১০ মে ২০১৯

ঢাকার যত নগর

কোন কিছু দেখে বা শুনে মানুষ নামকরণ করার চেষ্টা করে। এটাই হয়তো স্বাভাবিক। কারণ নামের মধ্য দিয়েই সবার কাছে বিষয়টি উপস্থাপিত হয়ে থাকে। এই নামকরণের ক্ষেত্রে অনেক বিষয় নির্ভর করে। নামটি নানাভাবে প্রভাবিত হতে পারে। স্থান-নাম হচ্ছে কোন একটি স্থানের শনাক্তকারী বর্ণনা। আর নামকরণের উদ্দেশ্য হচ্ছে সংশ্লিষ্ট স্থানের নিজস্ব পরিচয় তৈরি করা এবং আশপাশের অন্যান্য স্থানের পরিচয় থেকে আলাদা করা। তাই স্থান-নামকে এক ধরনের বর্ণনামূলক সনাক্তি বা বর্ণনামূলক পরিচয়পত্র বলা যেতে পারে। সেই স্থান-নামের শেষে ‘নগর’ রয়েছে এমন নামের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়।

একসময় নগর বলতে বোঝাতো পাথর বা ইট নির্মিত গৃহ সংবলিত ধনী বা রাজা বা দেবতা অধিষ্ঠিত গ্রামকে। পরে এর অর্থ ক্ষয় পেয়ে ইটে গাঁথা শিবালয় বা দেবালয়বিশিষ্ট গ্রামকে বোঝাতে থাকে। তবে আমাদের দেশ ইট-পাথরের দেশ নয়, মাটি-কাঠ-বাঁশের দেশ। তারপরও আমাদের অনেক জেলা-উপজেলার মতো রাজধানীতেও রয়েছে নগর সংবলিত অনেক নাম। তবে সেই নামের অনেকগুলোই নগর-এর আসল অর্থ এখন আর কোনভাবেই বহন করে না।

শেরে বাংলা নগর : পাকিস্তান আমলে ঢাকা ছিল প্রাদেশিক রাজধানী। দ্বিতীয় রাজধানীর মর্যাদা দানের জন্য পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ঢাকার উত্তর দিকের অনেকখানি জায়গা অধিগ্রহণ করে নতুন একটি নগর প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানের আগারগাঁও অঞ্চলে অবস্থিত সেই নগরটিকে সবাই ‘আইয়ুবনগর’ নামে অভিহিত করতো। তবে দেশ স্বাধীন হবার পর বাংলার কৃষককূলের অবিসংবাদিত নেতা এবং বাঙালী জাতীয়তাবাদের দিশারী শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক-এর নামানুসারে আইয়ুবনগরের নাম বদল করে নামকরণ করা হয় শেরে বাংলা নগর। বর্তমানে এই এলাকাটি নানা কারণেই বিখ্যাত। এখানে রয়েছে জাতীয় সংসদ ভবন, আবহাওয়া অধিদফতর, কম্পিউটার সিটি, পঙ্গু ও শিশু হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ বেতারসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান। দিনভর হাজারো মানুষের ব্যস্ততায় এলাকাটি মুখরিত।

কাপুড়িয়ানগর : কাপুড়িয়ানগর নামে ঢাকায় বেশ পুরনো একটি মহল্লা রয়েছে। মোগল আমলের শেষ দিকে এবং কোম্পানি শাসনের গোড়ার দিকে ঢাকার বসাক, তাঁতি, যোগী এবং তাদের আশপাশের মানুষ যে কাপড় বুনতো সেগুলো তারা এই কাপুড়িয়ানগরে এনে বিক্রি করত। সে কারণেই এ অঞ্চলটি কাপুড়িয়ানগর নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এই নামটির সঙ্গে নানাভাবে জড়িয়ে আছে ইতিহাস। তবে ১৯২২ সালে এলাকার বঙ্গ বিহারী সাহার ছেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে কালিচরণ সাহার ছেলে বিজলী বাতি সম্প্রসারণের জন্য ঢাকা পৌরসভায় মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা প্রদান করে এলাকাবাসীর তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও ঐতিহাসিক কাপুড়িয়া নগরের নাম বদলে রাখে কালিচরণ সাহা রোড।

