২৩ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দলীয় প্রধানের একক সিদ্ধান্তের কারণে জাপা চার ধারায়

  • গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা নেই

রাজন ভট্টাচার্য ॥ দল পরিচালনায় গঠতন্ত্রের কোন তোয়াক্কা নেই এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে। পার্টি প্রধানের একক ক্ষমতাবলে যেমন ইচ্ছা সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। গত দুই বছরে তিনবার মহাসচিবের পদে পরিবর্তন এনেছেন এরশাদ। দেশের বড়-বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা আর নেই। নিজের স্ত্রী ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নজির অহরহ। গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা না করেই বাড়ানো হচ্ছে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামের সদস্য। এছাড়া জাপার গুরুত্বপূর্ণ পদে ইচ্ছেমতো পরিবর্তন আনেন এরশাদ। যখন খুশি যাকে তাকে দেয়া হয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রথমবারের মতো দলে যোগ দিয়ে প্রেসিডিয়ামের পদ পাওয়ারও নজির আছে। এ নিয়ে নিজের দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তুষ্টি লেগেই আছে। এরশাদের একক সিদ্ধান্তে দলে পদোন্নতি দেয়ার প্রতিবাদে গত সপ্তাহে তিনজন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেছেন।

জাপার নেতাকর্মীরা বলছেন, জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রে আছে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামের সদস্য সংখ্যা হবে ৪১ জন। অনেক আগেই এরশাদের ইচ্ছামতো তা বাড়িয়ে ৪৬ জন করা হয়। সর্বশেষ এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪ তে। এ কারণে জাপার অনেক নেতাকর্মী মনোকষ্টে আছেন। তারা বলেছেন, গঠনতন্ত্রে দল প্রধানকে একক ক্ষমতা দেয়া হলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ফোরামে আলোচনা করা জরুরী। অন্যথায় দলের অন্য নেতাদের কোন দাম থাকে না।

নেতাকর্মীরা বলছেন, দল পরিচালনায় গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা করেন না সাবেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। কারণ, তিনি তো দলটির সর্বময় ক্ষমতার মালিক। দলের কাউন্সিলে তাকে দেয়া হয়েছে সর্বময় ক্ষমতা। তাই তিনি যখন যা খুশি তা করতে পারেন। যখন তখন যাকে খুশি বাদ দিতে পারেন। আবার যখন যাকে খুশি দলে নিতে পারেন। দেয়ার ক্ষমতা আছে গুরুত্বপূর্ণ পদও। আবার দলের অপেক্ষাকৃত সিনিয়র ও ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে যাকে খুশি তাকে প্রমোশনও দিতে পারেন তিনি। যে কাউকে তিনি প্রেসিডিয়াম সদস্য করে বড় নেতা বানিয়ে নিতে পারেন। এজন্য জাপার গঠনতন্ত্রে রয়েছে ২০/১/ক ধারা।

এই ধারার বলে জাতীয় পার্টিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ হলেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। দলের অপর একটি পক্ষ বলছেন, গঠনতন্ত্রের ২০/১ ক ধারার ক্ষমতা প্রয়োগ করে এরশাদ অনেক আগেই ৪১ সদস্যের প্রেসিডিয়ামের ফোরামকে করেছেন ৪৬ জনে। আর গত বৃহস্পতিবার তিনি এক লাফে আটজন নেতাকে প্রেসিডিয়াম সদস্য বানিয়ে এ পদে সবশেষ সংখ্যা হলো ৫৪। এরশাদ নিজে এই ৫৪ প্রেসিডিয়াম সদস্যের নাম ঠিকমতো বলতে পারবেন কি না তা নিয়ে খোদ জাপা সিনিয়র নেতারাই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

দলের একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, স্যার (এরশাদ) শেষ সময়ে এসে যা শুরু করেছেন তা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। দল প্রধানের কর্মকা-ের কারণে অন্য দলের নেতাদের কাছে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারি না। তারা আমাদের নিয়ে হাসাহাসি করে। বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দলে এত প্রেসিডিয়াম সদস্য আছে বলে আমার জানা নেই। তাছাড়া হঠাৎ করে অপেক্ষাকৃত জুনিয়রদের দলে প্রেসিডিয়াম সদস্য করায় সিনিয়র নেতারা স্বাভাবিকভাবেই অসন্তোষ প্রকাশ করবে।

