২১ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতালিতে প্রবাসী বাংলাদেশী

  • ড. এমএ ইউসুফ খান

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ কোটিরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশী কর্মরত থেকে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ পরিবার-পরিজনের নিকট পাঠাচ্ছেন। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিটেন্স আয় দেশের অর্থনীতির প্রাণ ভোমরা হিসাবেই বিবেচিত। ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ইতালি একটি উন্নত দেশ। সুপ্রাচীন সভ্যতার দেশ। রাজধানী রোম এবং মিলান উল্লেখযোগ্য শহর। ইতালি একটি শিল্পসমৃদ্ধ দেশ। মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে শিল্পখাত থেকে। মাথাপিছু বার্ষিক আয় প্রায় ৪০ হাজার ডলার। ইতালি বিশ্বের সর্বাধিক মদ উৎপাদনকারী দেশ, টেক্সটাইল উৎপাদনেও ইউরোপের শীর্ষস্থানীয়। ইতালির প্রচলিত মুদ্রা ইউরো।

ইতালিতে কী পরিমাণ প্রবাসী বাংলাদেশী কর্মরত রয়েছে এ ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে জানা গেছে, প্রায় তিন লাখের বেশি বাংলাদেশী ইতালির বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছেন। তবে এদের বেশির-ভাগই রোম ও মিলান সিটিতে কর্মরত রয়েছে। বাকিরা ভেনিসে, বলোনিয়া, নেপোলি, পাডোবা, ব্রেসিয়া, ভিসেনসা, পেসকারা, টেমারো ইত্যাদি উপশহরে কর্মরত রয়েছে। রোম শহরের একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক কেন্দ্রস্থল ‘পিয়াসা ভিক্টোরিও’, যেখানে পড়ন্ত বিকেলে রাস্তায় বের হলে প্রচুর প্রবাসী বাংলাদেশীর সঙ্গে দেখা হয়। তখন মনে হয় নিউইয়র্কের জ্যাকসনহাইটে আছি। শত কর্মব্যস্ততার মাঝে কিছুক্ষণের জন্য হলেও বাংলাদেশী ভাই-বোনদের মিলনমেলা। গোটা পিয়াসা ভিক্টোরিও এলাকা জুড়েই রয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশীদের দোকান-পাট, রেস্টুরেন্ট এবং গ্রোসারির জন্য কাঁচাবাজার। এখানে দেশের আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর থেকে আরম্ভ করে রাজনৈতিক আলোচনা, খোস গল্প-আড্ডা এমনকি কর্মসংস্থানের সন্ধানও মিলে। ইতালিতে বাংলাদেশের প্রায় সব জেলার লোকই কর্মরত রয়েছে। তবে বৃহত্তর ফরিদপুরের বিশেষ করে শরীয়তপুর জেলার লোকসংখ্যা অধিক তারপরেই রয়েছে নোয়াখালী, বরিশাল ও চট্টগ্রামের অবস্থান।

ইতালিতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের কর্মসংস্থানের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। উপার্জন ভাল, খরচ কম। কয়েকজন একসঙ্গে মিলেমিশে থাকে বিধায় খাওয়া-থাকার খরচ কম পড়ে, ফলে প্রতি মাসেই সঞ্চয়ের অর্থ দেশে পাঠাতে পারে। সারা বছরই তাদের উপার্জন ভাল। তবে সামার সিজনে বিশেষ করে জুন, জুলাই ও আগস্ট এই তিন মাসে উপার্জন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। রোম থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সী-বীচে এ-সময়টায় মানুষের ঢল নামে। প্রবাসীরা ট্যুরিস্টদের নিকট বিভিন্ন ধরনের চুড়ি, আংটি, চেইন, গলার মালা, অ্যান্টিক এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ফেরি করে বিক্রি করে প্রচুর উপার্জন করে। তারা সামার সিজনকে উপার্জনের ‘গোল্ডেন টাইম’ হিসেবে বিবেচনা করেন। এমনকি অনেকে সামার সিজনের এ-উপার্জন দ্বারা দেশের বাড়িতে বিষয়-সম্পত্তি কেনার ব্যাপারে পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি নেয়ার জন্য আত্মীয়স্বজনের নিকট আগাম সংবাদ দিয়ে থাকে।

