১৪ মে ২০১৯

গর্ভবতী মায়ের রোজা এবং সন্তানের ওপর প্রভাব

প্রত্যেক দম্পতি চায় তাদের সংসারে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ সন্তানের আগমন হোক। মানব শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যেঙ্গ তৈরি হয় তার মায়ের গর্ভে। আর প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যেঙ্গ সঠিকভাবে তৈরি হওয়ার জন্য গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে সঠিক সময়ে সঠিক মাত্রায় ও নির্দিষ্ট পরিমাণে পুষ্টি, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, পানি ইত্যাদি সরবরাহ জরুরী। এ সময় গর্ভবতী মায়ের শরীরে শিশুর জন্য কোন কিছুর অভাব ঘটলে পরবর্তী জীবনে দীর্ঘমেয়াদী বা চিরস্থায়ী প্রভাব পড়ে। একজন মানুষের স্বাস্থ্য, মেধা, আচরণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, জন্মগত রোগ, দীর্ঘমেয়াদী অসুখে ভোগা অনেক ক্ষেত্রে মাতৃগর্ভে বেড়ে ওঠার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত যা বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত।

পবিত্র রমজান মাসে গর্ভবতী মায়ের রোজা রাখা না রাখা এবং গর্ভের শিশুর ওপর তার প্রভাব নিয়ে মুসলমান অধ্যুষিত দেশগুলোতে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। বেশিরভাগ গবেষণায় দেখা গেছে গর্ভবতী মা দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে অনাগত শিশুর জীবনে দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী স্বাস্থ্যগত প্রভাব পড়ে। ২০০৯ সালে তেহরান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিশেষজ্ঞরা এক গবেষণায় দেখেন গর্ভাবস্থায় রোজা রাখলে কম ওজনের শিশু জন্মদানের ঝুঁকি দ্বিগুণ এবং ছেলে সন্তানদের ওপর এ প্রভাব অনেক বেশি। সৌদি আরবে ২০১০ সালে গর্ভাবস্থায় রোজা রেখেছিলেন এমন সাত হাজার তিরাশি জন মায়ের ওপর গবেষণায় দেখা যায় তাদের গর্ভফুল বা প্লাসেন্টার ওজনও কম। মাতৃজঠরে গর্ভফুলের মাধ্যমেই শিশুর শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও দরকারি উপাদান সরবরাহ হয়ে থাকে। গর্ভফুলের ওজন কম হলে তা শিশুর ওপর তাৎক্ষণিক বা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য জটিলতা হতে পারে বলে গবেষকরা মতামত দিয়েছেন।

২০১৪ সালে তুরস্কের গাজিয়ানতেপ বিশ^বিদ্যালয়ের প্রসূতি বিভাগের অধ্যাপক এব্রু ডিকেনসয় ও তার সহকর্মীরা গবেষণায় প্রমাণ করেন রমজানে দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে গর্ভবতী মায়েদের রক্তে করটিসল নামক স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায় যা গর্ভস্থ সন্তানের শারীরিক বিপাক ক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তারা আরও দেখেন দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে মায়ের দেহে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা কমে, মায়ের শরীর হতে গর্ভফুলের মাধ্যমে বাচ্চার গায়ে রক্ত চলাচল কমে যায়, যার ফলে বাচ্চার নড়াচড়াও কমে।

২০১১ সালে কলাম্বিয়া বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডগলাস এ্যালমন্ড ও ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের ইকোনমিস্ট ড. ভাস্কর মজুমদার আমেরিকান ইকোনমিক জার্নালে তাদের এক বিষদ গবেষণা প্রকাশ করেন। গবেষণায় আমেরিকায় জন্ম নেয়া বাংলাদেশী ও পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত সাত বছর বয়সের শিশুদের আইকিউ বা বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা করা হয় যাদের মায়েরা গর্ভকালীন সময়ে রোজা রেখেছিলেন। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, রোজা রেখেছিলেন এমন মায়েদের সন্তানদের বুদ্ধিমত্তা অন্যদের চেয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে শতকরা বিশ ভাগ পর্যন্ত কম। ইরাক এবং উগান্ডায় তাদের গবেষণায় একই ফলাফল আসে। গবেষণায় আরও দেখা যায় গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে রোজা রাখলে অনাগত শিশুর মস্তিষ্কের স্নায়ুবিকাশে সবচেযে বেশি ব্যাঘাত ঘটে। ফলে সঠিক ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও ভবিষ্যতে এই শিশুদের জ্ঞানার্জনে বিঘ্নতা (Learning Disability), বুদ্ধিমত্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত ও আচরণগত সমস্যা হতে পারে।

