১৪ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চোরদের আড্ডাখানা থেকে সিনেমার শহর!

  • সারতাজ আলীম

ফ্রান্সের দক্ষিণ উপকূলঘেঁষা শহরটা চোরদের জন্য বেশ পরিচিত ছিল। ১৮১৫ সালে এলবা থেকে পালিয়ে আসার সময় এখানে বিশ্রাম নিয়েছিলেন সম্রাট নেপোলিয়ন। উপকূল হওয়ায় বাণিজ্যে খ্যাতিও ছিল বেশ। ১৯৩৯ সালে ফ্রান্স সরকার ইতালির ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবকে টেক্কা দেবার কথা ভাবল। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব নাম হলেও ইতালির উৎসবটা আবার হতো হিটলার এবং তার বন্ধু মুসোলিনির ইচ্ছামতো। মূলত ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রীর প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের সহায়তায় ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে ফ্রান্সের কান শহরে বসে চলচ্চিত্রের প্রথম পূর্ণ আসর। ব্যস! চোরদের আড্ডার বদলে চলচিত্রের শহর হিসেবে পরিচিত শুরু করে কান।

এক নজরে ৭২তম আসর

১৪ মে বসেছে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় সিনেমা ফেস্টিভাল কানের ৭২তম আসর। কানের পোস্টারে ফুটিয়ে তোলা সদ্য প্রয়াত ফরাসী চলচ্চিত্রনির্মাতা আনিয়েস ভার্দার একটি ছবিকে। ১৯৫৫ সালে তার নির্মিত লা পোয়াঁত কুঁত শুটিংয়ের সময় ছবিটি তোলা হয়েছিল। ছবিটি যেন গোটা সিনেমা জগতের আবেগ, আত্মবিশ্বাসের আর সৃজনশীলতার প্রতিনিধি!

পরিচালক, প্রযোজক, নির্মাতা, অভিনয় শিল্পী, স্ক্রিপ্ট রাইটার, সংবাদকর্মীতে ভরে উঠেছে কান। কানের ৩০০০ হোটেলের প্রায় সবকটিই এখন কানায় কানায় পূর্ণ। এবারের উৎসব শুরু হবে জিম জারমাশের চলচ্চিত্র জম্বি কমেডি ‘দ্য ডেড ডোন্ট ডাই’ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে। বিভিন্ন বিভাগে অংশ নেয়া চলচ্চিত্রগুলো থেকে সেরাদের সেরাকে বাছাই করার জন্য আছেন ৯ সদস্যের জুরি বোর্ড। ‘বার্ডম্যান’ খ্যাত মেক্সিকান নির্মাতা আলেহান্দ্রো গনসালেস ইনাররিতুর থাকবেন জুরি বোর্ডের সভাপতিত্বে। ২১ বছর বয়সী ইলি ফ্যানিং কানের জুরি হয়ে নতুন এক রেকর্ড গড়েছেন। অন্যান্য জুরিরা হলেন- সেনেগালিজ কমেডিয়ান মাইমুনা এন দি আয়ে, ফরাসী নির্মাতা এনকি বিলাল, মার্কিন স্বাধীন নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা কেলি রাইশার্ড, ইতালিয়ান নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার এলিস রোহরওয়াশার, গ্রিক নির্মাতা ইয়োরগোস লানথিমোস, রবিন কামপিপ্লো এবং পোলিশ নির্মাতা পাউয়েল পাভলিকোভস্কি। ১৯টি ছবির মধ্যে থেকে নির্বাচন করা হবে স্বর্ণ পাম। এর মধ্যে নির্মাতা নারী ৪ জন। আটলান্টিক ছবি দিয়ে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী নির্মাতা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন মাটি ডিওপ। ‘আউট অব কম্পিটিশন’এ আছে ৫টি সিনেমা। আরেক বিভাগ আঁ সারতে রিগার বিভাগের জন্য নির্বাচিত হয়েছে ১৬টি ছবি। এবং আরও ৬টি সিনেমার আছে স্পেশাল স্ক্রিনিং বিভাগের জন্য।

