২২ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বরফ গলছে দ্রুত ॥ বদলেছে মেরুভালুকের খাদ্যচক্র

  • এনামুল হক

প্রতি বছর শীতকালে উত্তর মেরুর চতুর্দিকে সুমেরু সাগরে বরফ জমে। বরফের প্রলম্বিত অংশ উত্তর উপকূল বরাবর বিস্তৃত হয়। এ সময়টাই মেরুভালুকের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ সময়। কারণ তাদের খাদ্য সরবরাহ সাগরের বরফের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

সম্প্রতি কয়েক দশক ধরে সাগরের বরফ এত দ্রুত হারে সঙ্কুুচিত হয়ে আসছে যা আগে আর কখনও হয়নি।

চলতি বছরের শীতে সুমেরু সাগরে বরফের আস্তরণ এত কম হয়েছে যে ৪০ বছর আগে স্যাটেলাইটে ছবি তোলা শুরু হওয়ার পর থেকে এটা হলো সপ্তম স্বল্পতম। এ বছর পুরনো রেকর্ড ভেঙ্গে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি না হলেও বরফ জমা কমে যাওয়ার ধারাটাই হলো আসল ব্যাপার। এবারের শীতের কথা তো বলাই হলো। এখন বসন্তের চেহারা কেমন হয় সেটাই দেখার বিষয়। বসন্ত যদি শীতল হয় তাহলে বরফের স্থায়িত্ব আরও বেশি দিন হবে এবং সেটা হলে মেরুভালুক তাদের প্রিয় খাদ্য সীলমাছ সহজে পেতে পারবে।

সীলমাছ খেয়ে খেয়ে তারা মোটা-তাজা হবে। বেশ হৃষ্টপুষ্ট হলে তারা বছরের বাকি সময়টা শরীরে জমে থাকা চর্বির জোরে দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারবে। এটা তাদের অস্তিত্বের ব্যাপার। মেরুভালুকের শরীরে জমে থাকা চর্বি বরফমুক্ত গ্রীষ্ণকালটি অর্থাৎ সে সময় খাদ্য দুষ্প্রাপ্য বা পাওয়া যায় না বললেই চলে- সেই সময়টা বেঁচে থাকার রক্ষাকবচ। বাচ্চা প্রসব করা ও বাচ্চাকে স্তন্য পান করিয়ে নাদুস নুদুস করার জন্য মেয়েভালুকের তখন যে প্রচুর এ্যালার্জির প্রয়োজন সেটা তারা তাদের শরীরে জমানো চর্বি থেকেই পেয়ে থাকে। কানাডার মেরুভালুক বিজ্ঞানী এন্ড্রু ডেবোচের ভাই রসিকতা করে বলেন, কোন মেরুভালুক বরফ গলা জলরাশির বুকে প্রতিফলিত তার চেহারা দেখে কখনও ভাবে না ‘আমি বড্ড বেশি মুটিয়ে গেছি।’

সাগরের বরফ মেরুভালুকের শিকার ও বাচ্চা লালন পালনের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম। এটা তাদের এনার্জির মূল্যবান উৎস। মেরুভালুকের- অন্তত কানাডার উত্তরাঞ্চলের তিন জাতের মেরুভালকের খাদ্যের ৭০ শতাংশের বেশি হলো সাগরের বরফে জন্মানো এ্যালার্জি বা শ্যাওলা জাতীয় জলজ উদ্ভিদ। সাগরের বরফকে সাদা রঙের এক বিশাল খন্ড হিসেবে দেখায় সেটা অবশ্য ওপর থেকে দেখলে। আর নিচ থেকে দেখলে দেখা যাবে সাগরের বরফের গায়ে সবুজাভ-বাদামী রঙের এক আস্তরণ যা নানা প্রজাতির এ্যালার্জি দিয়ে তৈরি।

এখন কেউ হয়ত ভাবতে পারে যে মেরুভালুক তার বিশাল থাবা বরফের নিচে ঢুকিয়ে দিয়ে সবুজের আবরণ দেয়া বরফের টুকরো এনে মচ মচ করে ভেঙ্গে খায়। না, মেরুভালুক সরাসরি সাগরের বরফ খায় না। বরং গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, মেরুভালুকের খাদ্যের বেশিরভাগ হলো ক্রিটার নামক এক ধরনের প্রাণী যা খাদ্যের উৎস হিসেবে সাগরের বরফের গায়ের এ্যালজির ওপর চূড়ান্তভাবে নির্ভর করে থাকে।

মেরুভালুক প্রচুর সীলমাছ এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বেলুগা তিমিও খেয়ে থাকে। এই সীল ও তিমি মাছ ও অন্যান্য প্রাণী খেয়ে বাঁচে সেগুলো আবার সাগরের বরফের গায়ে লেগে থাকা এ্যালার্জি খেয়ে জীবন ধারণ করে। মেরুভালুকের অন্যতম প্রিয় আহার রিংগড সীল। এরা নানা জাতের মাছ ও চিংড়ি খেয়ে বাঁচে। ওই মাছ ও চিংড়ি এ্যালার্জি খেকো প্লাঙ্কটনের ওপর নির্ভরশীল। এক একটি এ্যালার্জি চুলের প্রশস্ততার চেয়েও ছোট। কিন্তু সমষ্টিগতভাবে এগুলো মেরু অঞ্চলের খাদ্যচক্রের ওপর বিশাল প্রভাব রেখে থাকে।

সুমেরুর দীর্ঘ অন্ধকার শীতকালের পর বসন্ত আসে।

বসন্তের আলোয় এ্যালার্জির জন্ম ও বৃদ্ধি উদ্দীপিত হয়। এতে কোপেপড, এম্ফিপড ও জুপ্লাঙ্কটপের মতো ক্ষুদে প্রাণীরা ভোজ উৎসবে মেতে ওঠে। কারণ এ্যালার্জি তাদের প্রিয় খাদ্য। গ্রীষ্মে বরফ গলে গেলে এ্যালার্জি নিচের দিকে চলে যায়। সাগর তলে থাকা এই এ্যালার্জি মাছেরা খায়। এই মাছদের খেয়ে বাঁচে সীল। আর এভাবেই তৈরি হয় মেরুভালুকের খাদ্যচক্র।

সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফি