২১ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রবীন্দ্র সাহিত্যে নারী ॥ ২৫ বৈশাখ

সৃজনশীলতায়

নাজনীন বেগম ॥ ১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ আসেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর এবং নওগাঁর পতিসরে। পৈত্রিক জমিদারি তদারকি করতেই তিনি গ্রাম-বাংলার নিভৃত পল্লীর ছায়াঘন আবহে ঘুরে বেরিয়েছেন। প্রমত্ত পদ্মায় বজরা ভ্রমণের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্য পায় এক অনবদ্য কাব্য সম্ভার। ‘সোনার তরী’ কাব্যগাঁথা আজও কবিকে মহিমান্বিত করে, সৃজনদ্যোতনায় তার প্রতিভার স্ফুরণ কবিতাগুচ্ছকে কাল থেকে কালান্তরে পৌঁছেও দেয়। শুধু তাই নয় নৈসর্গিক সৌন্দর্যে পরিপুষ্ট বাংলার পল্লীজননী কবিকে এক নতুন জগত আর বাংলার সাহিত্যকে দেয় এক অভাবনীয় সম্পদ। গ্রামীণ জনপদ আর হতদরিদ্র মানুষের মিলনসৌধে কবির সৃষ্টিশীল আঙিনা যে মাত্রায় ঝংকৃত হয়ে ওঠে সেখান থেকেই তৈরি হতে থাকে ছোট গল্পের আঙ্গিক আর বৈশিষ্ট্য। বাংলা সাহিত্যে ছোট গল্পের প্রথম সার্থক রূপকার রবীন্দ্রনাথ একেবারে পল্লীবালার মূল শেকড় থেকে তুলে আনেন তার গল্পের আনুষঙ্গিক রসদ। সমাজ সচেতন রবীন্দ্রনাথ প্রচলিত ব্যবস্থার গভীরে গেঁড়ে বসা অপসংস্কারকে একেবারে কাছ থেকে দেখেন। অবিভক্ত বাংলার নবজাগরণের মধ্যাহ্নে রবি কিরণের উন্মেষ। তবে শহর কেন্দ্রিক আধুনিকতার জোয়ার তখন অবধি গ্রাম-বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছায়নি। ঐতিহ্যিক ঠাকুরবাড়ির পরশমণি রবীন্দ্রনাথ জোড়া সাঁকোর সমৃদ্ধ বলয় থেকে চলে আসলেন হতদরিদ্র, নিবৃত্ত, মূর্খ, মৃঢ় জনগোষ্ঠীর একান্ত সান্নিধ্যে। একেবারে কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করলেন নিপীড়িত, নির্যাতিত সিংহভাগ গোষ্ঠী বংশানুক্রমিকভাবে চলে আসা অসহায়ত্ত এবং দুর্ভোগকে। তার চেয়েও বেশি মর্মাহত হলেন পিছিয়ে পড়া অর্ধাংশ নারী সমাজের অবর্ণনীয় দুঃখ আর দুর্দশা দেখে। সেই বোধে নবদ্যুতির আলোকে সৃজনক্ষমতা এক নিরন্তর গতিপ্রবাহকে আমন্ত্রণ জানাল। বাংলা সাহিত্যের আঙিনা ভরে উঠল এক অপরিচিত ছোট গল্পের মোড়কে। এর আগে বাংলা সাহিত্যে কোন গল্পের ধারা ছিল না। ভাবুক, আবেগপ্রবণ, রোমান্টিক কবি সামাজিক বাস্তবতার টানাপোড়নে হয়ে উঠেন এক বিদগ্ধ সমাজ পর্যবেক্ষক। একেবারে কাছ থেকে অনেকটাই নিজের দেখা বাকিটা সৃষ্টিশীল চেতনায় তৈরি হতে থাকে তাঁর গল্পের সমৃদ্ধ অবয়ব। সাহিত্যের এই নবতর আঙিনায় তার হাত দিয়ে যে সম্পদ তৈরি হতে থাকে সেখানে শুধু তিনি পথিকৃৎই নন এখনও মহানায়কের অপ্রতিহত জায়গায়।