তবে যাদের কাগজপত্র হয়নি, অবৈধভাবে আছেন তারা সবসময় পুলিশের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত থাকে। এক জায়গায় স্থায়ীভাবে থাকেন না। এদিকে-সেদিকে ঘুরে ঘুরে ফল-ফুল বিক্রি করে। দিনে ৫০টি ফুল বিক্রি করতে পারলে ৫০ ইউরো পায়। ২৫ ইউরো ব্যয় হয় বাকি ২৫ ইউরো হাতে থাকে। উপার্জন মন্দ নয়। অনেক প্রবাসী আছেন যারা নতুন, এখনো ইতালির ভাষা রপ্ত করতে পারেননি তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশের দৈনিক জাতীয় পত্রিকাগুলো থেকে সব গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংগ্রহ করে কয়েকপাতা একত্রে স্ট্যাপলার মেরে প্রতিটি এক ইউরোর বিনিময়ে বিভিন্ন প্রবাসী বাংলাদেশীদের দোকানে দোকানে ফেরি করে বিক্রি করে। এ-সব করেও প্রতিদিন গড়ে ৪০/৫০ ইউরো উপার্জন করা সম্ভব হয়। মাঝে মাঝে পুলিশ ধরে। তবে এখানকার পুলিশ ভাল। গালাগাল বা মারধর করে না। একদিন দু’দিন রেখে ছেড়ে দেয়। ইতালিতে বৈধভাবে উপার্জন করতে গেলে ‘স্টে-পারমিট’ অত্যাবশ্যক। যারা অবৈধ, ছোটখাটো কাজ করে, তারা দিন গুনে, স্বপ্ন দেখে, একসময় কাগজপত্র ঠিক হয়ে গেলে ছোটখাটো দোকান বা রেস্টুরেন্ট খুলবে। গ্রাম থেকে ভাই, ভাগনে বা ভাতিজাকে এনে কাজে লাগিয়ে দিবে। কিন্তু সোনার হরিণ কবে ধরা দিবে সে আশাতেই এ-পথ চলা। ইতালিতে বসবাস ও কাজ করতে হলে ইতালি ভাষা শেখার কোন বিকল্প নেই। ফলে তারা প্রত্যেকেই অল্পদিনের ভিতরে ইতালি ভাষা রপ্ত করে ফেলে।

এক সুন্দর বিকেলের পড়ন্ত বেলায় মুগ্ধ হয়ে সী-বীচের মনোরম দৃশ্যাবলী দেখছিল তিনজন প্রবাসী বাংলাদেশী। সকলেরই বয়স প্রায় ৩০-এর কোঠায়। তিনজনই খুব মনোযোগ সহকারে ট্যুরিস্টদের কাছে ছোটখাটো জিনিসপত্র ফেরি করে বিক্রি করছিলেন। দেশের বাড়ি শরীয়তপুর। বছর দু’য়েক হলো ইতালিতে এসেছেন। কিভাবে ইতালির এ-সংগ্রামবহুল প্রবাস জীবনে পাড়ি জমালেন তা তারা ধীরে ধীরে খুলে বললেন। পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, বরফের উপর দিয়ে শত শত মাইল শুধু হাঁটতেই হয়নি, দেশে দেশে জেল-জুলুম এমনকি ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে ভিক্ষা পর্যন্ত করতে হয়েছে। এক একজনের প্রায় দশÑবারো লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এক আদম ব্যবসায়ী একই গ্রামের পাঁচ বন্ধুকে ঢাকা থেকে মস্কোগামী প্লেনে তুলে দিয়েই খালাস। তারপর থেকেই শুরু হয় জীবনযাত্রার দীর্ঘ সংগ্রাম। বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে ঢুকতে হয়েছে এক এক দেশের সীমান্তে। গোপনে রাতের অন্ধকারে ঐ-সব দেশের সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে যেতে হয়েছে আর এক দেশের সীমান্তে। দিনের পর দিন থাকতে হয়েছে অনাহারে-অর্ধাহারে। ইতালি তো দূরের কথা, জীবনে আর কখনও দেশে ফিরতে পারবেন বলেও তারা ভাবতে পারেননি। এত সংগ্রাম করার পর অবশেষে ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন হয়েছে। পাঁচ বন্ধু একত্রে যাত্রা শুরু করলেও তিনজন ইতালিতে ঢুকতে পেরেছেন। বাকি দু’জনের ভাগ্যে কি ঘটেছে সে খবর আজ পর্যন্তও তারা জানতে পারেন নি। হয়তো কোন দেশের জেল-হাজতে বন্দী অবস্থায় পচে-গলে মরছে। সোনার হরিণের দেশ ইতালিতে পাড়ি জমানোর এ-কাহিনী অমানবিক, লোমহর্ষক ও অবিশ্বাস্য। নিজের দেশে অকর্মণ্য অপদার্থ বলে পরিচিত এ-সব যুবকই ইতালির চমৎকার পরিবেশে বিনয়ী, দক্ষ ও পরিশ্রমী হিসাবে সুনাম কেড়েছে এবং এদের পাঠানো রেমিট্যান্স আজ দেশকে সমৃদ্ধ করছে।