১৪ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গ্রামীণ খেলার একাল-সেকাল

  • শৈশবে যে সব খেলাধুলা খেলেছিলেন আজকের প্রবীণরা সেসব না দেখতে পেয়ে তারাও ভুলে যাচ্ছেন তাদের প্রিয় সেসব খেলার নাম

ডিজিটালের ছোঁয়া এবং কর্ম পদ্ধতির সমন্বয়ে সৃষ্ট আধুনিক সভ্যতার কাছে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন সভ্যতা, স্মৃতি, ঐতিহ্য, খেলাধুলাসহ অতীতের সকল কিছু। শৈশবে যে সব খেলাধুলা খেলেছিলেন আজকের প্রবীণরা সেসব না দেখতে পেয়ে তারাও ভুলে যাচ্ছেন তাদের প্রিয় সেসব খেলার নাম। এক সময় গ্রামের শিশু ও যুবকরা পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলায় পারদর্শী ছিল। তারা অবসরে গ্রামের খোলা মাঠে দল বেঁধে খেলত কাবাডি, গোল্লাছুট, ডাংগুলি, গাদন ও লাঠিখেলা, হাঁড়িভাঙ্গা, দড়ি লাফানো, এক্কাদোক্কা, কুতকুত, রুমাল চুরি, কানামাছিসহ নানা প্রকার খেলা। এখন আর সেসব খেলা খুঁজে পাওয়া কঠিন। ডিজিটালের প্রভাবে মানুষ মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ওয়েবসাইটসহ নানা প্রকার আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক মাধ্যমের খেলায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। অবশ্য ঈশ্বরদী এলাকায় যেমন আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় খেলাধুলাসহ সকল ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়েছে। তেমনি এ এলাকার ঐতিহ্যবাহী লাঠি, কাবাডি ও গাদন খেলায়ও পরিবর্তন এসেছে।

এক সময় সকাল নেই বিকেল নেই পাড়ায়-মহল্লায় চলতো ঢাকঢোল পিটিয়ে এসব খেলা। দলনেতারা বেশ প্রভাবের সঙ্গেই বিভিন্ন এলাকায় খেলতে যেত। খেলায় হার-জিতের পর পাড়া-মহল্লায় খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা হতো। এখনকার সকল বয়সী ছেলেমেয়ে ও মানুষের মধ্যে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে, কারও মনে থাকবে না ঈশ্বরদী প্লাজা সিনেমা হলে মর্নিং শো নামের একটা শো হতো যেখানে এক টিকিটে দুই ছবি দেখানো হতো। এক সময় কেউ জানবে না স্কুল ব্যাগে পোশাক লুকিয়ে রেখে স্কুল পালানোর গল্প। এক সময় কেউ জানবে না শব-ই-বরাতের রাতে মসজিদে নামাজ আদায়ের পরিবর্তে ঈশ্বরদী শহর চোষে বেড়ানো এবং পটকা ফোটানোর গল্প।

এক সময় কেউ মনে রাখবে না সন্ধার পর কারেন্ট চলে গেলে বিনা নোটিসে এক সঙ্গে সবার জড়ো হয়ে মজা করে লুকোচুরি খেলা আর আড্ডা দেওয়ার কাহিনী। এক সময় কেউ বলতে পারবে না শীতের রাতে ফেলে রাখা চার দেয়ালের মাঝে ব্যাটমিন্টন খেলার স্মৃতি। রোজার মাসে পাড়া মহল্লার যুবকদের দল বেঁধে কাফেলা বের করে রোজাদারদের ডেকে ঘুম জাগানোর গল্পও ভুলে যাবে এক সময়। আমের আটি, লিচুর বিচি, মাটির মারবেল, গুলতি, ম্যাচের খোল, সিগারেটের খোল, ভূতের ভয়ে টিনের ঘরে কুপি জ্বালিয়ে গুটিসুটি মেরে থাকার গল্প, এক বিছানায় সমবয়সীদের সঙ্গে লেপ মুড়ি দেয়া, টুক পলান্তিস, ইচিং বিচিং, বরফ পানি, সাত চাড়া, গোল্লা ছুট, বৌছি নামের কোন খেলা ছিল তাও ভুলে যাবে।

এমন এক সময় আসবে যখন বাঁশের এন্টেনা ঘুড়িয়ে বিটিভি বা ইটিভি দেখা ইত্যাদি, ছায়াছন্দ, মিনা-রাজু টারজান, সিন্দাবাদ, আলিফ-লায়লা, প্রখ্যাত উপস্থাপক ফজলে লোহানীর যদি কিছু মনে না করেন অনুষ্ঠান, বিলের মাঝে মাছ ধরা, খেজুরের ডাল দিয়ে ঘোড়া বানানো, কাগজ দিয়ে যুদ্ধ জাহাজ ও উড়োজাহাজ বানিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা, সুপারির ডাল, তিন চাকার বেয়ারিং গাড়ির খেলা, মালাই, কটকটি এই শব্দগুলোও শুধু স্মৃতিই হয়ে থাকবে। তিন গোয়েন্দা পড়ে গুপ্তধন খুঁজতে যাওয়ার গল্প এক সময় কেউ জানবে না। এসব খেলাধুলা আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহন করত। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এসব খেলা ও শব্দগুলো শুধুই স্মৃতি।

গ্রীষ্মের ছুটিতে গ্রামে যাওয়া, এখন যেখানে হাজার টাকার দামী খেলনা নিয়ে শিশুরা মুখ ভার করে বসে থাকে সেখানে আগে ছেলেরাই নানা প্রকার গ্রাম্যখেলা আবিষ্কার করে নিয়মিত খেলাধুলার মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের ঐতিহ্য বজায় রাখত। এখানে উল্লেখ্য, ব্রিটিশ আমল থেকেই ঈশ্বরদী অঞ্চল ছিল উন্নত। পাল পাড়ার মাটির খেলনা আর লাঠিখেলা এ অঞ্চলের খুব বেশি জনপ্রিয় ছিল। তার পর কালের পরিক্রমায় গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত খেলাধুলা থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার মানেরও পরিবর্তন হতে থাকে।

সেই ধারাবাহিকতায় পালপাড়ার খেলনা বিলুপ্ত হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু এলাকার কিছু উদ্যোমী মানুষ আর বোদ্ধা খেলোয়াড়দের চেষ্টা, আর্থিক ব্যয় ও সংগ্রামের ফলে এখনও নিভু নিভু করে জ্বলছে ঈশ্বরদী এলাকার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা ও কাবাডি খেলা।

ঈশ্বরদীর লাঠিয়াল খেলোয়ার বাহিনীর প্রধান নওয়াব আলী গ্রামপুলিশ জানান, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের ঐতিহ্যবাহী এসব খেলা বাঁচিয়ে রাখতে চাই। আগামীতে হয়ত সবাই আরও আধুনিক হবে অনেক বেশি ডিজিটালাইজ হবে। আমাদের সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস হয়ত তাদের কাছে ইতিহাসের পাতায় শুধু গল্প হয়েই থাকবে।

-তৌহিদ আক্তার পান্না, ঈশ্বরদী থেকে