২৩ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমাজ ভাবনা -বিষয় ॥ বিশুদ্ধ পানীয় জল

  • দূষিত পানীয় জল বিপজ্জনক- এমন পানি পানের ফলে জটিল পানিবাহিত রোগের শিকার হয় মানুষ। অপরদিকে বিশুদ্ধ পানীয় জল পাওয়াও দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। শহরাঞ্চলে সরবরাহকৃত পানি পানের উপযুক্ত নয়। চাহিদা মেটাতে গিয়ে অনেকেই উপেক্ষা করে যাচ্ছেন পানির বিশুদ্ধতার বিষয়টি। ফলে ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। -এ সবই উঠে এসেছে পাঠকদের লেখায়

সঙ্কট নিরসনে পদক্ষেপ

জসীম উদ্দীন ॥ খুলনা জেলার দক্ষিণে অবস্থিত, সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা কয়রা উপজেলার মানুষ আমরা। দুর্যোগের আঘাত সহ্য করতে করতে আমরা ক্লান্ত। এক দুর্যোগের ক্ষত না শুকাতেই আরেকটা এসে আঘাত হানে। অন্যভাবে বলা গেলে আমরা অবহেলিত বটে। বর্তমান প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত এই উপজেলার প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছি না। এ অঞ্চলের খাবার পানির উৎস প্রধানত পুকুর, বৃষ্টির পানি ও নলকূপ। উপকূলের উপজেলা হওয়ায় অনেক সময় গভীর নলকূপ খনন করেও লোনা পানি ওঠে। তাই বাধ্য হয়ে আমাদের পুকুরের পানিই পান করতে হয়। তবে ২০০৯ সালের প্রলয়ঙ্করী আইলার তোড়ে এই উৎসগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। যা এখনও সম্পূর্ণ রূপে সংস্কার করা হয়নি। কয়রা সদর, উত্তর বেদকাশী, মহেসসশ্বরীপুর, দাকোপ, কালাবাগি, মহারাজপুর ইউনিয়নের প্রায় সব গ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার পানির সমস্যা চরমে পৌঁছেছে। খেটে খাওয়া এ অঞ্চলের মানুষের দিন শেষে পানির জন্য ৬-১০ কিলোমিটার পথ হেঁটে পুকুর বা নলকূপের পানি সংগ্রহ করতে হয়। কখনও কখনও যে পুকুরে গোসল করি সে পুকুর থেকেই পানি পান করতে হয় আমাদের। স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দৈনন্দিন রোগীর ৫০%-৬০% চর্মরোগে এবং ৩০%-৩৫% আমাশয়ে আক্রান্ত যা এ অনিরাপদ পানি পানেরই ফল।

এ সঙ্কট দূর করার জন্য অনেক পদক্ষেপ নেয়া হলেও এখন প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল। উদাহরণ হিসেবে ২১৮টি বালুর ফিল্টারের মাত্র ২০টি চালু আছে। সর্বাগ্রে আইলায় ধ্বংস প্রাপ্ত পুকুরগুলো সংস্কার করা প্রয়োজন। বর্ষাকালের পানি সংগ্রহের জন্য যথেষ্ট ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম (পানি সংরক্ষণের ট্যাঙ্ক) চালু করতে হবে। অকেজো হয়ে পড়ে থাকা বালুর ফিল্টারগুলো মেরামত করাও এখন সময়ের দাবি। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সরকারী-বেসরকারী বা বিভিন্ন এনজিও সংস্থাগুলো যে উদ্যোগ নেয় তার সঠিক বাস্তবায়ন এবং সার্বক্ষণিক তদারকি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ সঙ্কট নিরসনে অতি দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে উপকূলের বিশাল জনসম্পদ রক্ষা করবে এটাই কাম্য।

কয়রা, খুলনা থেকে

.

চাই বিশুদ্ধ পানীয় জল...

