০২ মে ২০১৯

প্রকৃতির অপার বিস্ময় ॥ নায়াগ্রা জলপ্রপাত...

পৃথিবীতে বেশ কিছু বিস্ময়কর জায়গা আছে। যেগুলো দেখলে আপনার চোখ সেখানে আটকে যাবে। প্রকৃতির অপরূপ খেলা যে কতটা মনোমুগ্ধকর সেখানে না গেলে আপনি সেটা কখনই বুঝতে পারবেন না। উঁচু পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ছে পানি। সে পানি গড়িয়ে পরে নিজ গতিতে ছুটে চলছে। অনেকে হয়ত মনে মনে ভাবতে পারেন এই বুঝি আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টির দল দানব আকার ধারণ করে সিঁড়ি বেয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ছে। ঠিক ধরে ফেলেছেন বলছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ জলপ্রপাত নায়াগ্রার কথা। বইয়ের পাতায় নায়াগ্রা জলপ্রপাতের অনেক গল্প থাকলেও গল্প পড়া আর নিজে সে গল্পের সাক্ষী হওয়া এক কথা নয়। যারা ঝর্ণার অকৃত্রিম খেলা নিজ চোখে অবলোকন করেছেন তাঁরা নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখলেই নিমেশে চোখ জুড়িয়ে নিতে পারবেন। ভ্রমণপ্রিয়সী মানুষের কাছে নায়াগ্রা জলপ্রপাতটি একটি রোমাঞ্চকর স্থান। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ ছুটে আসে এর সৌন্দর্য দেখতে। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নায়াগ্রা জলপ্রপাত। পৃথিবীর সপ্তাচার্যের মধ্যে এটি একটি প্রকৃতির অনন্য নিদর্শন। নায়াগ্রা জলপ্রপাতটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক এবং কানাডার ওন্টার্ওি প্রদেশের মধ্যবর্তী আন্তর্জাতিক সীমানার মধ্যে অবস্থিত। বর্তমানে আমেরিকা, কানাডায় বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন পর্যটক কেন্দ্র গড়ে উঠলেও ১৮৮৬ সালের দিকে এই নায়াগ্রাই ছিল একমাত্র প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। নায়াগ্রা জলরাশির এক বজ্রধ্বনি। ধারণা করা হয় আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর পূর্বে এ জলপ্রপাত চিহ্নিত করা হয়েছিল। দেশীয় আমেরিকা বাসীরা প্রথম এটি দর্শন করেন। যদিও এ জলপ্রপাতটিকে বিশ^বাসীর কাছে লিখিত আকারে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন একজন ইউরোপিয়ান ব্যক্তি। ‘ফাদার ল্যুইস হেনেপিন ’ নামক ওই ইউরোপিয়ান ব্যক্তি লিখিতভাবে বিশ^বাসীর নজরে আনেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম এ জলপ্রপাতটিকে। বইটির নাম দেন তিনি ‘এ্যা নিউ ডিসকভারি।’ উত্তর আমেরিকার যতগুলো জলপ্রপাত রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী জলপ্রপাত হলো নায়াগ্রা। এটির তিন ভাগের এক ভাগ পড়েছে আমেরিকায়। যে ভাগ আমেরিকায় পড়েছে তাকে ডাকা ‘আমেরিকান ফলস’। আর দু’ভাগ পড়েছে কানাডায়, যাকে ডাকা হয় ‘কানাডিয়ান ফলস।’ অনেকে এটিকে দেখে ঘোড়ার খুড়ও মনে করতে পারেন কারণ এটি দেখতে অনেকটা তেমনই। জলপ্রপাতটি তিনটি জলপ্রপাতের সমষ্টি। সবচেয়ে বড় এবং আকর্ষণীয় হলো হর্সশু ফলস, যাকে বলা হয় কানাডা ফলস। এটি প্রায় ১৬৭ ফুট উঁচু থেকে ২৬০০ ফুট চওড়া পানির স্রোত নিয়ে নিচে আচড়ে পড়ে। ধারণা করা হয় যে নায়াগ্রার প্রায় নব্বই শতাংশ পানিই এই ফলস দ্বারা পতিত হয়। দ্বিতীয় ফলসটির নাম হলো আমেরিকান ফলস। এটি প্রায় ৭০ ফুট উঁচু থেকে প্রায় ১৬০০ ফুট চওড়া পানির স্রোত নিয়ে নিচে পড়ছে। আরেকটির নাম ব্রাইডল ভেইল ফলস। অন্য গুলোর তুলনায় এটি নিত্তান্তই কম গতির ¯্রােতের প্রবাহ তৈরি করে।

