা সংস্থার কাছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার দেশে ফেরত আসে। অনেকে বিদেশে গিয়ে ধরা পড়ে। কেউ সেখানে নিহত হয়। যারা ফিরেছে তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। যারা এখনও ফিরেনি ও না ফেরা তরুণদের তালিকা তৈরি করেছে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও র‌্যাব।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে নিখোঁজ হয়ে বিদেশে যাওয়ার পর এখন আবার তারা দেশে ফিরে আসতে পারে কিংবা বিদেশ থেকে বাংলাদেশে যোগাযোগ রাখছে এমন ব্যক্তির সংখ্যা ৪৫। তাদের তালিকা সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠিয়ে দিয়েছে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। গত রবিবার শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় এ পর্যন্ত ৩৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছে ৫ শতাধিক। এ হামলায় যেসব শ্রীলঙ্কান তরুণ-যুবক অংশ নেয় তাদের কেউ কেউ উচ্চ শিক্ষিত এবং বিদেশে পড়াশোনা করেছে। এদিকে বাংলাদেশেও জঙ্গী হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে সার্বিক বিষয়ে সতর্ক থাকতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বিদেশী পাসপোর্টধারী বাংলাদেশীদের নজরদারিতে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ নির্দেশ দেশের সব বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ থেকে নিখোঁজ হওয়া ৪৫ জনের তালিকাও দেয়া হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে এসব নির্দেশ পৌঁছার পর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষগুলো এ বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। গুলশানের হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়া ঈদগাহে হামলায় বিদেশ পড়ুয়া বাংলাদেশের তরুণদের জড়িত থাকার ঘটনা প্রকাশের পর থেকেই বিমানবন্দরগুলোতে বাংলাদেশী ছাত্র ও তরুণদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে সারাদেশে জঙ্গী সংগঠনগুলোর মেরুদ- ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। জঙ্গীদের অনেকেই নিহত হয়েছে, গ্রেফতার হয়ে কারারুদ্ধ আছে, নয়ত পালিয়ে বেড়াচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ বোমা হামলার পর বাংলাদেশে আবারও নতুন করে জঙ্গী হামলার বিষয়ে পলাতক ও বিদেশে অবস্থানরত জঙ্গীরা উজ্জীবিত হতে পারে এমন আশঙ্কায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন।

র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, ইংরেজী মাধ্যমে পড়া এবং এর পর উচ্চ শিক্ষার্থে বাংলাদেশের তরুণরা কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে যাওয়ার পর সে দেশের নাগরিকত্ব পান। এর পর তাদের মধ্যে কেউ কেউ জঙ্গীবাদে জড়িয়ে পড়ে। তখন উন্নত দেশের পাসপোর্ট নিয়ে মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন তারা পোর্ট এন্ট্রি ভিসা নিয়ে। এ জন্য বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে পড়তে গিয়ে বিদেশী পাসপোর্ট নিয়ে ফিরছেন এমন ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। তাই বিদেশী পাসপোর্টে তরুণদের পোর্ট এন্ট্রি ভিসা দেয়ার সময় কর্মকর্তারা আদ্যোপান্ত যাচাই-বাছাই করছে। সন্তুষ্ট হলে তবেই ওই সব তরুণকে পোর্ট এন্ট্রি ভিসা দেয়া হচ্ছে।

গোয়েন্দা সংস্থার উর্ধতন এক কর্মকর্তা বলেন, তুরস্কসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের বিমানবন্দর দিয়ে যেসব বাংলাদেশী তরুণ যাতায়াত করছে তাদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশ থেকে তুরস্কগামীদের ওপর বাড়তি গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া যারা তুরস্ক থেকে বাংলাদেশে আসছে তাদের ওপরও গোয়েন্দারা নজর রাখছেন। ‘বাংলাদেশী জিহাদী গ্রুপ’ নামে একটি উগ্রপন্থী সংগঠনের অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম নজরে আসার পরই এ নির্দেশনা দেয়া হয়। অনেক বাংলাদেশী তরুণ সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তানে গিয়ে উগ্রপন্থীদের হয়ে যুদ্ধ করেছে বা জঙ্গী সংগঠনে জড়িয়ে পড়েছে। শ্রীলঙ্কায় বোমা হামলার পর বাংলাদেশে যেসব তরুণ-যুবক ফিরছে তাদের নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।

পুলিশের এন্টি টেররিজম ইউনিটের উর্ধতন এককর্মকর্তা বলেন, এন্টি টেররিজমের মূল কাজই হচ্ছে জঙ্গীবাদ নিয়ে কাজ করা। হুমকি থাক বা না থাক জঙ্গী তৎপরতা ও জঙ্গীবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবেই। রাজধানীর নিরাপত্তা নিশ্চিত, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় পুলিশের পাশাপাশি এন্টি টেররিজম ইউনিট কাজ করছে। এই মুহূর্তে জঙ্গীরা দুর্বল। বড় ধরনের হামলা চালানোর সক্ষমতা তাদের নেই। তবু আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে হয়। তবে শ্রীলঙ্কার ভয়াবহ বোমা হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা জঙ্গী ও উগ্রপন্থীদের ওপর বাড়তি নজরদারি ও সতর্কতা অবলম্বন করছে বলে এ্যান্টি টেররিজম কর্মকর্তাদের দাবি।