১৪ মে ২০১৯

ভেজালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

জীবনধারণের জন্য খাদ্য প্রয়োজন। অথচ মানহীন ও ভেজাল খাদ্যই আবার জীবনের জন্য ঝুঁকির্পূণ হয়ে ওঠে। বিষয়টি যে খাদ্যপণ্য প্রস্তুত ও বিপণনের সঙ্গে যারা জড়িত তারা জানেন না এমন নয়। তারা জেনেশুনেই এই গর্হিত কাজটি করে থাকেন। কেন করেন? শুধু বাড়তি মুনাফা লাভের আশায় তারা এটা করেন এমনটি ভাবতে গেলে বিস্মিতই হতে হয়। তাহলে তাদের মানবিকতা রইল কোথায়? কোন্ চুলোয় গড়িয়েছে তাদের মূল্যবোধ! ভেজাল খেয়ে তাদের নিকটজনও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। ঘটতে পারে তাদের স্বাস্থ্যহানি। এই বাস্তবতা জেনেও তারা নিজেদের সংযত করেন না। এসব লোককে তাই চোখে আঙ্গুল দিয়ে তাদের অপরাধকর্ম দেখিয়ে দেয়া দরকার। তাদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা চাই। সর্বোপরি তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা জরুরী।

দেশের উচ্চ আদালত সম্প্রতি ৫২টি মানহীন খাদ্যপণ্যের তালিকা দিয়েছে। ভাবলে অবাক হতে হয় যে, নামী কোম্পানির সব খাদ্যপণ্য এই তালিকায় স্থান পেয়েছে। কী নেই মানহীন ওই পণ্যের তালিকায়? রয়েছে সরিষার তেল, লবণ, লাচ্ছা সেমাই, নানারকম মসলা, চিপস, নুডলসসহ বেশ কিছু খাদ্যপণ্য। এর ভেতর অনেক খাদ্যপণ্যের বিজ্ঞাপন টেলিভিশনে ফলাও করে প্রচার হয়ে থাকে। লবণের নাম বললেই যে ব্র্যান্ডের লবণটির কথা সবার আগে চলে আসে, দেখা যাচ্ছে সেটিই মানহীন। মানুষ তাহলে কাকে বিশ্বাস করবে? কোথায় যাবে? উচ্চ আদালত নির্দেশনা দিয়ে বলেছে, মানহীন ৫২টি খাদ্যপণ্য বাজার থেকে দ্রুত প্রত্যাহার করতে হবে। একই সঙ্গে আরও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে, বাজারে থাকা ১৮টি কোম্পানির এসব পণ্য দ্রুত অপসারণ করে ধ্বংস এবং মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হবে। খুবই স্পষ্ট নির্দেশনা। সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ ও তৎপরতার নির্দেশ। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকে এসব নির্দেশ বাস্তবায়ন করে আগামী ১০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। সমাজের জন্য এটি স্বস্তিকর বার্তা।

অপরাধী অপরাধ করে কীভাবে পার পেয়ে যায় সেটি একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। খাদ্যপণ্য যে মানহীন এবং তাতে ভেজাল মেশানো হচ্ছে এটি মনিটরিং করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃৃপক্ষ রয়েছে। তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে এসব অপকর্ম দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকত না সমাজে। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, একটি অসাধু চক্র গড়ে উঠেছে মানহীন ও ভেজাল পণ্য বেশি দামে বিক্রি করে মুনাফা লোটার জন্য। কথায় বলে কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ। অসাধু ব্যবসায়ী এবং তাদের লালন-পালনকারীদের পৌষ মাস বছরভরই। অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তা তথা আমাদের সর্বনাশা দশার ইতি ঘটছে না। শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতকেই বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হলো। অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালো ভাষায় উচ্চ আদালত বলেছে যে, খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। দেশবাসী আশাবাদী সরকার উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে এবার সত্যি সত্যি যুদ্ধ ঘোষণা করবে। যেমন মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর গত এক বছরে সমাজে মাদক ব্যবসা অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। তরুণ প্রজন্মকে বাঁচানোর একটা আশা দেখা যাচ্ছে। এভাবে ভেজালের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হলে পুরো জাতির খাদ্য নিরাপত্তার আওতায় আসার পরিস্থিতি তৈরি হবে, রোগব্যাধি হ্রাস পাবে। মানুষের প্রত্যাশা, ভেজালের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামান্যতম ছাড় নয়। তবে এর পরের ধাপেই দেশে আমদানিকৃত বিভিন্ন মানহীন খাদ্যসামগ্রী শনাক্ত হওয়া প্রয়োজন। সে ব্যাপারেও যথোচিত ব্যবস্থা নেয়া চাই।