ইতোমধ্যে পার্টির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক পার্টির সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা। তিনি বলেন, শীর্ষ নেতৃত্বের অযোগ্যতার প্রতিবাদে জাতীয় পার্টির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব পদ থেকে পদত্যাগ করলাম।

খোকা আরও বলেন, আমার পরিচয় আমি পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও জাতীয় পার্টির একজন সাধারণ কর্মী। সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে সুযোগ সন্ধানী অযোগ্য নেতৃত্ব জাতীয় পার্টির সাধারণ কর্মীদের আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির জন্মলগ্ন থেকে আমি এ পার্টি করে আসছি। পার্টির বর্তমান নেতৃত্বের ওপর আমার আস্থা নেই। এরশাদকে অসুস্থ অবস্থায় একটি মহল পার্টির ভেতর যেভাবে প্রমোশন দিচ্ছে তা মেনে নেয়া যায় না।

শুধু খোকা নয়, দলের যুববিষয়ক সম্পাদক বেলাল হোসেন ও যুগ্ম সম্পাদক আবু সাঈদ স্বপনও দলের মধ্যে ঢাকাও পদোন্নতির অভিযোগ এনে পদত্যাগ করেছেন। স্বপন বলেন, দেখেন কাদের প্রমোশন দেয়া হয়েছে! আরতো মেনে নেয়া যায় না। আরও অনেকে পদত্যাগের লাইনে আছে।

জাপার গঠনতন্ত্রের ২০ এর উপধারা (১) বলা হয়েছে, ‘গঠনতন্ত্রের অন্যধারায় যাহাই উল্লেখ থাকুক না কেন-জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত থাকবেন। এ ক্ষমতাবলে তিনি প্রয়োজন বোধে প্রতিটি স্তরের কমিটি গঠন, পুনর্গঠন, বাতিল, বিলোপ করতে পারবেন। তিনি যেকোন পদ সৃষ্টি বা অবলুপ্ত করতে পারবেন। চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টির যেকোন পদে যেকোন ব্যক্তিকে নিয়োগ, যেকোন পদ থেকে যেকোন ব্যক্তিকে অপসারণ ও যেকোন ব্যক্তিকে তার স্থলাভিষিক্ত করতে পারবেন।

এরশাদের সহোদর জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান করা হয় ২০১৬ সালে জানুয়ারি মাসে। তখন গঠনতন্ত্রে এই পদ ছিল না। রংপুরের এক জনসভায় ছোট ভাই জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা দেন এরশাদ। এর অল্পদিনের মাথায় রওশনপন্থীদের চাপে রওশনকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করা হয়। সেই পদও কিন্তু গণতন্ত্র মোতাবেক ছিল না। পরে কাউন্সিলে (১৪ মে, ২০১৬) গঠনতন্ত্রের সংশোধনী এনে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও কো-চেয়ারম্যান পদ সংযোজন করা হয়।

এরশাদ অসুস্থ হওয়ার পর ভাই জিএম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিলেন তিনি। সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফেরার পর সব পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। নেতাকর্মীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে পরে কাদেরকে স্বপদে বহাল করেন এরশাদ। এর কয়েকদিনের মধ্যেই আবার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বও দেয়া হয় ভাইকে। ১/১১ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জিএম কাদেরকে দল থেকেই বহিষ্কার করেছিলেন এরশাদ। তখন নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন কাদের। কিছুদিন দু’ভাইয়ের মধ্যে নেতৃত্বের টানাপোড়ের মধ্যে আবারও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন আনা হয়। দলে ফিরিয়ে আনা হয় ভাইকে। কিন্তু জাপার রাজনৈতিক ইতিহাসে ভাইয়ের বিরুদ্ধে কতবার এরশাদ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছেন তা জিএম কাদেরের স্বরণে নেই।