গত বছর আমেরিকান জার্নাল অব এপিডেমিওলোজিতে এক বিস্ময়কর রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত দেশ বুরকিনা ফাসোয় ৪১০২৫ জন শিশুর ওপর গবেষণা চালানো হয় যারা ১৯৯৩ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছিল। এর মধ্যে ২৫০৯৩ শিশুর জন্ম মুসলিম মায়ের গর্ভে যারা ওই সময় রোজা রেখেছিল। গবেষণায় ফলাফলে দেখা যায় এসব শিশুদের পাঁচ বছর বয়সে মৃত্যুর হার অন্য ধর্মের মায়েদের শিশুদের তুলনায় প্রায় ১৫% বেশি। যাদের মায়েরা গর্ভাবস্থার প্রথম ও দ্বিতীয় তিন মাসে রোজা রেখেছিলেন তাদের শিশুদের মধ্যে এই হার বেশি। গবেষণায় বলা হয় গর্ভাবস্থায় দীর্ঘক্ষণ মা না খেয়ে থাকলে সন্তানের শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহের ঘাটতি পড়ে যার ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও বিরূপ পরিবেশে শরীরকে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা কমে যায়।

অবস্থানগত কারণে ইন্দোনেশিয়ায় প্রত্যেক বছর প্রায় সাড়ে তেরো ঘণ্টা না খেয়ে থাকার প্রয়োজন পড়ে রোজা রাখার জন্য। এ বছরও Indonesian Family Life Survey ইকোনমিক্স এ্যান্ড হিউম্যান বায়োলজি জার্নালে গর্ভাবস্থায় রোজা রাখলে সন্তানের কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা তথ্য প্রকাশ করে। ৯৭৭১ জন মায়ের ২১৭২৩ জন সন্তানের ওপর গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণায় দেখা যায় তাদের গড় উচ্চতা যাদের মায়েরা ওই সময় রোজা রাখেননি তাদের সন্তানদের চেয়ে কম এবং স্বাস্থ্য ক্ষীণকায়। শুধু তাই নয়, এদের মধ্যে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, করোনারী হার্ট ডিজিজ ও কিডনি রোগে ভোগার হারও বেশি। একই রকম গবেষণায় উগান্ডা ও ইরাকের গবেষকরা দেখেন গর্ভাবস্থায় দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা মায়েদের সন্তানদের পরিণত বয়সে কানে শোনা, দৃষ্টিশক্তি ও মস্তিষ্কের অনুধাবন শক্তি ক্ষীণ হয়। ১৯৪৪-১৯৪৫ সালে ডাচ ও ১৯৫৯-১৯৬১ সালে চীনে দুর্ভিক্ষের সময় জন্ম নেয়া শিশুদের ক্ষেত্রেও এমন স্বাস্থ্যগত ফলাফল পাওয়া গেছে।

