২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বগুড়া-৬ উপনির্বাচন নিয়ে খালেদা তারেক মতবিরোধ

  • দলীয় প্রার্থী ঠিক করতে সিদ্ধান্তহীনতায় বিএনপি

শরীফুল ইসলাম ॥ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ না নেওয়ায় শূন্য হওয়া বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে দলের কারাবন্দী চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ও লন্ডন প্রবাসী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে স্কাইপি বৈঠকে তারেক রহমান এ নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত দিলেও খালেদা জিয়া এর বিরোধিতা করছেন। আর এ কারণে নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে এলেও দলীয় প্রার্থী ঠিক করার বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্তহীনতায় বিএনপি।

জানা যায়, দলীয় ৫ এমপি শপথ নিয়ে সংসদে যোগদানের পরই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ না নেওয়ায় শূন্য হওয়া বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচন ও দলের জন্য সংরক্ষিত ১টি নারী আসন নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। এ নিয়ে তিনি দলের ক’জন সিনিয়র নেতার সঙ্গে কথাও বলেন।

সূত্র জানায়, ১৩ মে ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে স্কাইপিতে জোটের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় তিনি প্রথমেই কোন প্রেক্ষাপটে বিএনপি পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে দলীয় এমপিদের সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেন তা জানান। এর পর তিনি বিএনপির জন্য সংরক্ষিত ১টি নারী আসন নেয়া ও বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নেয়ার কথা জানান। বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও এ নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সাংবাদিকদের জানান।

জানা যায়, বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানার পর বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করা কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ক্ষুব্ধ হন। তিনি তার নিজস্ব সূত্রের কাছে জানতে চান কে বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তার লন্ডন প্রবাসী ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছেন শুনে তিনি ক্ষুব্ধ হন। এ উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপির কি লাভ হবে তাও তিনি জানতে চান। তবে তারেক রহমানের পক্ষ থেকে বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে বোঝানোর চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।

এদিকে বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনের জন্য আজ বৃহস্পতিবার থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করবে। তবে বিএনপি কবে থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করবে এ বিষয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্র কিছুই জানাতে পারেনি। এই সূত্র জানায়, বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনের বিষয়ে এখনও কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে কোন নির্দেশনা দেয়া হয়নি।

৮ মে নির্বাচন কমিশন বগুড়া-৬ আসনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। এ তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ২৩ মে। মনোনয়নপত্র বাছাই ২৭ মে এবং মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ৩ জুন। প্রতীক বরাদ্দ করা হবে ৪ জুন এবং ২৪ জুন ভোটগ্রহণ। তাই বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলেও হাতে সময় একবারেই কম।

সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া কারাবন্দী থাকায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে সিদ্ধান্ত দেন সেটাই বাস্তবায়ন হয়। এর আগে দলীয় এমপিদের সংসদে যাওয়ার বিষয়ে কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপার্সনের নেতিবাচক সিদ্ধান্ত থাকলেও তারেক রহমান ঠিকই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দিয়ে দলীয় এমপিদের সংসদে পাঠান। তাই বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়েও তার সিদ্ধান্তই কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে দলীয় নেতাকর্মীরা মনে করছেন।

বগুড়া-৬ আসনের নির্বাচনে অংশ নিলে যাতে কোন ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয় সে জন্যই সর্বশেষ ২০ দলীয় জোটের বৈঠকের শেষ দিকে এসে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিষয়টি জোটের নেতাদের অবগত করেন। তবে এ নির্বাচনে অংশ নিলে কাকে প্রার্থী করা হবে সে বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি।

উল্লেখ্য, গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ছয়টি আসন পায় বিএনপি। আর ৩০০ আসনের মধ্যে ৯৬ শতাংশ আসনই পায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে এমন ভরাডুবির পর ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি ও তাদের জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। শুধু তাই নয় পুনর্নির্বাচনের দাবিতে নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি প্রদানের পাশাপাশি, মানববন্ধন, গণঅনশন ও গণশুনানিসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারেনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি। প্রথমেই সিদ্ধান্ত অমান্য করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের দল গণফোরামের দুই এমপি শপথ নিয়ে সংসদে যান। এর পর তাদের পথ ধরে বিএনপির ৫ এমপিও সংসদে যান। দলীয় সিদ্ধান্তে বিএনপির ৫ জন সংসদে গেলেও আবার দলীয় সিদ্ধান্তেই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে যাননি বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী কথা বলাবলির পর স্বয়ং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই জানান, এটি তাদের রাজনৈতিক কৌশল। তবে দেশের ইতিহাসে এমন কৌশল নতুন হওয়ায় বিএনপির এ কৌশল নিয়ে সারাদেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বয়কট করে শপথ না নেওয়ার কথা জানিয়ে শেষ মুহূর্তে বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া অন্য ৫ জন শপথ নেয়ার বিষয়টি খোদ বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যেই নানামুখী প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। তবে দলের সিনিয়র নেতারা এ প্রশ্নের সদুত্তর দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

এদিকে ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিক আলোচনার পর এ উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন এ নিয়ে চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা। কেউ বলছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি পেলে কিংবা কারাবন্দী থেকেই নির্বাচন করার বিষয়ে আইনী জটিলতা না থাকলে তাকে প্রার্থী করার বিষয়ে অনেকেরই মত রয়েছে। তবে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া নিজেই এখন পর্যন্ত এ আসনের উপনির্বাচনে দলের অংশ নেয়ার বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে বলে জানা গেছে। তাই খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত। এ ছাড়া আলোচনায় আছে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের নাম। কিন্তু তিনিও এ নির্বাচনে অংশ নেয়া কিংবা বিএনপির রাজনীতিতে আসার বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন বলে জানা গেছে। তারেক রহমানের ছোটভাই প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমানের নামও আলোচনায় আছে। তবে এ বিষয়ে তার মনোভাব কি জানা যায়নি। আবার কেউ কেউ বলছেন যেহেতু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন তাই আবারও তাকেই দলীয় মনোনয়ন দেয়া হতে পারে। আর তা না হলে অন্য কোন কেন্দ্রীয় সিনিয়র নেতা কিংবা বগুড়া থেকে কোন আঞ্চলিক নেতাকেও এ আসনে মনোনয়ন দেয়া হতে পারে। নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পরই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিএনপি নেতা জানান, বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার তেমন আগ্রহ নেই। তবে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ নির্বাচনে অংশ নেয়ার পক্ষে। তবে খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার পর তারেক রহমানের সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন হয়। তাই শেষ পর্যন্ত বিএনপি বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রার্থীও তারেক রহমানই ঠিক করবেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে জানানো হয়েছে বিএনপি বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নিতে পারে। তবে অংশ নিলে প্রার্থী কে হবে তা এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি। নিশ্চয়ই দলীয় ফোরামে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া