নারীর প্রতি বিশেষ দায়বদ্ধতায় এই পশ্চাদপদ অংশের সামাজিক অভিশাপ আর বঞ্চনার যে কঠিন বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে গল্পের মূল আঙ্গিকে সেটাই ছোটগল্পের মাহাত্ম্যকে আজ অবধি পাঠক সমাজ নানা মাত্রিকে বিমোহিত আর আলোড়িত হয়ে যাচ্ছে। এমনকি তার চিরস্থায়ী আবেদনে এখনও পাঠক বিস্ময়াবিভূত হয়ে রস সম্ভোগও করছে। উনিশ শতকীয় নতুন জোয়ারের সুবর্ণ সময়ে গ্রাম বাংলার নারী সমাজের অবস্থা কত শোচনীয়, মর্মান্তিক এবং বেদনাবিধূর ছিল তেমন অসহায়ত্তও তার গল্পের বিষয়বস্তুকে ভারাক্রান্ত অনুভবে পাঠকের হৃদয়ে আঘাত করে। নতুন পুরনোর দ্বন্দ্বই শুধু নয় সমাজের অসম বিকাশ নারী জাতির চলার পথকে কতখানি কণ্টকিত আর নির্জীব করে রেখেছিল নারী চরিত্র রূপায়ণে সে সব প্রতিবন্ধকতাও তার সৃজনসত্তায় ভর করে। ফলে নারী নিপীড়নের বাস্তব ঘটনা প্রবাহ তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার বিক্ষুব্ধ চালচিত্র বলাই যায়।

১৮৯০ সালে ‘দেনা-পাওনা’ দিয়েই তার গল্পের শুভযাত্রা। পণ প্রথার আবর্তে নির্বৃত্ত পিতা আর অসহায় কন্যার যে মর্মবেদনা ফুটে ওঠে শতবর্ষ পরেও তার আবেদন আজও সচেতন অংশকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। গ্রাম বাংলার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অতি সাধারণ ঘটনাগুলো তার গল্পের উপজীব্য হয়ে যে সম্ভার পাঠক সমাজের কাছে আসে তা যেমন অসাধারণ একইভাবে কঠিন বাস্তবের এক অসহনীয় দুর্ভোগ। সাধারণ নিম্নবিত্তের নিঃসম্বল পিতা আর পণপ্রথার যাঁতাকলে পিষ্ট কন্যার যে অবর্ণনীয় দুর্যোগ তার শেষ পরিণতি হয় আত্মহননের মধ্য দিয়ে। এখনও আমাদের দেশে যৌতুকের বলিতে পীড়িত হওয়া নারীর সংখ্যা একেবারে কম নয়। কবি লিখছেন- আত্মঘাতী নিরুপমার শেষকৃত্য হয়েছিল আড়ম্বর আর আর্থিক ব্যয়বহুলতায়। শেষ করছেন এই বলে- উৎসবে আয়োজনে, সাড়ম্বরতায় সত্যিকারের প্রতিমা বিসর্জনই বটে।