মরিয়ম আক্তার ॥ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমরা পরিবেশের অনুগ্রহে লালিত পালিত হতে থাকি। আমরা পরিবেশেরই সন্তান। জীবন ও পরিবেশ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পরিবেশের প্রত্যেকটি উপাদান আমাদের প্রাণ। যার মধ্যে আমাদের প্রত্যেকটি কর্মকান্ডের মাঝে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে পানি। পানির অপর নাম জীবন। মানবসভ্যতার শুরুতে পানিতে ছিল অজ¯্র সতেজতা, বিশুদ্ধতা ও পুষ্টি।

ধীরে ধীরে উন্নতি ঘটছে মানবসভ্যতার, আর তার সঙ্গে সঙ্গে যেন বিশুদ্ধ পানীয় জল হারিয়ে ফেলছে তার সতেজতা ও বিশুদ্ধতা। যার কারণে মানুষের পক্ষে গ্রহণের অযোগ্য হয়ে পড়ছে পানি। দূষিত পানি মানবজাতিকে ঠেলে দিচ্ছে হুমকির মুখে। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে কঠিন পানিবাহিত রোগে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুসারে প্রত্যেক বছর পৃথিবীতে প্রায় দশ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই পানিবাহিত রোগ। পানি দূষণের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে।

পানিবাহিত রোগের মধ্যে রয়েছে- আমাশয়, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, প্যারা টাইফয়েড ইত্যাদি। দূষিত পানি পান করে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এসব কঠিন পানিবাহিত রোগে। বিশেষ করে পানি দূষণের মাত্রা লক্ষ্য করা যায় শহরে। শহরের সকল ময়লা-আবর্জনা ড্রেনের মাধ্যমে পতিত হচ্ছে নদী-নালায়; কলকারখানার দূষিত বর্জ্য ইত্যাদি পানি দূষণের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া উন্নত দেশগুলোতে প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ নদীতে ফেলা হচ্ছে। পানি দূষণের কারণে প্রতিবছর বিষাক্ত এসিড বৃষ্টি হচ্ছে।

প্রচুর পরিমাণে অম্লযুক্ত বৃষ্টি হওয়ার কারণে ফসলের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। দূষিত পানি যে শুধু পান করার ফলে মানবদেহে সম্বলিত হয় তা নয়। দূষিত পানি দিয়ে রান্নাও করা হয়। যার কারণেও মানবদেহে দূষিত পানি সঞ্চালিত হয়ে জন্ম নিচ্ছে নানা ধরনের পানিবাহিত রোগ। অন্যদিকে বর্তমান গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বাড়ছে। অসহনীয় গরমে পুরো প্রাণীকূল তৃষ্ণার্ত। সবাই চাইছে পানির সন্ধান। তীব্র গরমে যেন প্রাণ বাঁচানোর একমাত্র উৎস হয়ে পড়ছে পানি। পানি দূষিত না বিশুদ্ধ তা বিবেচনা না করেই প্রাণ বাঁচানোর জন্য পান করছে দূষিত পানি। যার কারণে মানবজীবনে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দিন দিন বেড়েই চলছে। পানি মানবজীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সুস্থ জীবন-যাপনের জন্য অপরিহার্য বিশুদ্ধ পানি। কিন্তু বর্তমানে পানি আজ দূষিত হয়ে এমন এক পর্যায় চলে গেছে যে, পানির অপর নাম জীবন নয় বরং জীবনের অপর নাম পানি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই হুমকি থেকে পরিবেশকে রক্ষা করতে হবে।

পানি দূষণ থেকে মুক্তি পেতে হলে শুধু পানি নয়, পরিবেশের সকল উপাদানের প্রতি সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একটি উপাদান দূষিত হলেই অপরটির দূষণ স্বাভাবিক। যদি মানবজাতি একটু সচেতন হয় তবে পরিবেশের সকল উপাদানের দূষণ সম্পূর্ণ রোধ করা না গেলেও কিছুটা হলেও এড়ানো সম্ভব।

কড়ৈতলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে

.