কাশিমনগর : মোগল আমলে ভারতবর্ষের কাশ্মীরের সঙ্গে পূর্বাঞ্চলীয় মহানগর ঢাকার সম্পর্ক ছিল নিবিড়। কাশ্মীরী শাল, আখরোট, বাদাম, আপেল, আঙুর যেমন বাংলার মানুষকে আকর্ষণ করত, ঠিক তেমনিভাবে বাংলার মসলিনসহ বিভিন্ন মূল্যবান বস্ত্র, চিনি, গুড়, লবণ, চামড়া কশ্মীরীদেরও প্রিয় ছিল। ফলে বাংলা ও কাশ্মীরের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল গভীর। ঢাকার লালবাগ এলাকায় অবস্থিত চৌধুরীবাজারের পাশেই রয়েছে কাশ্মীরীটোলা নামে একটি জায়গা। এখানে একসময় বেশ কিছু সংখ্যক কাশ্মীরীর বসবাস ছিল। তাদের অনেকেই ঢাকার সামাজিক জীবনের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠভাবে মিশে গিয়েছিলেন। ঢাকার নানা উন্নয়নে তাদের অবদানও ছিল। মূলত এখানে বসবাসকারীরা বাদশাহের অধীনস্থ চাকরিজীবী ছিলেন। কাশ্মীরীদের বাসস্থান ছিল বলেই এলাকাটির নাম ছিল কাশ্মীরীটোলা। দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীরীটোলা নামেই পরিচিত থাকলেও ১৮৫৯ সালে ঢাকার মানচিত্রে এলাকাটিকে ‘কাশিমনগর’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। কাশিমনগর সরকারীভাবে স্বীকৃত হলেও জনমনে ঐ নামের স্থান রয়েছে সামান্যই।

গোয়ালনগর : মোগল আমলে পুরনো ঢাকার ধোলাই খালের কাছে বসবাসকারী গোয়ালাদের দুধ-ঘি-দই ছিল নামকরা। দুধ বিক্রি করে কিংবা দুধ দিয়ে উৎপন্ন পণ্য বিক্রি করে জীবিকা চালায় যারা তাদের বলা হয় গোয়ালা। একসময় ঢাকার বেশ কয়েকটি এলাকায় গোয়ালাদের বাস ছিল। তারা দুধেল গাভী পুষতো এবং প্রতিদিন গাভী থেকে প্রচুর দুধ আহরণ করত। কালে কালে গোয়ালাদের বাস ছিল বলে ঐ অঞ্চল ‘গোয়ালনগর’ নামে পরিচিতি লাভ করে। শত বছরের ব্যবধানে শহরায়ন ও শিল্পায়নের প্রকোপে অনেকদিন হলো গোয়ালারা গোয়ালনগর ত্যাগ করে উন্নততর নানা পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করেছে; তাঁবু আজও ঐ এলাকাকে গোয়ালনগর নামেই ডাকা হয়।