তবে সকলের আকর্ষণে থাকে কানাডা ফলসের দিকেই। ভ্রমণ প্রিয়সী পর্যটকদের হৃদয়ের মণিকোঠায় যেন ওই জায়গাটি একদম পাকাপোক্ত পাবে জায়গা করে নিয়েছে। নায়গ্রা নদীটি প্রায় ১২শ’ বছরের পুরনো। তারও আগে ১৮শ’ বছর পূর্বে ওন্টারিওর দক্ষিণে দুই থেকে তিন কিমি বরফে ঢাকা ছিল। সে সময়টাতে জলপ্রপাতের জলের যে ধারা তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এরপর যখন আস্তে আস্তে বরফ গলতে শুরু করে ঠিক তখন আবার নায়াগ্রা তাঁর চিরচেনা রূপ ফিরে পেতে শুরু করে। লেক ইরি, নায়াগ্রা নদী আর লেক ওন্টারিও থেকে আসা পানি মিলে এই বিশাল জলপ্রপাতের সৃষ্টি। এই জলপ্রপাতের দিকে আপনি চাইলে যেমন ভয় পাবেন আবার এর সৌন্দর্যকে আপনি অস্বীকার ও করতে পারবেন না। কথিত আছে যে এই নায়াগ্রা ফলস থেকে একবার এক পর্যটক নাকি লাফ দিয়েছিল। স্যামপেচ নামের এ দুঃসাহসী লোক ঝাঁপ দিয়েছিলেন নায়াগ্রায়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো এই ঝাঁপ দেয়ার পরও ভদ্রলোক বেঁচে গিয়েছিলেন। অনেকটা এমন যে, ‘রাখে আল্লাহ মারে কে।’

শুধু যে পর্যটকদের আননন্দের উৎস এই নায়াগ্রা তেমন কিন্তু নয়। এখানে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উৎপন্ন করা হয় জলবিদ্যুত । প্রতিদিন নায়াগ্রায় প্রায় ৬০ লাখ ঘনফুট পানি প্রবাহিত হয়। নায়াগ্রার স্রোতকে কাজে লাগিয়ে প্রতি বছর ব্যাপক পরিমাণে ত্বরিত উৎপাদন করা হয়।

আপনি অবাক হবেন শুনে যে নায়াগ্রা দেখতে প্রতিবছর প্রায় ৩০ মিলিয়ন পর্যটক আসেন। জলপ্রপাত ছাড়াও আপনি ঘুরতে পারেন, প্রজাপতি ভ‍ান্ডার, নায়াগ্রা এ্যাকুরিয়াম, নায়াগ্রা সায়েন্স মিউজিয়াম, ওয়াপর্লপুল স্টেট পার্ক, ডেভিলস হোল স্টেট পার্ক, নসসায়াগ্রা এ্যাডভেঞ্চার থিয়েটার এবং হাইড পার্ক। এই ১৬৭ ফুট জলপ্রপাতটির পাড়ে সবসময়ই ‘মেড অব দ্য মিস্ট’ নামের বোটটি অপেক্ষমাণ থাকে। বোটটিতে চড়ে আপনি নায়াগ্রার অপার সৌন্দর্য একদম কাছ থেকে দেখে নিতে পারবেন। অনেকটা এমন যে চাঁদকে একদম কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখা। এখানে যদি আপনি আপনার সঙ্গীকে নিয়ে যান তবে মনে রাখবেন আপনার জীবনে যেন নতুন এক অধ্যায়ের সৃষ্টি হবে। কেননা প্রকৃতির এমন অপার সৌন্দর্য খুব কমই আছে। আর আপনি সেখানে গেলে নিজেকে অবশ্যই ভাগ্যবান মনে করতে পারেন। কারণ আপনি যখন সেখানে যাবেন তখন ভাবতে হবে যে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ জলপ্রপাতটির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।

তাই দেড়ি না করে আজই ঘুরে আসুন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলপ্রপাতটি থেকে উপভোগ করে আসুন প্রকৃতির অপার এক সৌন্দর্য। সাক্ষী হয়ে থাকুন পৃথিবীর সপ্তাচার্যের।