সচেতনতা জরুরী

জাহিদুল ইসলাম ॥ পানি যদি হয় মরণের ফাঁদ তাহলে। ইহ জগত ছেড়ে যেতে হবে পরকালে! মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বিশুদ্ধ পানির কোন বিকল্প নেই। বিশুদ্ধ পানির অভাবে বিভিন্ন হাসপাতালে দেখা যায় পানিবাহিত রোগের রোগীরা ভুগছে। বিশুদ্ধ পানির অভাবে দিন দিন সমাজে বেড়ে যাচ্ছে পানিবাহিত রোগ। আর্সেনিক, ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুযুক্ত পানি পান করায় দেশের অনেক জেলার মানুষকে- টাইফয়েড, ডায়রিয়া, কলেরা, জন্ডিসসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হতে হচ্ছে। সবই আমাদের জনসচেতনতার অভাব। প্রতিবছর টিউবওয়েলগুলোর পানি আর্সেনিকমুক্ত কি-না তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আমরা প্রত্যেকেই বিশুদ্ধ পানির আশা করি, কিন্তু কোন কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করি না। আমাদের প্রত্যেককে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। তাহলে সমাজে পানিবাহিত রোগের প্রভাব অনেকটা কমে আসবে। মানুষ একটু চেষ্টা করলেই বিশুদ্ধ পানি পেতে পারে। সকলকে পানি ব্যবহারে ভাল ও ক্ষতিকর বিষয়টি সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে হবে। যতদিন পানি ব্যবহারে ভাল-মন্দের বিষয়টি মানুষের মাথায় না আসবে ততদিন জীবাণু পানির ব্যবহার সমাজ থেকে চিরতরে দূরীভূত হবে না। এ বছর গ্রীষ্মের তাপমাত্রা এতটাই প্রচন্ড যে, আমরা তাপদাহ থেকে একটু স্বস্তি পেতে যখন যে পানি হাতের নাগালে পাচ্ছি সেই পানিই পান করছি। কিন্তু কখনও ভেবে দেখছি না- আসলে আমরা কি পানি খাচ্ছি! ফলে আমাদের শরীরে সংক্রমিত হচ্ছে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ। কিন্তু আমাদের একটু সচেতনতা কি পারত না এই সকল রোগ থেকে রক্ষা করতে? ঠিকই পারত। কিন্তু আমরা যেটা করার সেটা করি না। আমরা যারা ঢাকায় বসবাস করি তাদের পানি পান সম্পর্কে বেশি সচেতন হতে হবে। কারণ ওয়াসা থেকে যে পানি পাইপের মাধ্যমে বাসা-বাড়িতে সরবরাহ করা হয় তা বেশিরভাগই ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুযুক্ত পানি। পাইপে লিকেজ থাকার কারণে এবং দীর্ঘদিন একই পাইপ ব্যবহারের ফলে পাইপের ভেতরে ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু সৃষ্টি হয়। এই ব্যাকটেরিয়া বা জীবানুযুক্ত পানি পান করলে শরীরে বিভিন্ন রোগ হওয়ার আশঙ্কা অধিক থাকে। আমরা বিভিন্ন উপায়ে পানি বিশুদ্ধ করতে পারি। যেমন- ফিল্টারিং করার মাধ্যমে পানি বিশুদ্ধ করতে পারি, পানি পর্যাপ্ত পরিমাণ ফুটিয়ে ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণুমুক্ত করতে পারি, যাদের পানি ফিল্টারিং বা ফুটানোর ব্যবস্থা না থাকে তারা ক্লোরিন ট্যাবলেট, ফিটকিরি বা পটাশ পানিতে মিশিয়েও পানি বিশুদ্ধ করতে পারি।

রামপুরা, ঢাকা থেকে

.