১৮৯১ সালে লেখেন ‘কঙ্কাল’। নারী নিগ্রহের এক অভিনব এবং বিচিত্র কাহিনী, এতেও আছে সমাজ ব্যবস্থার প্রাচীন অনুশাসনের মর্মস্পর্শী বিধি। সেই বাল্য-বিবাহ পরিণতিতে অকাল বৈধব্যের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে সহায় সম্বলহীন অবস্থায় পিতৃগৃহে ফিরে আসা। গল্পের নায়িকা অনামিকা। নামহীন এই বালিকা কোন এক সময় বৈধব্যকে বরণ করলে দুর্ভাগ্যের কষাঘাতে জীবনটা বিপন্ন অবস্থায় ঠেকে। শ্বশুর-শাশুড়ি মিলে ‘বিষ কন্যার’ অপবাদ দিয়ে বাপের বাড়িতে পাঠায়। অলক্ষ্মীর সমস্ত বোঝা মাথায় নিয়ে জীবন কাটাতে হয়। শুধু তাই নয় বালিকা হতে পরিপূর্ণ যুবতী হওয়ার রোমাঞ্চকর অনুভূতি ভেতরে শিহরণও জাগায়। বয়ঃসন্ধিকালে যা কোন উদীয়মান কিশোর-কিশোরীর এক নবচেতনার অন্য রকম অনুভব। আর সেটাই কাল হলো এই ঝলমলে তরুণীর। কচি বয়সে যা ছিল ‘যমদেবতার’ মতো কদর্য, আগত যৌবনে সেখানে বাসা বাঁধে ‘মদন দেবতা’। সমাজ বহির্ভূত বিধবা প্রেমই নয় একেবারে গোপন প্রণয়। পরিণতিতে যা হবার তাই হলো। দুর্বিসহ এবং লোমহর্ষক এমন কাহিনী গড়ায় খুন ও আত্মহত্যার চরম দুর্বিপাকে। প্রেমিককে বিষ দিয়ে হত্যা করা এবং নিজেকে শেষ করে দেয়া কাহিনীর গতি নির্মমতার বেড়াজালে আবদ্ধ হওয়া ছাড়া আর কোন সহজ ও স্বাভাবিক রাস্তা কবির সামনে খোলা ছিল না। সামাজিক অপসংস্কারের নিষ্ঠুর প্রথার কারণে। সমাজের এমন অনাকাক্সিক্ষত প্রেমের পরিণতি কি নতুন সময়ে নব চেতনায় এগিয়ে গেছে? ১৮৯৩ সালে লেখা ‘শাস্তি’ গল্পটি আজ অবদি পাঠক হৃদয়ে আলোচিত হয়ে যাচ্ছে। কবির লেখনিতে আছে গল্পের প্রধান দুই পুরুষ চরিত্র দুখিরাম ও ছিদাম তাদের জমিদারির আঙিনায় কামলা খাটত। অর্থনৈতিক সঙ্কটের দুর্বিপাকে পড়া দুই ভাইয়ের নিত্য জীবন। স্ত্রীদের ঝগড়া ঝাটি, অসংযত ব্যবহার, তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ, সংহার মূর্তি সেও জীবনের এক অপরিহার্য ব্যাপার। এসব নির্বৃত্ত খেটে খাওয়া মানুষেরা না পায় যথার্থ মর্যাদা, বঞ্চিত হয় প্রাপ্ত মজুরি থেকেও। ফলে মন মেজাজও সব সময় তিরিক্ষি থাকে। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, ক্ষুধার্ত দুখিরাম ঘরের উঠোনে পা দিয়েই খাবার প্রত্যাশা করে একটু রাগী মেজাজে। সঙ্গে স্ত্রীর শ্লেষ বাক্যে অগ্নিশর্মা হতে সময় লাগে না। অগ্নিমূর্তি দুখিরাম ক্ষোভে, উত্তেজনায় দা দিয়ে স্ত্রীর মাথায় আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই রাধার মৃত্যু হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় দু’ভাই বিমূঢ় ও স্তব্ধ হয়ে যায়। উপায়ন্তর না দেখে ছোট ভাই ছিদাম তার বহু যত্নে, আদরে লালিত স্ত্রী চন্দরার ওপর এই খুনের দায়ভাগ চাপিয়ে দেয়। হতবিহ্বল ও দিশেহারা চন্দরা এমন অভিযোগে কোন উত্তর খুঁজেও পায় না। এক ভাই নির্দ্বিধায় নিজের স্ত্রীকে খুন করে ফেলল বিনা অপরাধে। আর অন্য ভাই নির্দোষ স্ত্রীর গায়ে খুনীর তকমা লাগিয়ে দিল নিঃসংশয়ে, নিঃসঙ্কোচে। এমন ছিল উনিশ শতকের ক্রান্তিলগ্নে গ্রাম বাংলার সামাজিক ব্যবস্থাপনা নারী নিগ্রহের কঠোর অভিশাপ? কবির নিজের জবানিতে আছে এমন বহু হৃদয়বিদারক আর নৃশংস ঘটনা পল্লীবালার নির্মম সামাজিক বেষ্টনীতে ঘটে যেত। সহিংসতার অদম্য বেড়াজাল ভেদ করে অসহায় ও নির্বৃত্ত শ্রেণী কোনভাবেই বের হয়ে আসতে পারত না। শারীরিকভাবে অসহায় ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল নারীরা সামাজিক অব্যবস্থার কঠিন নিগড়ে আটকে থাকত। এক সময় দুইভাই এই খুনের দায়ভার থেকে চন্দরাকে বাঁচাতে চাইলেও অনমনীয় এই নারী কিছুতেই রাজি হয়নি। এমন বলিষ্ঠ নারী চরিত্রও কবি এঁকেছেন।

