১৫ মে ২০১৯

রাহীর বোলিং ঝলক, স্টার্লিংয়ের সেঞ্চুরি

মিথুন আশরাফ ॥ আবু জায়েদ রাহীর বদলে তাসকিন আহমেদকে বিশ্বকাপে নেয়া হতে পারে। এমন গুঞ্জন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনই উড়িয়ে দিয়েছেন। এখনতো রাহীর বাদ পড়ার আর কোন অপশনই খোলা থাকল না। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে রাহী যে বোলিং ঝলক দেখালেন। একাই ৫ উইকেট শিকার করে নিলেন। তার এ দুর্দান্ত বোলিংয়ে আয়ারল্যান্ড তিন শ’ রানও করতে পারল না। পল স্টার্লিয়ের সেঞ্চুরিতে ৮ উইকেট হারিয়ে ৫০ ওভারে ২৯২ রান করতে পারল।

অথচ শুরুতে টস জিতে ব্যাটিং নিয়ে ২৩৩ রান পর্যন্ত ২ উইকেটই গিয়েছিল আয়ারল্যান্ডের। এর মধ্যে রুবেল হোসেন ও রাহীই একটি করে উইকেট নিয়েছিলেন। যেই আয়ারল্যান্ডের রান ২৩৩ হলো, পোর্টারফিল্ডকে আউট করে দিয়ে ‘ব্রেক থ্রু’ দিলেন রাহী। এরপর আরও ৩টি উইকেট শিকার করে ৫ উইকেট নিয়ে ফেললেন। ৯ ওভারে ৫৮ রান দিয়ে ৫ উইকেট শিকার করেন রাহী। তার এই বোলিং দ্যুতি না দেখা গেলে আয়ারল্যান্ড ৩০০ রান বা তারবেশি করে ফেলত। পল স্টার্লিং ১৩০ রানের ইনিংস উপহার দিয়েছেন। সঙ্গে পোর্টারফিল্ড ৯৪ রান করেন। দুইজন মিলে ১৭৪ রানের জুটি গড়েন। এই জুটিই আয়ারল্যান্ড বড় স্কোর গড়ার পথ দেখায়। তাছাড়া রাহীই উজ্জ্বল হয়ে থাকেন।

বাংলাদেশের একাদশে যে একাধিক পরিবর্তন আসবে তা আগে থেকেই অনুমান করা গেছে। চার পরিবর্তন নিয়ে নেমেছিল বাংলাদেশ দল। নিয়মরক্ষার ম্যাচ ছিল বাংলাদেশের। ‘রিজার্ভ বেঞ্চ’ ঝালিয়ে নেয়ার ম্যাচও ছিল। ম্যাচটিতে ‘কাটার মাস্টার’ মুস্তাফিজুর রহমান, অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ, ওপেনার সৌম্য সরকার, ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ মিঠুনকে বিশ্রামে রাখা হয়। এ চারজনের বদলে ওপেনিংয়ে লিটন কুমার দাস, অলরাউন্ডার মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, পেসার রুবেল হোসেন ও মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনকে নামানো হয়। রুবেল ও লিটন প্রায় তিনমাস পর আবার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে নামলেন। ফেব্রুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সর্বশেষ খেলেছিলেন রুবেল ও লিটন। আর মোসাদ্দেকতো গত বছর সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপ খেলার পর আর জাতীয় দলের জার্সিতে খেলারই সুযোগ পাননি। যদি ফাইনাল ম্যাচ না খেলেন তাহলে ২০১৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে সর্বশেষ খেলা তাসকিন আহমেদের আর ত্রিদেশীয় সিরিজে খেলার সুযোগই মিলল না।

চার পেসার নিয়ে দল গড়া হয়েছে। বিশ্বকাপে চার পেসার নিয়ে খেললে কেমন হতে পারে তার একটি ধারণা নিতেই এমন একাদশ গড়া হয়েছে। অবশ্য পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজা, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহীম, তামিম ইকবাল ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ঠিকই খেলেন। তাদের সঙ্গে সাব্বির রহমান রুম্মন ও আবু জায়েদ রাহী একাদশে ঠিকই থাকেন।

আয়ারল্যান্ডকে এই একাদশ নিয়েই বিপাকে ফেলে বাংলাদেশ। ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলতে নামার আগে আরও দুটি ম্যাচ খেলে আয়ারল্যান্ড। কোন ম্যাচেই জেমস ম্যাককলামকে দেখা যায়নি। আয়ারল্যান্ড উলভসের হয়ে প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে যিনি সেঞ্চুরি করে বাংলাদেশকে ডুবিয়েছিলেন। হয়তো আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে যে বাংলাদেশের আরেকটি ম্যাচ ছিল সেই ম্যাচটি বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত না হলে খেলতেও পারতেন ম্যাককলাম। অবশেষে বাংলাদেশের বিপক্ষেই নামলেন। কিন্তু এদিন বাংলাদেশের একাদশেও এ সিরিজে প্রথমবারের মতো দেখা যায় রুবেলকে। ম্যাককলামকে (৫) রুবেলই আউট করে দেন। প্রস্তুতি ম্যাচের মতো আর ম্যাককলামকে জ্বলে উঠতে দেননি রুবেল। তাতে করে দলের ২৩ রানেই এক উইকেট হারিয়ে বসে আয়ারল্যান্ড। রুবেল যে এখনও কতটা ত্যাজ দেখাতে জানেন, বিশ্বকাপে যে তার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা বুঝিয়ে দেন।