বিশুদ্ধকরণ ও সংরক্ষণ

নুরুল আমিন ॥ মাঝে মাঝে দেশে বিশুদ্ধ পানির খুব অভাব দেখা দেয়। শহর থেকে শুরু“করে গ্রামাঞ্চলেও বিশুদ্ধ পানি সুলভে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে গ্রীষ্ম মৌসুমে বিশুদ্ধ পানির অভাব প্রকট হয়ে ওঠে। তাছাড়া অন্যান্য সময়েও পানি দূষিত হয়। দূষিত পানি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এতে পানিবাহিত নানা রোগব্যাধি ছড়ায়। দূষিত পানি পান করে মানুষ জটিল পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। অনেক সময় এ রোগ মহামারী আকার ধারণ করে। অনেক লোক মারা যায়। তাই জীবন বাঁচাতে এবং সুস্থ সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ একান্ত প্রয়োজন। বিশুদ্ধ পানি পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। ময়লা-আবর্জনা, পশু-পাখির মৃত দেহ, কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ, কাদা-বালি, সার-ওষুধ ইত্যাদি মিশে পানি দূষিত হয়। এছাড়া বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক কারণে পানি দূষিত হয়। দূষিত পানি ব্যবহার জীবনের জন্য হুমকি।

যত বেশি গরম পড়ে, পানির চাহিদা ততই বাড়ে। নদী বা ভূগর্ভস্থ পানি আহরণ করে পরিশোধনের মাধ্যমে পানের উপযোগী করে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে সেই পানি দূষিত হয়ে যায়। কারণ যে পাইপলাইন দিয়ে ওয়াসা পানি সরবরাহ করে সেই পাইপ লিকেজ কিংবা পুরনো হওয়ার কারণে পানি দূষিত হয়। আবার পানি শোধনে ত্রুটি থাকে। এ জন্য ওয়াসা কর্তৃপক্ষের অবহেলা, দায়িত্বে ফাঁকি ও আন্তরিকতার অভাব বিশেষভাবে দায়ী। অন্যদিকে পানির ট্যাঙ্কগুলো পরিষ্কার থাকে না। এসব কারণে নিরাপদ পানি পাওয়া মুশকিল। বাজারে বোতল ভর্তি পানি কিনতে পাওয়া যায়। কিন্তু সেসব পানিও শতভাগ নিরাপদ নয়। অধিক মুনাফা লাভের আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সাপ্লাই বা টিউবওয়েলের পানি বোতলে ভরে বাজারজাত করে। বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানির অভাবে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে।

পানিতে ক্ষতিকারক জীবাণু তথা ব্যাক্টেরিয়া থাকে। প্রত্যেকের উচিত পানি বিশুদ্ধ করার পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা রাখা। পানি বিশুদ্ধ করার উপায়গুলো হচ্ছে- পানি ৬০ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা এর অধিক তাপমাত্রায় ফুটালে জীবাণু ধ্বংস হয়। তারপর পানি ব্যবহার বা পান করার জন্য ছেঁকে পরিষ্কার করে নিতে হবে। সিরামিক বা অসমোসিস ফিল্টার মেশিনে সহজে পানি বিশুদ্ধ করা যায়। পানি বিশুদ্ধকরণ ক্লোরিন ট্যাবলেট বা ব্লিচিং ব্যবহার করে পরিশোধন করা যায়। পানিতে পটাশ বা ফিটকিরি মিশিয়ে শোধন করা যায়। সৌর পদ্ধতিতে পানি জীবাণুমুক্ত করতে কয়েক ঘণ্টা কড়া সূর্যের তাপে রাখলে তা বিশুদ্ধ হয়। পানিতে আয়োডিন মিশিয়ে বিশুদ্ধ করা যায়। পানি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের পাত্রের পরিবর্তে কাঁচ অথবা স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা উত্তম। শোধন করা বিশুদ্ধ পানি বেশি দিন রাখা উচিত নয়। এতে পুনরায় জীবাণু সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। পানি রাখার পাত্র অবশ্যই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। গভীর নলকূপ থেকে নিরাপদ পানি পাওয়া যায়। তবে বালি ওঠে কিনা অথবা পানিতে আর্সেনিক আছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পানি বিশুদ্ধকরণ সম্পর্কে প্রত্যেকে সচেতন হলে ঝুঁকিমুক্ত হওয়া সম্ভব। নিজেরা সতর্ক হয়ে একটু কষ্ট ও খেয়াল করে দূষিত পানিকে বিশুদ্ধ করে নিলে পানিবাহিত রোগবালাই থেকে মুক্ত হওয়া যায়। সরকারী ও বেসরকারী মানব সেবামূলক সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পানি বিশুদ্ধকরণ বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা চালালে অনেক সুফল হবে। সকল ত্রুটি বিচ্যুতি, কর্মে ফাঁকি, অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার অবসান ঘটিয়ে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ যাতে নিরাপদ পানি সরবরাহ করে সেই বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি একান্ত প্রয়োজন।

লালমোহন, ভোলা থেকে

.