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-

মায়ের গর্ভে একটি শিশু নির্ধারিত সময়কাল অবস্থান করার সুযোগ পায়। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়েই মানব শরীরের জীবন ধারণ, রোগ প্রতিরোধ, মেধা-মনন সবকিছুর প্রয়োজনীয় অঙ্গ প্রত্যেঙ্গ যেমন স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকরী কোষ নিউরন, কিডনির নেফ্রোন, ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ বিটা সেল ইত্যাদি নির্দিষ্ট সংখ্যায় তৈরি হওয়া প্রয়োজন, কেননা জন্মের পর এ সমস্ত কোষ আর তেমন তৈরি হয় না। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে Fetal Programming in Intra-uterine Life বলা হয়। মায়ের পেটেই তৈরি হওয়া এসব কোষকলা দিয়েই বাকি জীবন চালাতে হয়। কাজেই গর্ভবতী মা দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে নির্ধারিত সময়ে শিশুর শরীরের মূল্যবান কোষকলা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ নির্দিষ্ট মাত্রায় সরবরাহের ব্যত্যয় ঘটে। যার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ে শিশুর বাকি জীবনে। গর্ভাবস্থায় দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রসূতি মায়েরা ঘন ঘন প্রসাবের সংক্রমণে ভোগেন। চিকিসকরা এ জন্য ঘন ঘন পানি/তরল পান করতে বলেন। তাছাড়া গর্ভাবস্থায় শতকরা প্রায় ১০ হতে ২০ ভাগ নারীর গর্ভকালীন ডায়াবেটিস দেখা দেয়। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের একটা বড় উপায় হলো একবারে বেশি না খেয়ে বরং অল্প অল্প খাবার বার বার খাওয়া। রোজা রাখলে এসব উপদেশ মেনে চলা সম্ভব হয় না। গর্ভকালীন প্রসাবের সংক্রমণ বা গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিযন্ত্রণ না হলে গর্ভপাত, অসময়ে সন্তান প্রসব, মায়ের উচ্চ রক্তচাপ, কম ওজনের সন্তান প্রসব ইত্যাদি জটিলতা হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে মায়ের শরীরে গ্লুকোজের ঘাটতি কমে। ফলে শরীরে চর্বির অধিক বিপাকক্রিয়ায় কিটোন বডি নামক পদার্থ তৈরি হয় যা গর্ভস্থ শিশুর জন্য মারাত্মক। তাই চিকিৎসকরা ওজন ভেদে গর্ভবতী মাকে স্বাভাবিক খাবারের চেয়ে ৩০০-৫০০ ক্যালোরি বেশি খাদ্য গ্রহণ করতে বলেন। শুধু তাই নয় দিনে তিনবারের পরিবর্তে ছয় বার বা আটবার অর্থাৎ ঘন ঘন অল্প খাবারে গর্ভাবস্থায় মায়ের স্বাস্থ্য ভাল থাকে ও শিশুর সঠিক বৃদ্ধি ঘটে। শুধু সঠিক ওজন নয় স্বাভাবিক স্নায়ুবিকাশ নিয়ে জন্মগ্রহণ স্বাস্থ্যবান মানব জীবন-যাপনের পূর্বশর্ত।

ধর্মীয় ব্যাখ্যা-

গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মা শুধু যে তার নিজের জন্য খাদ্য গ্রহণ করেন তা নয়, বরং তার দেহ হতে প্রতি মুহূর্তে আরেকটি সন্তান খাদ্য গ্রহণ করে থাকে। সঠিক সময়ে গর্ভবতী মা খাদ্য গ্রহণ না করলে সময়মতো সন্তানের দেহে পুষ্টি পৌঁছানো সম্ভব নয়। এসব বিষয় মাথায় রেখে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আলেমরা গর্ভবতী মায়ের রোজা রাখা না রাখা বিষয়ে কোরান হাদিসের আলোকে মতামত প্রদান করেছেন। সন্তানদের স্বাস্থ্য নিয়ে শংকিত হতে পারেন বা যেখানে অনাগত শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে এমন মায়েদের জন্য রোজা রাখা বাধ্যতামূলক নয় বলে বেশিরভাগ আলেমরা মতামত দিয়েছেন। পরবর্তীতে সমানসংখ্যক রোজা রেখে, সমসংখ্যক দিন একজন গরিবকে অন্নদান করে বা অন্য আমলের মাধ্যমে তা পূরণ করতে বলা হয়েছে। আমাদের দেশের বিজ্ঞ আলেমরা সম্মিলিত মতামত প্রদান করে গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের মনের বিভ্রান্তি ও শংকা দূর করতে পারেন। নিজের মনগড়া বিশ্বাস বা আবেগ দিয়ে নয় বরং চিকিৎসক হিসেবে আমরা বৈজ্ঞানিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে গর্ভবতী মাকে রোজা রাখা ও গর্ভস্থ সন্তানের উপর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে থাকি যাতে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

ফোন : ০১৯৭৯০০০০১১