জামদানি নগর: একসময় ঢাকার মসলিন কাপড় ছিল বিশ্বখ্যাত। দেশে-বিদেশে ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছে এর দারুণ সমাদর ছিল। সে সময় মসলিনকে কেন্দ্র করে ঢাকার খ্যাতি দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এত সূক্ষ্ম ও মসৃণ কাপড় পৃথিবীর আর কোথাও তৈরি হতো না। বর্তমান সময়ের কোতোয়ালি রোডটি একসময় ঢাকাবাসীর কাছে জামদানিনগর নামে পরিচিতি ছিল। ঢাকার তাঁতিবাজারের একটি অংশে বাস করতো বিখ্যাত জামদানি শাড়ির বয়নকারীরা। জামদানি বাদে অন্যান্য শাড়ি বয়নের কাজ করতো সাধারণত হিন্দু তাঁতি সম্প্রদায়। আর একমাত্র মুসলমান বয়নকারীরাই জামদানি শাড়ি বয়ন করতে পারত। তাদের নামানুসারেই ঐ এলাকাটি জামদানি নগরে পরিণত হয়। বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে জামদানি শাড়ির প্রচলন থাকলেও জামদানি নগরের বিলুপ্তি ঘটেছে অনেক আগেই। জামদানি নগরের পাশে কোতোয়ালি থানার অবস্থান ছিল বলে পরবর্তীকালে জামদানি নগর কোতোয়ালি রোড নামে পরিচিত হয়ে যায়। তবে ১৯২১ সালে এলাকার বিশিষ্ট প্রভাবশালী হরিপ্রসন্ন মিত্রের পুত্র পৌরসভাকে মাত্র আড়াইশ টাকা দান করে এবং তাঁরই আবেদনক্রমে পৌরসভা কোতোয়ালি রোডকে হরিপ্রসন্ন রোড নামে রেখে দেন। অবশ্য এই নামটি এখন বিস্মৃত।

কালুনগর : সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কত কিছুই হারিয়ে যায়। যেমন হারিয়ে গেছে ঢাকার অনেক স্থান নাম। ঢাকা মহানগরীর পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে অবস্থিত কালুনগর এলাকাটিতে অনেক আগে ‘কালা মিয়া সরদার’ নামে একজন প্রভাবশালী সরদার বাস করতেন। তারই নামানুসারে এলাকাটির নামকরণ করা কালুনগর। নামটি বিকৃত হয়ে ব্রিটিশ আমলে কিছুদিন লোকমুখে উচ্চারিত হতো ‘কালিনগর’ বলে; পরে আবার কালুনগর নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে।

জালুয়ানগর : যারা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে তাদের বলা হয় জেলে বা জালুয়া। পাঠান আমলে ঢাকার পূর্বভাগে অর্থাৎ বর্তমানে যাত্রাবাড়ী এলাকার কাছাকাছি ধোলাই খালের পাড়ে জেলেদের একটি পাড়া গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে মোগল আমলে ঢাকা শহর যখন পশ্চিম দিকে সম্প্রসারিত হয়, তখন মৎস্যজীবীদের একটি অংশ বর্তমান আজিমপুরের পশ্চিমভাগে তুরাগ নদীর তীরে চলে আসে। উনিশ শতকের শেষভাগে জেলেপাড়াটি একটি জনবহুল এলাকায় পরিণত হয়। অবশ্য মৎস্যজীবী সম্প্রদায় ছাড়াও এখানে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষজন বাস করতে শুরু করে। তবে এলাকাবাসীর মধ্যে জেলেদের প্রাধান্য থাকায় এলাকাটি ‘জালুয়ানগর’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ঢাকার তৎকালীন সিভিল সার্জন ও গবেষক জেমস ওয়াইজ তাঁর ‘পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও পেশার বিবরণ’ শীর্ষক গ্রন্থে জানাচ্ছেন- জালুয়ানগরের জেলেরা হুগলি জেলার জেলেদের চেয়ে ভিন্ন স্বভাবের এবং তারা দেহ- বৈশিষ্ট্যেও স্বতন্ত্র। একটা সময় ঢাকার আশপাশের নদী ও খাল-বিল ভরাট হয়ে গেলে এখানকার জেলে সম্প্রদায়ের একটি বিশাল অংশ তাদের জীবিকা বদলে ফেলেছে। এদের একটি অংশ মাছ ধরার পরিবর্তে বিভিন্ন মাছের আড়ত ও বাজারে মাছ বিক্রির পেশা গ্রহণ করেছে।