সম্মানসূচক স্বর্ণ পাম

যে পুরস্কার অর্জনের সাধনায় থাকেন সারা বিশ্বের তারকারা সেই পুরস্কার নিতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন ফরাসী অভিনেতা আলা দ্যুলো। রূপালি পর্দায় দুর্দান্ত সব কাজ করার জন্য তাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হচ্ছে। বারবারই পুরস্কার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেও পরে তাকে রাজি করানো গেছে এবং শেষ পর্যন্ত তিনিই পাচ্ছেন এই পুরস্কার।

মাস্টার অব সিরিমনিস

অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এই আয়োজনের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানের উপস্থাপককে বলা হয় ‘মাস্টার অব সিরিমনিস’। এবার সেই দায়িত্ব পেয়েছেন ফরাসী অভিনেতা এদুয়ার্দ বেয়া। এর পূর্বে কানে সঞ্চালনের অভিজ্ঞতা আছে এই কথার জাদুকরের।

নেটফ্লিক্স বিতর্ক

সিনেমাবোদ্ধাদের একটা বড় অংশই মর্যাদাপূর্ণ সব আসরে নেটফ্লিক্সের ছবি দেখতে চান না। মূল প্রতিযোগিতার বাইরের ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে স্থান পেয়েছে নেটফ্লিক্স ছবি উন্ডস। গত দুই বছর ধরে কানে অংশ নিতে পারে না অনলাইন স্ট্রিমিংভিত্তিক কোন ছবি। এবার আবারও সেই পুরনো আগুনে ঘি ঢালছে এই উৎসব। নেটফ্লিক্স ভক্তদের প্রশ্ন ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে অংশ নিতে পারলে কেন মূল প্রতিযোগিতায় নয়? একদিকে নেটফ্লিক্স যখন বড় আসরে তাদের ছবি অন্তর্ভুক্ত করতে যুদ্ধ করে যাচ্ছে তখন অন্যদিকে তখন নেটফ্লিক্সের সিনেমাকে পরিপূর্ণ ‘সিনেমা’ বলতেই নারাজ অনেকেই।

কানে র‌্যাম্বো!

কানের প্যালে ডি ফেস্টিভালে হবে ‘র‌্যাম্বো ভি- লাস্ট ব্লাড’ এর বিশেষ প্রদর্শনী। ‘র‌্যাম্বো’ খ্যাত হলিউড তারকা সিলভেস্টার স্ট্যালোন হাজির থাকছেন নিজের সিনেমার প্রচারণার জন্য।

এছাড়াও লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও এবং ব্র্যাড পিটও এবার লাল গালিচায় হাঁটবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

মার্শে দ্যু ফিল্মের ৬০ বছর

কানে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো শীর্ষস্থানীয় চলচ্চিত্র বাজার মার্শে দ্যু ফিল্ম এবার ৬০ বছরে পা দিচ্ছে। ১৯৫৯ সালে স্বল্প পরিসরে চালু হয় এই বাজার। স্বল্প বা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্রের স্বত্ব কেনাবেচার অপরিহার্য স্থান এটি। প্রতি বছর এই জায়গাটি প্রযোজক, পরিচালকের ভিড়ে মুখরিত হয়ে থাকে। এখানে ৩০টির বেশি স্ক্রিনিং রুম আছে যার যে কোন একটি ভাড়া নিয়ে প্রযোজক-পরিচালকরা তাদের সিনেমা প্রদর্শন করাতে পারেন। বিশ্বের নানান প্রান্ত থেকে আসা চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীদের পছন্দ হলে সেই সিনেমার স্বত্ব¡ কিনে নেন।

কানের চোরদের দাপট কিন্তু এখনও আছে। ২০১৫ সালেও কানে ১৭.৫ মিলিয়ন ইউরোর স্বর্ণ চুরি হয়। তবে সেই চোরদের ছাপিয়ে কান হয়ে উঠেছে চলচ্চিত্রের স্বর্গনগরী।