২১ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চীন কেন মহা নৌশক্তি হতে চায়

চীনের নৌবাহিনীর ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত ২৩ এপ্রিল সে দেশের পূর্বাঞ্চলীয় নগরী কিংদাওয়ে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান হয়। এ উপলক্ষে বেশকিছু দেশের যুদ্ধজাহাজ সেখানে কুচকাওয়াজে অংশ নেয়। দেশগুলোর মধ্যে প্রায়-মিত্র রাশিয়া থেকে শুরু করে প্রায়-শত্রু ভারতের যুদ্ধজাহাজও অংশ নিয়েছিল।

চীন সমুদ্রের এক নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে এবং তার এই অভ্যুদয় ইতোমধ্যেই এশিয়ায় কম্পন সৃষ্টি করেছে। এই নতুন শক্তি একদিন বিশ্বকেও বদলে দিতে পারে বলে অনেকের ধারণা। এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে চীন মিশ্র বার্তা পাঠিয়েছে। বলেছে যে শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে ও সমুদ্রের সম্পদ রক্ষা করতে বিদেশী নৌবাহিনীগুলোর সঙ্গে একত্রে কাজ করতে চায়। দৃষ্টান্ত হিসেবে চীন বলেছে যে ২০০৮ সাল থেকে এডেন উপসাগরে জলদস্যু দমন টহল অভিযান শুরু করার পর থেকে চীনা নৌবাহিনী জলদস্যু উপদ্রুত জলপথ দিয়ে চলাচলরত চীন ও অন্যান্য দেশের ৬৬০০ এরও বেশি জাহাজকে এসকর্ট করেছে।

কিন্তু চীনা নৌবাহিনী শুধু যে এসকর্ট করার জন্য গড়ে উঠেছে তা তো নয়। চীনের রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসজ্জিত সাবমেরিন যেগুলো পরমাণু শক্তিচালিত এবং এসব ক্ষেপণাস্ত্র শত্রু দেশগুলোর নগরীগুলোকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা নিয়ে তৈরি করা। অনুষ্ঠানে এগুলো তো দেখানো হয়েছেই, আরও দেখানো হয়েছে ১০ হাজার টন ওজনের নতুনতম ডেস্ট্রয়ার টাইপ ০০৫ যেটি সর্বাধিক শক্তিশালী আমেরিকান ডেস্ট্রয়ারের সঙ্গে তুলনীয়। অনুষ্ঠানে বিশাল টিভির পর্দায় চীনের প্রথম বিমানবাহী রণতরী ‘লিয়াওনিং এর ডেক থেকে সগর্জনে জেট বিমানে উড়ে যাওয়ার দৃশ্যও দেখানো হয়।

স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে চীন এক শক্তিশালী নৌবাহিনী চায়। এমন নৌবাহিনী থাকার লাভ দ্বিমুখী। এটি শুধু বহিরাক্রমণের হাত থেকে চীনকে রক্ষাই করবে না উপরন্তু বহির্বিশ্বের কাছে চীনের শক্তিও প্রদর্শন করবে। ১৯৯০ সালে চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিন নৌবাহিনীকে সাগরে চীনের মহাপ্রাচীরে পরিণত হবার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পরবর্তী নেতা ও জিনতাও ২০১২ সালে একটা পরিবর্তনের সংকেত দেন এবং চীনকে সাগরের মহাশক্তি হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর থেকে নৌবাহিনীর বাজেট বেড়ে যায় এবং এর জাহাজ বহরের গুণগত রূপান্তর ঘটে। আজ চীনের রয়েছে এ অঞ্চলের সর্ববৃহৎ নেবাহিনী যার সমুদ্রপৃষ্ঠে ও সমুদ্রতলে ৩শ’রও বেশি যুদ্ধজাহাজ আছে বলে পেন্টাগন গত বছর জানায়। ২০১৮ সালে চীনের ছিল ৫৬টি সাবমেরিন। ২০২০ সাল নাগাদ এই সংখ্যাটি হবে ৭৮।

চীনের বিশেষজ্ঞরা ঊনবিংশ শতাব্দীর মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও লেখক আলফ্রেড থাইয়ার মাহানের একটি তত্ত্বের কথা প্রায়ই উল্লেখ করে থাকেন। মাহান লিখেছিলেন যে বৈশ্বিক শক্তির অন্যতম উৎস হলো নৌশক্তি। এই শক্তি আবার তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে- বাণিজ্য, নৌবাহিনীর অস্ত্রবল এবং দূরবর্তী ঘাঁটি থাকা ও সেখানে পৌঁছার সুযোগ। কারণ দূরবর্তী অভিযান চালানোটাও আবার এ ধরনের দূরবর্তী ঘাঁটি বা স্থাপনা থাকার ওপর নির্ভর করে।

চীনের নৌশক্তি বৃদ্ধি আমেরিকা ও অন্যান্য দেশের সাময়িক নেতাদের শঙ্কিত করে তুলেছে। চীনের নৌশক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর লক্ষ্যও একাধিক হয়ে পড়েছে। চীন এখন নতুন নতুন ঘাঁটি গড়ার দিকে ঝুঁকছে। যেমন ভারত মহাসাগরের চারদিকে আরও কিছু নতুন ঘাঁটি গড়তে চাইছে। চীনের আরেক লক্ষ্য হলো নিকটবর্তী সাগর নিয়ন্ত্রণ করা। তার অর্থ হচ্ছেÑ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও উত্তর ভারত মহাসাগরে যে কোন হুমকি মোকাবেলায় সক্ষমতা লাভ করা ঠিক যেমন আমেরিকা ও রাশিয়া তাদের ভূখ-ের কাছাকাছি তুলনামূলক সুবিধা ভোগ করছে। তার মানে অবশ্য এই নয় যে চীন দক্ষিণ সাগর বা নিকটবর্তী অন্যান্য জলরাশি থেকে আমেরিকার সমস্ত জাহাজ হটিয়ে দিতে পারে বা দেবে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা এক প্রজন্ম সময়ের মধ্যে অধিকতর আত্মবিশ্বাসী চীন ও অধিকতর সংঘাত আমেরিকা প্রতিযোগিতার এক অধ্যায়ের পর নিকটবর্তী সাগরগুলোতে শক্তির এক নতুন ভারসাম্যে পৌঁছাবে। তবে বিপজ্জনক সময়টা হচ্ছে আগামী ৫ বা ১০ বছর। চীনের শক্তি ও ক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে তার ক্ষমতার সমকক্ষ মর্যাদা দিতে প্রস্তুত নয়।

চলমান ডেস্ক