সঙ্কট ও দুর্ভোগ

আরিফ হোসাইন হিয়া ॥পৃথিবীর তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থল মানেই কি পৃথিবীতে পানীয় জলের অভাব নেই? বরং উল্টোটাই সত্যি! সারা পৃথিবী জুড়ে আজ নিরাপদ পানীয় জলের হাহাকার! কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে জানতে হবে জলের মতই সহজ কিছু বিষয় সম্পর্কে, যা প্রতিদিন আমরা শুনে থাকি, কিন্তু সঠিক ধারণা আমাদের নেই। আমরা অনেকই ধারণা করে থাকি যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলে বিশুদ্ধ পানির জন্যই হবে। এই কথার মাধ্যমে বোঝা যায় যে গোটা বিশ্ব কি পরিমাণে পানীয় জলের সঙ্কটে পড়েছে। কেননা এটাও জানি যে জল পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। সৌরজগতে পৃথিবীর মতো কোথাও বোধহয় জল নেই। নেই প্রাণ টিকে থাকার মতো বাতাসও। তাই জলই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। আমাদের বেঁচে থাকাতে কি না কাজে লাগে জল। জল পান না করলে আমরা বেঁচে থাকতেই পারতাম না। এছাড়াও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার জন্য জল না হলেই নয়। জল ছাড়া শিল্পের কাজও ভাবাই যায় না। বিপদ আপদ, দুর্ঘটনায়ও জলকে মনে করা হয় খুব প্রয়োজনীয় সম্পদ। এসব কিছু বিবেচনা করে বলা যায়, জল আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য প্রাকৃতিক সম্পদ। শুধু জল থাকলেই হবে না, পরিষ্কার পানীয় জল যদি না থাকতো তাহলে জলবাহিত রোগ যেমন, পাতলা পায়খানা, কলেরা, টাইফয়েড ইত্যাদি রোগে বোধহয় পৃথিবী থেকে মানুষের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে যেত।

ছোটবেলা থেকেই তো আমরা জানি পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর একভাগ স্থল। তার মানে কিন্তু এই নয় যে সারা পৃথিবীতে পানীয় জলের বিপুল সম্ভার বরং উল্টোটাই সত্যি, পৃথিবীতে পাওয়া যায় যে জল তার অধিকাংশই পানের উপযুক্ত নয়। আমাদের পানীয় জলের উৎসগুলো মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় ক) বৃষ্টির জল, খ) পৃথিবীর উপরি তলের জল, গ) মাটির নিচের জল। বৃষ্টির জল হলো পৃথিবীতে পাওয়া বিশুদ্ধতম জল। তবে বায়ুদূষণ আজকাল প্রায় সারা পৃথিবী জুড়ে। তাই বৃষ্টির জলও আজ অনেকটাই দূষিত। প্রথম বৃষ্টির জল যখন দূষিত বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে নামে তা বাতাসের দূষিত পদার্থ, রোগ-জীবাণু ধুলোবালি নিয়ে দূষিত হয়ে যায়। এছাড়াও অন্যান্য কারণ যেমন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবহাওয়ার পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাওয়া, সেচকার্যে স্যালোমেশিনের মাধ্যমে অতিমাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, নদ-নদী, পাহাড়ি ঝরনা, ঝোরাগুলোর নাব্যতা হারানো এবং প্রাকৃতিক জলাশয় ক্রমাগত ভরাট হওয়ার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এমন অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে দিনদিন বিশুদ্ধ জলের সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। বর্তমানে শহর এলাকায় সরবরাহকৃত পানীয় জল দূষিত চিহ্নিত হচ্ছে। আবার গ্রাম এলাকা ও আর আগের মতো বিশুদ্ধ পানি সুলভ নয়। আবার সম্প্রতি গ্রীষ্মের দাবাদহ বেড়েই চলছে ফলে বিশুদ্ধ পানির চাহিদাও বাড়ছে। বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট কেমন হতে পারে তার উদাহরণস্বরূপ সিনেমার কথা বলতে পারি। যেখানে বিশুদ্ধ পানির জন্য কত সংগ্রাম করতে হয় এবং কত হাহাকার করতে হয় সেটা না দেখলে বোঝানো যাবে না। আবার বাড়িতে বিশুদ্ধ পানি পান করার জন্য ফিলটার ব্যবহার করতে হয়। যাতে বিশুদ্ধ পানি পান করা নিশ্চিত করতে পারে। আর এই চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে বিশুদ্ধতার বিষয়টি সামনে চলে আসছে। ফলে ঝুঁকির মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন পানি পান করার জন্য বিভিন্ন ধরনের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। আমাদের সকলের উচিত হবে পানির সুষ্ঠু ব্যবহার করা। তাছাড়া জীবনের প্রতি ঝুঁকি বেড়েই চলবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে

