২৬ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডেল্টা প্ল্যানে বান্ডালিংয়ের গুরুত্ব দেয়া হয়নি ॥ অভিমত

  • মোঃ এমদাদুল হক বাদশা

বর্তমান সরকার দেশের সার্বিক টেকসই উন্নয়নের জন্য এক শ’ বছর মেয়াদী সুদীর্ঘ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ গ্রহণ করেছে, যা অত্যন্ত যুগোপযোগী এবং অপরিহার্য। কিন্তু লক্ষণীয় যে, এত বড় বিশাল প্রকল্পে স্বল্প ব্যয়ে কার্যকরী বান্ডালিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এমন কি প্রকল্পটি নেয়ার আগে পত্রপত্রিকায় ব্যাপক প্রচারও করা হয়নি, যাতে এই বিষয়ে তথ্যাভিজ্ঞ যথেষ্ট সংখ্যক বিশেষজ্ঞ তাদের সুচিন্তিত মতামত দিতে পারেন। যা হোক এখনও সুযোগ আছে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে মতামত প্রদান ও গ্রহণের।

নদীমাতৃক বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী ভাঙ্গন রোধ এবং নৌ-চলাচলের সুবিধার্থে ড্রেজিংয়ের জন্য সরকার সব সময়ই অনেক অর্থ ব্যয় করে থাকে। এতে কিছু কাজ হয়। কিন্তু এই গরিব দেশে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদ সাধারণ বাঁশ-চাটাই-গাছপালা-পাটের রশি ইত্যাদি দেশীয় অতি স্বল্প মূল্যের জিনিসপত্র দিয়েও যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা-গঙ্গা, আপার মেঘনা, সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে বান্ডালিং করে নদী শাসন, নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধ, নাব্য বৃদ্ধি এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এতে ড্রেজিং থেকে প্রায় ১০ ভাগের এক ভাগ অর্থ ব্যয় হবে। এটাকে প্রাকৃতিক ড্রেজিং (ঘধঃঁৎধষ উৎবফমরহম) বলা হয়। তবে ড্রেজিং অবশ্যই করতে হবে। কারণ সব নদীতে সব সময় বান্ডালিং করে ভাল ফল পাওয়া যাবে না। এ ব্যাপারে বুয়েটের ওয়াটার এ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বিআইডব্লিউটিএ নৌপথ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের প্রাক্তন কর্মকর্তাদের যথেষ্ট বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।

বান্ডালিংয়ের ওপর বুয়েটের পানি সম্পদ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ ইনস্টিটিউটের ৩ জন বিশেষজ্ঞ জাপানের কিওটো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হাজিমি নাকাগাওয়া ও প্রফেসর তাইসুকি ইশিগাকি ২০০৪-০৫ সালে ফরিদপুরের নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় গবেষণা করে মতামত ব্যক্ত করেন যে, নৌপথের নাব্য সংরক্ষণের জন্য ড্রেজিং করা বান্ডালিংয়ের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি ব্যয়বহুল। যমুনা/ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা/গঙ্গা, আপার মেঘনা, সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে ড্রেজিং টেকসই হয় না। কারণ তা এক বছরও টেকে না। বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য ছিল- নদীর নিরাপদ নাব্য গভীরতা সংরক্ষণের জন্য ড্রেজিংয়ের চেয়ে বান্ডালিং অনেক কম ব্যয় সাপেক্ষ। যমুনা-পদ্মা/গঙ্গা-সুরমা-কুশিয়ারার মতো পলিমাটিযুক্ত নদীগুলোতে ড্রেজিং করে এক মৌসুমও টেকসই রাখা সম্ভব নয়। নদীর নাব্য অব্যাহত রাখার জন্য বান্ডাল অথবা ড্রেজিং ও বান্ডালিংয়ের যৌথ কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে। বান্ডালিংয়ের সাহায্যে নদীর গভীরতা ৮ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বান্ডালিংয়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন যে, এই দুর্দশা লাঘবের জন্য বান্ডালিং কাজের নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে ক্রমান্বয়ে দীর্ঘ মেয়াদী ভিত্তিতে নদীর গতিপথ স্থিতিশীল করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। স্পার-ডাইক-লাইক স্ট্রাকচার (Spur-dyke-like structures (Rahman & Muramoto, 1999) স্থাপনের দ্বারা নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়। পরবর্তীতে এসব প্রতিবন্ধক অনেক বড় আকারে ক্ষতির কারণ হয়ে থাকা। ফলে জল-প্রবাহ দীর্ঘমেয়াদীভাবে স্থিতিশীল হতে পারে না। নদীর পার্শাভিমুখীন ডিরেকশনে বান্ডালিংয়ের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতি প্রবাহ অনেক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিধায় নদীপথ সমন্বয় সাধন ও তীর ভূমি উন্নয়নের জন্য অনেক সময় পায়। পলিমাটিযুক্ত নদীতে বান্ডালিং পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে নদীর নাব্য এবং গভীরতা বৃদ্ধি পায়। বান্ডালিং করে উপরোক্ত নদীগুলোকে ৮ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত গভীরতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীর তীর ভাঙ্গন রোধ, নৌ-চলাচল সুগম করা এবং মৎস্য চাষ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা করা যাবে। নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, যমুনা নদীর তীর রক্ষার জন্য প্রতি মিটার বান্ডালিংয়ের জন্য ব্যয় হয় মাত্র ৭০ ডলার। আর আরসিসি স্পারের জন্য ৯৫০ ডলার। রিভেটমেন্টের জন্য ৩৮০০-৪০০০ ডলার। সলিড স্পারের জন্য ২৫০০ ডলার। সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্টের জন্য প্রতি মিটারে খরচ পড়েছে ২১ হাজার ডলার এবং যমুনা ব্রিজের গাইড বাঁধের জন্য প্রতি মিটারে ব্যয় হয়েছে ৩৩ হাজার ডলার।

সুতরাং বাংলাদেশের আর্থিক ব্যয় হ্রাসকল্পে ডেল্টা প্ল্যানে Non-Tidal Rivers যমুনা/ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা/গঙ্গা, সুরমা, কুশিয়ারা নদীগুলোতে খুব কম অর্থ ব্যয়ে টেকসই বান্ডালিংয়ের মাধ্যমে পলি অপসারণ করতঃ নাব্য বৃদ্ধি এবং নদী তীর সুরক্ষা করার ওপর গুরুত্বারোপ করার জন্য অনুরোধ জানাই।

লেখক : নদী গবেষক; সাবেক পরিচালক, বিআইডব্লিউটিএ