বানিয়ানগর : সাধারণভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা ব্যবসায় নিয়োজিত তাদেরকে বলা হয় বণিক বা বানিয়া। ঢাকার যে এলাকায় হিন্দু বণিকেরা বাস করত, মোগল আমলের অনেক আগে থেকেই সেই এলাকাটি ‘বানিয়ানগর’ নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। ধারণা করা হয়ে থাকে যে, হিন্দু আমলেই এলাকাটি গড়ে ওঠে। বানিয়ানগর হচ্ছে ঢাকার পেশাজীবীদের নামে পুরনো ঢাকায় গড়ে ওঠা একটি গুচ্ছ আবাসস্থল। নামের শেষে নগর শব্দটি থাকায় অনেকে মনে করেন, বানিয়ানগর ছিল তাদের আবাস ও পেশাস্থল।

ঢালকানগর : কত কারণে বিভিন্ন নামের উৎপত্তি হয়েছে তা সত্যিই বিচিত্র। একসময় গেন্ডারিয়া এলাকায় খুব ঢালু একটি জায়গা ছিল। সেখানে যে মহল্লাটি ছিল ঢালুর কারণেই সেটা ‘ঢালকানগর’ নামে পরিচিতি লাভ করে। যদিও নামটি রাখা হয় উর্দু ভাষায়। তবে অন্য আর একটি মত অনুসারে, এখানে তলোয়ারের আঘাত প্রতিরোধক ঢাল তৈরি হতো। এ জন্যই এলাকাটির নামকরণ করা হয় ঢাল-কা- নগর। একসময় ঢালকা নগরে বেশ নামকরা একটি মন্দির ছিল। এই মন্দিরের পাশেই ছিল একটি পুকুর এবং আশ্রম। আশ্রমে থাকতেন হিন্দু বিধবা নীরারা।

বিজয়নগর: পুরনো পল্টন চৌরাস্তা থেকে যে রাস্তাটি কাকরাইলের দিকে চলে গেছে তার মাঝামাঝি অংশে একটি বিরাট পানির ট্যাঙ্ক রয়েছে। এই এলাকাটি ‘বিজয়নগর’ নামে পরিচিত। বিজয়নগরের নামকরণ করা হয়েছে বিজয় থেকে। কিন্তু এখানে কোনো যুদ্ধ হয়েছিল কিনা তা নিশ্চিত করে জানা যায় না। তবে অনেকের মতে, এমনও হতে পারে যে, বিজয় বাবু নামে এখানে কোনো স্থানীয় জমিদার বা বিশিষ্ট ব্যক্তি মহল্লা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নামানুসারেই হয়ত বিজয়নগরের নামকরণ করা হয়েছে।

আনন্দনগর : নামকরণের সঠিক ইতিহাস জানা যায় না এমন নামের সংখ্যা রয়েছে অনেক। যেমন ‘আনন্দনগর’ নামে ঢাকায় একটি মহল্লা রয়েছে। এই নামের সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও ধারণা করা হয় কোন শৌখিন জমিদার বিনোদনের জন্য এই মহল্লা গড়ে তোলেন। তা থেকেই এই নামের উৎপত্তি।

কামারনগর: গনগনে আগুনে একখণ্ড লোহা গলিয়ে পিটিয়ে যারা বিভিন্ন দরকারী উপকরণ যেমন- দা, বঁটি, ছুরি ইত্যাদি তৈরি করে তাদেরকে বলা হয় কামার। এই কাজের জন্য বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন। পুরনো ঢাকায় ‘কামারনগর’ নামে একটি মহল্লা রয়েছে। একসময় এখানে কামারদের আধিক্য ছিল বলেই এই এলাকার এমন নামকরণ করা হয়। এখন অবশ্য তাদের আর খুব একটা চোখে পড়ে না। কিন্তু নামটি রয়ে গেছে এখনও।