.

দূষণ চলমান

সাধন সরকার ॥পৃথিবীতে উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের জীবন ধারণের জন্য যে কয়টি জিনিস (পানি, বায়ুসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান) ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব নয় তার মধ্যে অন্যতম পানি ও বায়ু মহান সৃষ্টিকর্তা বিনামূল্যে দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় মানবসৃষ্ট কর্মকা-েই পানি ও বায়ু দূষিত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। বিশ^ব্যাপী পানি নিয়ে ব্যবসা চলছে! নিরাপদ পানি আজ বহুজাতিক কোম্পানির বোতলে বোতলে বন্দী! সারা পৃথিবীতে পানির ভিত্তি ও উৎসগুলো ধ্বংস ও দূষিত করা হচ্ছে।

আয়তনের দিক দিয়ে বিশে^র ছোট দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা বিরাট চ্যালেঞ্জ বটে! পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো দিনে দিনে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। নদ-নদীগুলো ব্যাপক মাত্রায় দূষিত হয়ে পড়েছে। খাল-বিল-জলাশয়গুলো দিনে দিনে ভরাট করা হয়েছে। ফলে শহরবাসীর পানির চাহিদা মেটানোর জন্য ব্যাপক চাপ পড়েছে ভূগর্ভস্থ উৎসের প্রতি। এখন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর থেকেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পানির স্তর অনেক নিচে চলে গেছে। রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে প্রতিবছর পানির স্তর একটু একটু করে নিচে চলে যাচ্ছে। তথ্য মতে, ঢাকা শহরে পানির স্তর প্রতি বছর ৪ থেকে ৫ ফুট নিচে চলে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের অবস্থা আরও ভয়াবহ। ঢাকা শহরে পানির চাহিদার শতকরা ৭৬ ভাগ আসে ভূগর্ভস্থ পানির উৎস থেকে আর বাকি ২৪ ভাগ আসে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস থেকে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এমন একটা সময় আসবে যে সময় পানির স্তর কমতে কমতে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে পানি পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। তাই জোর দিতে হবে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎসগুলোর প্রতি। কিন্তু পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, নদ-নদীর দূষণ মাত্রা ব্যাপক আকার ধারণ করার ফলে পানি পরিশোধন করাও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি বিশ্ব ব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ অপরিচ্ছন্ন এবং অনিরাপদ উৎসের পানি পান করছে! এছাড়া দেশের পানীয় জলের নিরাপদ উৎসগুলোতে ব্যাকটেরিয়া ও আর্সেনিকের ভয়ঙ্কর মাত্রায় উপস্থিতি রয়েছে।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের লাখ লাখ মানুষের নিরাপদ পানি প্রাপ্তি রীতিমতো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন! পানের উপযোগী এক ফোঁটা পানির জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় হাহাকার চলছে! চারদিকে পানি আর পানি। কিন্তু সবটাই লবণ পানি! যাহোক, পানির উপরি ভাগের উৎস নিরাপদ রাখা ছাড়া এখন আর বিকল্প পথ খোলা নেই। তাই দেশের প্রকৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি নদ-নদী, খাল-বিলসহ সব ধরনের জলাশয় দখল-দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। ভরাট হয়ে যাওয়া নদী-খালগুলো পুনর্খনন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণে শহরগুলোর প্রতিটি ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সবার জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে না পারলে প্রতিটি শিশুর উন্নত ভবিষ্যত এবং দেশের উন্নতি বাধাগ্রস্ত হবে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা থেকে

