২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চকে ফের কেমিক্যাল গুদাম ॥ ট্র্যাজেডির তিন মাসেই সব স্বাভাবিক!

  • চুড়িহাট্টায় ২৫
  • ৩০ গজের মধ্যেই গড়ে উঠেছে রাসায়নিকের গোডাউন;###;স্থানীয়রা বলছেন শুধু চকেই আছে অন্তত চার শ’

গাফফার খান চৌধুরী ॥ ভয়াবহ চকবাজার ট্র্যাজেডির পরেও চুড়িহাট্টাসহ আশপাশ থেকে কেমিক্যালের গুদাম পুরোপুরি সরেনি। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে! উপরন্তু চকবাজার ট্র্যাজেডিতে কেমিক্যালের আগুনে ৭১ জনের মৃত্যুর পর ওই এলাকার বাসা বাড়ি থেকে কেমিক্যালের গুদাম সরানোর অভিযান থেমে গেছে। অভিযানের সময় সরে যাওয়া কেমিক্যালের গুদামগুলো আবার চকে ফিরে এসেছে। তারা আবার আগের মতোই বিভিন্ন বাসাবাড়ি ভাড়া নিয়ে কেমিক্যাল মজুদ করে ব্যবসা চালাচ্ছেন। চকবাজার, উর্দু রোডসহ আশপাশের প্রায় নব্বই ভাগ বাড়িতেই রয়েছে কেমিক্যালের গুদাম। যদিও এসব কেমিক্যালের মধ্যে প্লাস্টিক দানার গুদামের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা প্লাস্টিক দানাকে কেমিক্যাল বা রাসায়নিক পদার্থ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অথচ প্লাস্টিক দানাকে কোনভাবেই কেমিক্যাল বা রাসায়নিক পদার্থ মানতে নারাজ ব্যবসায়ীরা। ফলে সব নির্দেশনা উপেক্ষা করেই বহুল আলোচিত ওয়াহেদ ম্যানশনের মাত্র ২৫ থেকে ৩০ গজের মধ্যেও গড়ে উঠেছে কেমিক্যালের গুদাম। সবমিলিয়ে চকবাজারেই অন্তত চার শ’ কেমিক্যালের গুদাম আছে বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ী সমিতি।

বুধবার বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে সরেজমিনে চকের চুড়িহাট্টায় গিয়ে চোখ রীতিমতো চড়কগাছ। চারদিকে চলছে ডাক-চিৎকার। ব্যবসায়ীরা জোরে জোরে বলছেন, আসুন ভাই, ভাল কেমিক্যাল আছে। ব্যস্ত চুড়িহাট্টার চৌরাস্তায় দেখা গেল অন্তত দশটি ঠেলা গাড়িতে বস্তা বস্তা কেমিক্যাল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হাজার হাজার বস্তা কেমিক্যাল কেনাকাটা হচ্ছে দেদার।

সার্বিক পরিস্থিতি দেখে বোঝার উপায় নেই এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টায় ঠিক এই চৌরাস্তায় কেমিক্যাল থেকে লাগা আগুনে প্লাস্টিকের দানা গলে পা আটকে গিয়ে ঘটনাস্থলেই ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। পরে হাসপাতালে মারা যান আরও ৪ । সবমিলিয়ে কেমিক্যালের আগুন কেড়ে নেয় ৭১ তাজা প্রাণ।

সেই ওয়াহেদ ম্যানশন এখনও কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে। শুধু ভবনটির ইটগুলো দেখা যাচ্ছে হাড্ডিসার মানুষের মতো। বাড়িটি থেকে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ গজ দূরেই খান ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি কেমিক্যালের দোকানে বসে কথা হয় দোকান মালিকের সঙ্গে। তিনি নিজের পরিচয় দিলেন না। নামও বললেন না। শুধু জানালেন, এই দোকানটির মালিক ইয়াসিন সাহেব ঘটনার দিন কেমিক্যালের আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। ওইদিন তিনি এই দোকান থেকে বেরিয়েই প্লাস্টিকের গলিত দানায় পা আটকে মারা যান। তারপরেও প্লাস্টিকের দানার ব্যবসা সেই দোকানেই রাখার কারণ অবশ্য তিনি ব্যাখ্যা করেননি। বলেছেন, এ বিষয়ে দোকান মালিক ভাল বলতে পারবেন। তারা কিছুই জানেন না। এমন চিত্র শুধু চুড়িহাট্টায় নয়, পুরো এলাকা ঘুরেই মিলেছে।