চেতনায়

সাজ্জাদ কাদিও ॥ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বঙালীর জীবনে প্রেম ভালবাসা, ভাললাগা, মন্দলাগা, নানা আবেগ অনুভূতি, নারী, পুরুষ, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এমন কোন বিষয় নেই যা রবীন্দ্র সৃষ্টিকর্মে খুঁজে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ বাঙালীর জীবনে যাই ঘটুক না কেন তাই নিয়েই যদি রবীন্দ্র রচনায় তালাশ করা যায় খুঁজে পাওয়া যাবে। রবীন্দ্রনাথের জন্ম না হলে সাহিত্যে, সঙ্গীতে এত বিষয় বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া যেত কি-না সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ আমাদের সামনে উল্লেখ করার মতো কোন উদহারণ এখন পর্যন্ত দাঁড়ায়নি। নারী মুক্তি এবং নারী স্বাধীনতার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে যুগ যুগ আগে। আর এক্ষেত্রে যারা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রবীন্দ্রনাথ সমগ্র নারী জাতিকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে যে কতটা জোর দিয়েছেন তাঁর রচিত ‘কালান্তর’ গ্রন্থের ‘নারী’ প্রবন্ধে খুব জোরালোভাবেই তা পাওয়া যায়। এখানে ‘নারী’ প্রবন্ধ থেকে তার খানিকটা উল্লেখ না করে পারছি না। তিনি লিখেছেন, ‘কালের প্রভাবে মেয়েদের জীবনের ক্ষেত্র এই যে, স্বতই প্রসারিত হয়ে চলেছে, এই যে মুক্ত সংসারের জগতে মেয়েরা আপনিই এসে পড়ছে, এতে করে আত্মরক্ষা এবং আত্মসম্মানের জন্য তাদের বিশেষ করে বুদ্ধির চর্চা, বিদ্যার চর্চা, একান্ত আবশ্যক হয়ে উঠল। তাই দেখতে দেখতে এর বাধা দূর হয়ে চলেছে। নিরক্ষতার লজ্জা আজ ভদ্র মেয়েদের পক্ষে সকলের চেয়ে বড় লজ্জা, পূর্বকালে মেয়েদের ছাতা-জুতা ব্যবহারের যে লজ্জা ছিল এ তার চেয়ে বেশি, বাটনা-বাটা কোটনা কোটা সম্বন্ধে অনৈপুণ্যের অখ্যাতি তার কাছে কিছুই নয়। অর্থাৎ গার্হস্থ্য বাজার-দরেই মেয়েদের দর, এমন কথা আজকের দিনে বিয়ের বাজারেও ষোলো-আনা খাটছে না। যে বিদ্যার মূল্য সার্বভৌমিক, যা আশু প্রয়োজনের ঐকান্তিক দাবি ছাড়িয়ে চলে যায়, আজ পাত্রীর মহার্ঘতা-যাচাইয়ের জন্য অনেক পরিমাণে সেই বিদ্যার সন্ধান নেয়া হয়। এই প্রণালীতেই আমাদের দেশের আধুনিক মেয়েদের মন ঘরের সমাজ ছাড়িয়ে প্রতিদিন বিশ্বসমাজে উত্তীর্ণ হচ্ছে।’

‘কালান্তর’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ জীবনে ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে রচিত একটি প্রবন্ধ সংকলন। আর সেই প্রবন্ধ সংকলনেই ‘নারী’ প্রবন্ধটি স্থান পেয়েছে। এটি প্রকাশিত হয় আজ থেকে প্রায় ৮২ বছর আগে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর ঠিক ক’বছর আগে ১৯৩৬ সালে। ওই সময়েই রবীন্দ্রনাথ তাঁর চার পাশটাকে দেখে উপলব্ধি করেছিলেন যে নারীর অগ্রগতির প্রশ্নে বিদ্যাবুদ্ধি হয় এমন পাঠ একান্ত আবশ্যক।

নিরক্ষর মানে অন্ধকারে থাকা কিংবা ঘরের কাজ জানলেই কেবল নারীর মুক্তি নেই। এমনকি ঘরের কাজ জানাটাই কেবলমাত্র বিয়ের বাজারে উতরিয়ে যাবার পথ নয়। বরং আধুনিক রুচিসম্পন্ন মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা বিদ্যাবুদ্ধিসম্পন্ন আধুনিক নারীর সন্ধান করেন সেটিও বলেছেন।