.

প্রশ্নবিদ্ধ ওয়াসার পানি

লিজা জাহান ॥ দিন দিন বেড়েই চলেছে রাজধানী ঢাকার নাগরিক সমস্যা। রাজধানীর জীবনযাত্রার বিশেষ মান নিশ্চিত করা তো দূরের কথা বেঁচে থাকাটাই এখন রোজকার লড়াই হয়ে গেছে রাজধানীবাসীর। সমাধানহীন সমস্যার পাহাড় জমতে জমতে এখন নাগরিক জীবনে চরম দুর্যোগের সৃষ্টি হয়েছে, চলছে বিপর্যস্ত জীবন যাত্রা। ঢাকার প্রতিদিনের সমস্যার মধ্যে অন্যতম একটি সমস্যা হলো বিশুদ্ধ পানির সমস্যা। প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের এই শহরে বিশুদ্ধ পানি পাওয়াটা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ওয়াসার পানি উৎপাদনে ঘাটতি নেই। তবুও পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। আর যেসব এলাকায় পানির সঙ্কট নেই, সেখানকার পানিও ময়লা-দুর্গন্ধের কারণে খাবারের অযোগ্য। বিশুদ্ধ পানির সমস্যা এখন শুধু শহরেই নয় গ্রামাঞ্চলেও দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট। বিশুদ্ধ পানির প্রধান উৎস নলকূপের পানিতে ধরা পড়েছে বিষাক্ত আর্সেনিকের উপস্থিতি। দেশের ৬১ জেলায়ই নলকূপের পানিতে রয়েছে আর্সেনিক। আর্সেনিক আক্রান্ত পানি ব্যবহার করলে মানবদেহে মারাত্মক রোগের জন্ম হতে পারে। এছাড়া, প্রতি শুষ্ক মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক দুঃসংবাদ হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া। ফলে দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলে নলকূপে পানি উঠছে না। তাই বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট তীব্র হচ্ছে দিন দিন। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নলকূপে পানি ওঠে না। তাই গ্রামাঞ্চলেও আর আগের মতো বিশুদ্ধ পানি সুলভ নয়। দূষিত পানি পানের ফলে অনেকেই জটিল পানিবাহিত রোগের শিকার হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে প্রতিনিয়ত; বিশেষ করে শিশুরা বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এ দেশে হতদরিদ্র মানুষগুলোই এসব পানিবাহিত রোগে বেশি আক্রান্ত হন। বিশেষ করে তারাই যাদের কাছে নিরাপদ পানি সহজলভ্য নয়, পানি ফুটিয়ে খাওয়ার সুযোগ বা সামর্থ্য নেই, খাবারের ব্যাপারেও বাছ-বিচার করার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তোলে। রোগের প্রতিরোধ ও নিরাময় বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের জ্ঞান না থাকলে রোগীর প্রাণনাশের শঙ্কা তৈরি হতে পারে। কাজেই ডায়রিয়া প্রতিরোধে অন্তত দরিদ্র-পল্লী ও বস্তিতে নিরাপদ খাবার পানির সংস্থান করা খুবই জরুরী। ডায়রিয়া প্রতিরোধের উপায় ও করণীয় সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করতে হবে। সরকারীভাবে এ ব্যাপারে প্রচারণামূলক কর্মসূচী নিতে হবে। সচেতন থাকতে হবে গ্রাম-শহর সবখানে সবাইকেই।

মিঠাপুকুর, রংপুর থেকে