উর্দু রোড, আজগর আলী লেন, মুফতি মাওলানা দ্বীন মোহাম্মদ রোডসহ আশপাশের প্রতিটি এলাকায় একই চিত্র। এমন কোন বাড়ির নিচতলা নেই, যেখানে কেমিক্যালের গুদাম না আছে। স্থানীয় কয়েকজন বলছিলেন, কেমিক্যালের গুদাম নেই, এমন বাড়িই এ এলাকার খুঁজে পাবেন না। কারণ এতে ভাড়া বেশি। বিশেষ করে প্লাস্টিকের দানার গুদাম সবচেয়ে বেশি। প্লাস্টিক দানার ব্যবসায়ীরা বাড়ির মালিকদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, প্লাস্টিক দানা কেমিক্যাল নয়। বিষয়টি একেবারেই ভুল।

ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে মাত্র ৫ হাত দূরে থাকা চকবাজার শাহী মসজিদের নিচে শান্ত ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক তরুণ ব্যবসায়ী ওমর ফারুক শান্ত কেমিক্যালের ব্যবসা সম্পর্কে কোন কথা বলতেই রাজি হলেন না। উপরন্তু এই প্রতিবেদকের পরিচয়পত্র যাচাই-বাছাই শেষে তাকে অন্য কোন দোকানে গিয়ে কথা বলতে বললেন। বলেন, মেয়র সাঈদ খোকনের সঙ্গে আমাদের কথা হয়ে গেছে। আমাদের ছয় মাসের সময় দিয়েছিলেন। এখনও তিন মাস বাকি। অভিযান থেমে গেছে। এখন আর কোন অসুবিধা নেই। সবাই যে যার যার মতো ব্যবসা করছেন। কোন সমস্যা নেই। আর প্লাস্টিকের দানা তো কেমিক্যাল নয়। শুধু শুধু সাংবাদিকরা প্লাস্টিক দানাকে কেমিক্যাল লিখে লিখে আমাদের ঝামেলায় ফেলছেন।

দোকানের এক দায়িত্বশীল ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে জানান, ২৫ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা ভালমানের প্লাস্টিকের দানার দাম সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকা। এসব বস্তায় থাকা দানা দিয়ে উন্নতমানের প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরি হয়। আর রাস্তায় বস্তার বিভিন্ন রঙের প্লাস্টিক দানা দিয়ে বাচ্চাদের খেলনা তৈরি হয়। এসব প্লাস্টিক দানা খুবই নিম্নমানের। সাধারণত কুড়িয়ে আনা পরিত্যক্ত প্লাস্টিক সামগ্রী গলিয়ে ওইসব দানা তৈরি করা হয়। এসব খেলনা শিশুদের জন্য ক্ষতিকর। তিনি বলছিলেন, ওইসব প্লাস্টিকের দানার তৈরি খেলনা থেকে এক ধরনের মারাত্মক দুর্গন্ধ ছড়ায়। সব শিশুই খেলনা পেলে তা এক সময় খেলতে খেলতে মুখে দেয়। যা খুবই ক্ষতিকর। অনেক সময় বাচ্চাদের নানা মুখের ঘা বা চর্মরোগ হওয়ার নজির আছে।

তিনি চিকিৎসক কিনা জানতে চাইতেই তিনি বলেন, না। কিন্তু পেটের দায়ে বহু বছর ধরে প্লাস্টিকের দানার দোকানে চাকরি করি। অনেক ক্রেতা এসব বিষয় নিয়ে মাঝে মধ্যেই দোকানিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তখন তারা আরও ভাল প্লাস্টিকের দানা চান। যাতে দানায় কোন ময়লা বা জীবাণু না থাকে। কারণ এভাবে বাচ্চারা খেলনা দিয়ে খেলতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে, ব্যবসা এক সময় মার খাবে। এমনকি সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে প্লাস্টিকের দানা ও কেমিক্যাল রাজধানীর কদমতলী ও টঙ্গীতে সরানোর যে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তাও বাস্তবায়িত হয়নি।

বাংলাদেশ প্লাস্টিক দানা ব্যবসায়ী সমিতির সচিব মোহাম্মদ সেলিম জনকণ্ঠকে বলেন, সারাদেশে প্রায় ৯শ’ প্লাস্টিক দানার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। যার মধ্যে ঢাকার চকবাজার, কামরাঙ্গীরচর ও ইসলামপুরেই আছে ৪শ’ দোকান। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চকবাজারে।