রবীন্দ্র রচনায় জোরালোভাবে বার বার এসেছে নারী চরিত্র। তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্মে অসংখ্য নারী চরিত্রের জন্ম দিয়েছেন। এই চরিত্রগুলোকে যেমন করে রোমান্টিকতার মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে হাজির করেছেন তেমনি আবার অন্যদিকে সমাজের নিগূঢ় অন্ধকার দিকটিও নারীর মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের নারী চরিত্রগুলোর মধ্যে যেমন আধুনিকতার অভাব নেই আবার বঞ্চিতের সংখ্যাটিও নিতান্ত কম নয়। রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ সময় আমাদের গ্রাম-বাংলায় অবস্থান করেছেন এবং ঘুরেছেন বিরামহীন। গ্রামীণ জীবনের নিগূঢ় বাস্তবতা অবলোকন করেছেন গভীরভাবে। আর এজন্যই তাঁর ছোটগল্পে সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা যেমন যৌতুক প্রথা এবং বাল্য বিবাহের মতো অভিশাপ সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নারীর বিদ্রোহী সত্তা। যৌতুক প্রথার দেনা-পাওনা নিয়ে নিরুপমার প্রতিবাদ শুরু হয়ে আত্মহননের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। আবার ‘অপরিচিতা’র কল্যাণীর প্রতিবাদে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যেও বহির্প্রকাশ ঘটে। ‘বোস্টমী’ গল্পে বা ‘পয়লা নম্বরের’ অনিলা নারী সত্তার মুক্তির লক্ষ্যে ঘর ছেড়েছে। ‘মানভঞ্জন’ গল্পে গিরিবালার স্বামীর প্রতি যে প্রতিশোধের চিত্র তা ওই সময়ের প্রেক্ষিতে সত্যিই এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। ‘বদনাম’ গল্পের সৌদামিনী বা ‘শাস্তি’র চন্দরা যেন এক বিস্ময়। ‘স্ত্রীর পত্র’তো পাশ্চাত্যের নারীদের ছায়া। এই গল্পে রবীন্দ্রনাথ নারীমুক্তির প্রসঙ্গ টেনেছেন ব্যক্তিত্ব সচেতন মৃণালিনীর জবানীতে আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে। ‘ল্যাবরেটরি’ গল্পের সোহানীর যে বিদ্রোহ তা রবীন্দ্র রচনার পূর্বাপর সতীত্ব-পত্নীত্ব ও দাম্পত্য প্রেমের এক মাত্রিক ধারণাকে স্বয়ং তিনি ভেঙেচুরে দূরে ফেলে দেন। জীবনের শেষপ্রান্তে লেখা এ গল্প সত্যিই পাঠকমনকে অভিভূত করে। কবিতায় রবীন্দ্রনাথ নারী ভাবনায় আরও এগিয়ে। যেখানে নারী নির্যাতনের ছবি বা ব্যক্তি সত্তার প্রকাশ ‘বলাকা’ ও ‘পলাতকা’ কাব্যে পাওয়া যায়। ‘পলাতকা’ কাব্যের ‘মুক্তি’ কবিতায় নারীর কষ্ট ফুটে উঠেছে। ‘সাধারণ মেয়ে’ কবিতায় শরৎ বাবুকে মালতির অনুরোধ নারীকে জিতিয়ে দেয়ার আকুতি খুঁজে পাওয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু থেকেই মেয়েদের ভর্তি এবং নারী শিক্ষার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং এখনও সেই ঐতিহ্য বজায় রাখা হয়েছে। আজ থেকে প্রায় দেড়শ’ বছর আগে জন্ম নেয়া এই মহান বঙালী ছিলেন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক। জমিদারপুত্র রবীন্দ্রনাথ যেমন উচ্চশিক্ষিত আধুনিক নারীর সঙ্গে মিশে যেতেও অত্যন্ত সাবলীল ছিলেন আবার তেমনি তাঁর নিজ গৃহে স্বল্পশিক্ষিত স্ত্রীর সঙ্গেও অত্যন্ত সাবলীল ছিলেন। স্ত্রীকে চিঠি লিখতেও শিখিয়েছিলেন।

আজ থেকে প্রায় শত বর্ষ বা তারও আগে সৃজনশীল দুনিয়ার এই মহান কারিগর তাঁর সৃষ্ট নারী চরিত্রকে যে সম্মান এবং সুমহান মর্যাদার আসনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন তা সত্যিই এই সময়ে এসে ভাবতেও অবাক লাগে। কী ব্যক্তি জীবনে কী সৃষ্টিকর্মে দুই জায়গাতেই নারী মুক্তির প্রয়াস চালিয়ে গেছেন সমানতালে।

তিনি সেই সময়ে তার সৃষ্টিকর্মে নারীকে যেভাবে তুলে ধরেছেন তা এই সময়েও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাঁর ব্যক্তি জীবন চর্চায় নারীর যে অবস্থান সেটিও অত্যন্ত ইতিবাচক। নারী প্রগতির এই মহান কারিগর নারী জাগরণে তাঁর অবদানের জন্যও আজীবন বাঙালীর মানসপটে থেকে যাবেন।