মালাকার নগর : অনেক আগে থেকেই ঢাকার এক শ্রেণীর লোক বেশ সম্পদশালী ছিলেন। সেইসঙ্গে ছিলেন বিলাসী। নানাভাবে এই বিলাসী মানুষেরা তাদের ভোগের পসরা সাজাতেন। ঐশ্বর্যের পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত জীবন ছিল বেশ আনন্দময়। ঢাকার এসব বিলাসী মানুষ ফুলপ্রিয় ছিলেন। আর ঐ ফুলের যোগান আসতো ঢাকার বিভিন্ন বাগ-বাগিচা থেকে। মালিরা যেমন কাঁচা ফুলের যোগান দিয়ে এসব ফুলপ্রিয় মানুষদের সহায়তা করতো, তেমনি একশ্রেণির শিল্পী ছিলেন যারা খুব ভাল মানের ফুলের মালা বানাতে পারতেন। তাদের বলা হতো মালাকার। তারা রঙিন কাগজ দিয়ে কৃত্রিম ফুলের মালা তৈরিতেও সমান পারদর্শী ছিলেন। হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের বিয়ে-শাদি, ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মালাকারদের হাতের ছোঁয়ায় পরিবেশ হয়ে উঠতো মনোমুগ্ধকর। মালাকাররা যে স্থানে বসবাস করত সে এলাকাকে বলা হতো ‘মালাকার নগর’।

মহাজন নগর: ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা ও ঢাকা থেকে খাজনা দিল্লিতে পাঠানোর আগে ঢাকার নবাবপুর থেকে টাকা বিনিয়য় করা হতো। এভাবে এই এলাকায় গড়ে উঠেছিল একটি টাকার হাট। এই হাটের বিনিময়কারীরা পরিচিত ছিলেন মহাজন নামে। তাদের নামানুসারে একটি মহল্লা গড়ে ওঠে, যার নাম মহাজন নগর। কিন্তু কালে কালে যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশের ফলে সেই মহাজনেরা এখন আর নেই। নেই সেই এলাকার চিহ্ন। তবে অনেক ধরনের গল্প আর কিংবদন্তিতে টিকে আছে আজও ঐ এলাকাটির নাম।

মানিকনগর: যাত্রাবাড়ী ও সবুজবাগ থানার অন্তর্গত একটি জনবহুল এলাকার নাম মানিকনগর। এলাকাটি একসময় ‘ছনটেক’ নামে পরিচিত ছিল। কারণ এই এলাকায় তখন অনেক ছন উৎপন্ন হতো। তবে ছন বাদেও এখানে একসময় প্রচুর পরিমাণে বাঁধাকপি উৎপন্ন হতো। এমন কথা প্রচলিত আছে যে, এই ছনটেক এলাকার অধিবাসীরা বাঁধাকপি বিক্রি করে প্রচুর টাকা-পয়সা আয় করতো বলে আশপাশের এলাকার লোকেরা মনে করতো তারা মানিক পেয়েছে। কালে কালে তা থেকেই নাকি ‘মানিকনগর’। মানিকনগরের উত্তরে মুগদা, দক্ষিণে যাত্রাবাড়ী, পূর্বে কাজলা এবং পশ্চিমে গোপীবাগ ও কমলাপুর অবস্থিত।

যোগীনগর: একটা সময় ছিল যখন ঢাকায় তৈরি মসলিন বিশ্বে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। এত সূক্ষ্ম ও মসৃণ কাপড় সেই সময়ে পৃথিবীর আর কোথাও তৈরি হতো না। ফলে মসলিনকে কেন্দ্র করে ঢাকার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। এই কাপড় বুনতো হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁতি সম্প্রদায়ভুক্ত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বলা হতো যোগী। যোগীরা পুরনো ঢাকার যে জায়গাতে বসবাস করতো সেই এলাকাটি ‘যোগীনগর’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৮০১ সাল নাগাদ যখন এই শিল্পের অবনতি শুরু হয় তখন ধীরে ধীরে যোগীরা এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

শহীদনগর : ঢাকার নবাবগঞ্জ এলাকার পাশে লালবাগ চর নামে একটি বিরাট চরভূমি ছিল। এই চরে বর্ষার আগে কৃষিকাজ চলতো, কিন্তু শুকনো মৌসুমে এখানে খেলাধুলাসহ চলতো ঘুড়ি উৎসব। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় অনেক শহীদের লাশ ফেলা হয়েছিল এখানে। প্রায় একশ’ বছর পর ১৯৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই চর এলাকার নতুন নামকরণ করা হয় ‘শহীদনগর’।