বাংলাদেশ প্লাস্টিক দানা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী আনোয়ার হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, তারা নিয়ম মেনে ব্যবসা করছেন। প্লাস্টিক দানা সব একই মাত্রায় দাহ্য নয়। যেসব দানা বেশি মাত্রায় দাহ্য সেগুলোকে নিরাপদ জায়গায় রাখা হচ্ছে। আর সরকার জায়গা দিলে এবং সেই জায়গায় অবকাঠামো নির্মিত হলে কারখানায় ব্যবহৃত প্লাস্টিকের দানার গুদাম নির্ধারিত জায়গায় সরিয়ে নেয়া হবে। তবে ইতোমধ্যেই প্রতিটি দানার দোকানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের নির্দেশনা মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ৩ জুন ঢাকার নিমতলীতে কেমিক্যালের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ১২৫ জনের মৃত্যু হয়। গত ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারে আরও ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ৭১ জনের মৃত্যু হয়। দুটি ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরান ঢাকা থেকে সব কেমিক্যালের গুদাম সরানোর কড়া নির্দেশ দেন।

এমন নির্দেশনার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যালের গুদাম সরাতে টাস্কফোর্স গঠন করে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা অভিযান শুরু করেছিল। টানা দুই সপ্তাহের অভিযানে বাড়িতে কেমিক্যালের গুদাম থাকায় পুরান ঢাকার ১৬৪ বাড়ির পানি, বিদ্যুত ও গ্যাস সার্ভিস বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সম্প্রতি অভিযান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আবার সেসব বাড়ির পানি, বিদ্যুত ও গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে।

প্লাস্টিক দানার বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মোঃ ইয়াসির আরাফাত খান জনকণ্ঠকে বলেন, প্লাস্টিকের দানা অবশ্যই শতভাগ রাসায়নিক। যারা এটিকে কেমিক্যাল বলছেন না, তারা ভুল বোঝাচ্ছেন। প্লাস্টিকের দানা পেট্রো কেমিক্যালের অর্ন্তভুক্ত। এই কেমিক্যাল বাসা বাড়িতে বেশি বা কম পরিমাণে মজুদ করাও ঝুঁকিপূর্ণ। চুড়িহাট্টার অগ্নিকান্ডে আগুন রাসায়নিক পদার্থ থেকে লাগলেও প্লাস্টিকের দানা সেই আগুনকে আরও বেশি পরিমাণে ধ্বংসাত্মক হতে সহায়তা করেছে। চুড়িহাট্টায় যে আগুন লেগেছিল তার মাত্রা ছিল ৫শ’ থেকে এক হাজার ফারেনহাইট। অথচ প্লাস্টিকের দানা দুই থেকে আড়াই ফারেনহাইটেই গলে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো হয়ে যায়। ফলে আগুনের ভয়াবহ আরও বেড়ে গিয়েছিল। প্লাস্টিক দানা আগুনের তাপে গলে এক ধরনের দূষিত ধোঁয়া বের হয়। সেই ধোঁয়ায় মানুষের মৃত্যু একপ্রকার নিশ্চিত। চুড়িহাট্টার অগ্নিকা-ে যারা মারা গেছেন, তাদের অধিকাংশই প্লাস্টিকের দানা পুড়ে যে দূষিত ধোঁয়া হয়েছিল, সেই ধোঁয়ায় মারা গেছেন।

তিনি আরও জানান, ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর টঙ্গীতে বহুল আলোচিত ট্যাম্পাকো কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছিল। আগুনে ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আহত হয়েছিলেন শতাধিক। ওই ঘটনার তদন্তেও দেখা গেছে, কারখানাটিতে প্রচুর প্লাস্টিকের দানা মজুদ ছিল। আগুনে প্লাস্টিকের দানা থেকে বের হওয়া বিষাক্ত ধোঁয়া আটকা পড়ারা মারা গিয়েছিল।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মাকসুদ হেলালী জনকণ্ঠকে বলেন, প্লাস্টিকের দানা অবশ্যই কেমিক্যাল। তবে নানা ধরনের প্লাস্টিকের দানা আছে। পুরান ঢাকায় কোন্ ধরনের প্লাস্টিকের দানা আছে, তা আগে চিহ্নিত করা দরকার। সে মোতাবেক সরকারের উচিত ব্যবস্থা নেয়া। আর প্লাস্টিক শিল্পের সঙ্গে যেহেতু অনেক মানুষের চাকরি জড়িত সে ক্ষেত্রে বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া দরকার। আর প্লাস্টিক দানা বা রাসায়নিক পদার্থ কিভাবে রাখতে হয়, তা অধিকাংশ ব্যবসায়ীই জানেন না। সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দেয়া জরুরী। অন্যথায় আরও দুর্ঘটনা ঘটা বিচিত্র নয়।