২৪ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাট শিল্পের হাল

গ্রীষ্মের খরতপ্ত দুপুরে প্রচন্ড দাবদাহের মধ্যে টানা সাত দিনের মতো রাজধানীর সন্নিকটে ডেমরায় এবং খুলনায় রাজপথে নেমে এসেছেন হাজার হাজার পাটকল শ্রমিক। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের দাবি- তাদের প্রায় ১০ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া পড়ে আছে। ৯ দফার মধ্যে তাদের অন্যতম তিনটি দাবি হচ্ছে বকেয়া মজুরি পরিশোধ, মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন এবং ঈদের আগে বেতন-বোনাস-উৎসবভাতা প্রদান। কিছুদিন আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হলেও সমাধান মেলেনি আজ পর্যন্ত। ফলে নিতান্ত বাধ্য হয়েই রমজানে রোজা রেখেও তাদের বেছে নিতে হয়েছে রাজপথের কর্মসূচী। অন্যদিকে বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন (বিজেএমসি) অনেকটা অসহায়ের মতো তাকিয়ে রয়েছে সরকারের দিকে। বেসরকারী পাটকলগুলো যেখানে ক্রমাগত লাভের মুখ দেখছে, তখন বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারী ২২টি পাটকল ক্রমাগত লোকসান দিচ্ছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ৬ মার্চ জাতীয় পাট দিবসে বিজেএমসির এহেন লোকসান দেয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আসলে সংস্থাটির লোকসানের বড় কারণ অদক্ষতা, অযোগ্যতা, অব্যবস্থাপনা, পাট ক্রয়ে দুর্নীতি, পুরনো যন্ত্রপাতির ব্যবহার ইত্যাদি। এই অবস্থায় যুক্তরাজ্য ফেরত প্রধানমন্ত্রীর ভর্তুকি ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে বিজেএমসি।

রাষ্ট্রায়ত্ত ২২টি পাটকল কেন অব্যাহত লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না তার কারণ অনুসন্ধান জরুরী ও অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সত্য বটে, বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পাটের সুদিন আবার ফিরে এসেছে। এমনকি বাংলাদেশেও বেসরকারী পাটকলগুলো ভাল করছে। পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে রফতানি আয়ও বাড়ছে। অথচ সরকারী পাটকলগুলো ক্রমাগত লোকসান দিচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাটকলগুলোর লোকসান হয়েছে ৪৬৬ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত লোকসানের পরিমাণ ৩৯৫ কোটি টাকা। ফলে স্বভাবতই পাটকল শ্রমিকদের বেতন বকেয়া পড়েছে ৮-১০ সপ্তাহের। অন্যদিকে কর্মচারীরা বেতন পান না তিন-চার মাস ধরে। অতঃপর পাটকল শ্রমিকরা ধর্মঘট ও অবরোধে নেমেছেন রাজপথ-রেলপথে। ফলে যানবাহন চলাচলসহ ব্যাহত হচ্ছে জনজীবন। বাংলাদেশ পাটকল শ্রমিক লীগের ৯ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে বকেয়া মজুরি, মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন, বরখাস্ত শ্রমিকদের পুনর্বাসন, পাট মৌসুমে পাট কেনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, উৎপাদন বাড়ানোসহ মিলগুলোর সংস্কার ও আধুনিকায়ন। পাটকল শ্রমিক নেতৃবৃন্দের মতে, সরকারী পাটকলের লোকসানের অন্যতম কারণ কাঁচাপাট কেনায় চরম অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। মিল কর্তৃপক্ষ পাট কেনে দেরিতে এবং বেশি দামে। এছাড়াও সরকারী পাটকলের উৎপাদন ক্ষমতা কম, উৎপাদনে খরচ বেশি, যন্ত্রপাতি পুরনো ও মজুরি বেশি। তদুপরি চট ও চটের বস্তা ছাড়া আর কিছু তৈরি করতে পারে না সরকারী পাটকলগুলো। জগদ্দল পুরনো অবকাঠামোর এই আমলাতান্ত্রিক বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে সরকারী পাটকলগুলোর ভবিষ্যত নেই বললেই চলে। বাস্তবে স্বর্ণযুগ ফিরে এসেছে সোনালি আঁশ পাটের। বর্তমানে পাট থেকে তৈরি হচ্ছে ২৩৫ রকমের আকর্ষণীয় ও মূল্যবান পণ্য। সবচেয়ে বড় কথা, পাট থেকে তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব পচনশীল পলিথিন। বর্তমানে যে প্লাস্টিক পলিথিন দেশে ও বিদেশে যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে তা প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য সমূহ ক্ষতিকর। সে অবস্থায় বিকল্প হিসেবে পাটের পলিথিন ব্যবহারের অত্যুজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে বিশ্বব্যাপী। বিশ্ববাজারে পাটের ব্যাগের চাহিদা রয়েছে ৫০০ বিলিয়ন পিসের। এর ১০ শতাংশ বাজার দখল করতে পারলে বছরে আয় করা সম্ভব ৫০ হাজার কোটি টাকা। পাট খাতের বৈশ্বিক রফতানি আয়ের ৭২ শতাংশ এখন বাংলাদেশের দখলে। সে অবস্থায় সরকারী পাটকলে লোকসান হবে কেন? এই অবস্থার দ্রুত অবসানে প্রয়োজনে ভর্তুকিতে অভ্যস্ত বিজেএমসির খোলনলচে পাল্টে ফেলা জরুরী ও অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।