এন্ডি বালবির্নিকে নিয়ে ছিল ভয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৩৫ রানের ইনিংস খেলা এ ব্যাটসম্যান না আবার বাংলাদেশের বিপক্ষেও উজ্জ্বলতা ছড়ান। তাহলে স্কোর আবারও ৩০০ ছাড়িয়ে যাবে। তাতে বাংলাদেশ বিপাকে পড়বে। কিন্তু এমন একজন বালবির্নিকে সাজঘরে ফেরালেন, যেখানে শুধু স্বস্তিই মিলল। দলের ৫৯ রানে বালবির্নি (২০) আউট হওয়ায় স্বস্তি মিলল, আবার উইকেটটি পেলেন আবু জায়েদ রাহী; তাতেও স্বস্তি মিলল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সর্বশেষ ম্যাচটিতে ওয়ানডে অভিষেক হওয়া ম্যাচে রাহী যে নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। বিশ্বকাপের দলে থাকা, যখন তখন সুইং দিতে পারা এ বোলার উইকেট পাওয়া মানে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা। যা দলেরই কাজে লাগবে।

দুটি উইকেট তখন ঠিকই নেয়া গেছে। কিন্তু আরেকদিকে পল স্টার্লিং বিপজ্জনক হয়ে উঠছিলেন। এ ওপেনার ৫১ বলে ৫০ রান করে ফেলেন। দলও ধীরে ধীরে বিপদ দূর হতে থাকে। ২১তম ওভারে গিয়ে স্কোরবোর্ডে ১০০ রান যোগ হয়। এর মধ্যে আবার ৫৭ রানে থাকা স্টার্লিং আউট হওয়া থেকে বাঁচেন। মোসাদ্দেকের বলে লং অনে থাকা সাব্বির রহমান রুম্মন ক্যাচ ধরতে পারেননি। পরক্ষণেই আবারও ‘নতুন জীবন’ পল স্টার্লিং। এবার সাকিবের বলে সাইফউদ্দিন ক্যাচ ধরতে পারেননি। ক্যাচটি ধরলে বাংলাদেশের প্রথম ও বিশ্ব অলরাউন্ডারদের মধ্যে সবচেয়ে কম ১৯৮ ম্যাচ খেলে ২৫০ উইকেট ও ৫ হাজার রান করার কৃতিত্ব গড়তেন সাকিব। কিন্তু তা হয়নি।

স্টার্লিংয়ের সঙ্গে উইলিয়াম পোর্টারফিল্ড মিলেতো বাংলাদেশের ঘাড়ে বিপদ আনতে থাকেন। দুইজন মিলে ৫০ রানের জুটি গড়ার সঙ্গে ১০০ রানের জুটিও গড়ে ফেলেন। পোর্টারফিল্ডও হাফ সেঞ্চুরি করে ফেলেন। রুবেল আর রাহী যে উইকেট শিকার করেন, এরপর সাইফউদ্দিন, মোসাদ্দেক, সাকিব, মাশরাফি উইকেটই নিতে পারেননি। স্বাগতিক আইরিশরাও নিজেদের চেনা ক্লনটার্ফ ক্রিকেট ক্লাবে উজ্জ্বলতা ছড়ান। স্টার্লিংতো শেষ পর্যন্ত ১৩০ রান করে ফেলেন। ক্যারিয়ারে অষ্টম ওয়ানডে সেঞ্চুরি করেন। স্টার্লিংকে শেষ পর্যন্ত ঠেকান রাহী। তার আগে পোর্টারফিল্ডকে আউট করে দিয়ে রাহীই স্টার্লিং ও পোর্টারফিল্ড জুটি ভাঙ্গেন। মাঝখানে কেভিন ও’ব্রায়েনকেও সাজঘরে পাঠান রাহী। গ্যারি উইলসনও রাহীর দুর্দান্ত বোলিংয়ের সামনে রক্ষা পাননি। প্রথম উইকেট পড়ার পর দ্বিতীয় থেকে সপ্তম উইকেট পর্যন্ত রাহীই শিকার করেন। দ্বিতীয় উইকেট ৫৯ রানে পড়ার পর ২৩৩ রান পর্যন্ত যখন উইকেট পড়ছিল না তখন রাহীই উইকেট শিকার করেন। টানা পাঁচ উইকেট নেন তিনি।

তার বোলিং ঝলকে একটা সময় যে মনে হচ্ছিল, তিন শ’ রান অনায়াসেই করে ফেলবে আয়ারল্যান্ড। তা আর করতে পারল না। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচ খেলতে নেমেই ৫ উইকেট শিকার করে নিলেন রাহী।