১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মন্ত্রণালয়ের কথা শুনলে মানুষ ভয় পায়, এটা চলতে পারে না

  • কর্মশালায় ভূমিমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, মাঠ পর্যায়ে ভূমি প্রশাসনের কর্মকর্তা কর্মচারীদের দায়িত্বহীনতা, অনিয়ম, দুর্নীতিতে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। তিন বছরে শেষ করার কথা থাকলেও কিছু জায়গায় ৩০ বছরেও জরিপ শেষ হচ্ছে না। মানুষের ভোগান্তি ও আর্তনাদ হৃদয় দিয়ে অনুভব করুন। নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করা আর মীরজাফরি করা একই কথা। সময় আছে মাঠের সমস্যা সমাধান করুন। সচিব, চেয়ারম্যান, ডিজিদের বলছি আমার সঙ্গে এক হয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ুন। অবস্থান পরিবর্তন হতেই হবে। কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনে আপনাদের যে পরিমাণ ক্ষমতা দেয়া আছে তার সবটুকু প্রয়োগ করুন। নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করুন। যে কোন মূল্যে জনগণকে সেবা দিতেই হবে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের কথা শুনলে মানুষ ভয় পায়। এ অবস্থা আর চলতে দেয়া যায় না। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ(ভূরেজ) অধিদফতরের উদ্যোগে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ের প্রশিক্ষণ হলে অনুষ্ঠিত ভূমি জরিপ ও রেকর্ড ব্যবস্থাপনায় অধিকতর গতিশীলতা আনয়নে ভূমি জরিপ কার্যক্রমের চ্যালেঞ্জসমূহ ও উত্তরণে করণীয় শীর্ষক একদিনের কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ভূমিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, আমার নিজ এলাকায় জরিপ কাজ চলছে। মানুষের কি হয়রানি। আমার এলাকায় যদি এই অবস্থা হয় তাহলে দেশের অন্যান্য এলাকার অবস্থা কত ভয়াবহ হতে পারে তা চিন্তা করুন। তিনি বলেন, কথায় আছে যে জায়গায় হয় জরিপ সে জায়গায় জনগণ হয় গরিব। সাধারণ মানুষকে হয়রানি মেনে নেয়া হবে না। ভূমি হচ্ছে মানুষের আস্থার জায়গা। সব কিছু বেইমানি করতে পারে কিন্তু ভূমি কখনও বেইমানি করে না। মনে রাখবেন মানুষকে কষ্ট দেয়া বড় অপরাধ। আর মানুষের উপকার করা, বিপদগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, প্রাপ্ত সেবাটা সঠিকভাবে দেয়াটা হচ্ছে সদকায়ে জারিয়া।

ভূমি ব্যবস্থাপনায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মাঠ পর্যায়ে জনভোগান্তি দূর করা বক্তব্যের এক পর্যায়ে এ কথা উল্লেখ করে ভূমিমন্ত্রী বলেন, জনস্বার্থে কর্মকর্তাদের নিজেদের নেতৃত্বের গুণাবলী প্রয়োগ করে অধীনস্থদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিতে হবে। সবাইকে দ্রুত শোধরানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, কিছুদিনের মধ্যেই অনিয়মের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। মন্ত্রী ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীদের ধর্মীয় অনুশাসনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, আমাদের কাজ আমাদের ইমানি দায়িত্ব। দেশের মানুষ যেন ভালভাবে সেবা পেতে পারে এভাবে আমাদের কাজ করে যেতে হবে। তিনি তার বক্তব্যের শেষে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারীদের কঠোরভাবে নির্দেশ প্রদান করেন যেন তাদের দ্বারা মানুষের কোন ধরনের হয়রানি না হয়। মন্ত্রী সবাইকে নিয়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেন, দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে ভূমি ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব। ভূমি ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন যেন টেকসই হয় সেজন্যে আমরা বদ্ধপরিকর। মন্ত্রী তার বক্তব্যে আরও বলেন, আমাদের মাইন্ডসেট চেঞ্জ করতে হবে। গতানুগতিক চিন্তা করলে কোন লাভ হবে না। গুণগত পরিবর্তন আনতে পারলে এবং সিস্টেম ডেভেলপমেন্ট করতে পারলে কাজ অনেক সহজ হবে। যারা এতে কমফোর্ট ফিল করবেন না তাদের ঠিক করে ফেলা উচিত তারা কি করবেন। যারা অন্যায় করবেন তারা কেউই রেহাই পাবেন না।

ভূমিমন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে ১ কোটি ৪৬ লাখ খতিয়ান ওয়েবসাইটে আপলোড দেয়া হয়েছে, সেবাগ্রহিতাগণের সুবিধার্থে অভিযোগ কেন্দ্র গঠনের জন্য হটলাইন, সরকারের সঙ্গে ভূমি সম্পর্কিত বিভিন্ন লেনদেনের জন্য ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করার জন্য একটি পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন, অনিবাসী বাংলাদেশীদের সেবা দেয়ার জন্য একটি অনলাইন প্লাটফর্ম চালু এবং ল্যান্ড ব্যাংক করার বিষয়গুলো প্রক্রিয়াধীন। এগুলো মূলত পুরো ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ইন্টিগ্রেটেড অটোমেশনের ভেতর নেয়ার পর্যায়ক্রমিক ধাপ।

বিশেষ অতিথি ভারপ্রাপ্ত ভূমি সচিব মোঃ মাক্ছুদুর রহমান পাটওয়ারী বলেন, সরকারী কর্মচারীদের জনগণের সেবায় আমাদের নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে এবং জাতীয় স্বার্থকে সবকিছুর উর্ধে স্থান দিতে হবে। আমাদের নিজেদের জনগণের খাদেম বলে বিবেচনা করতে হবে। সুতরাং আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে জনগণের কাছে। আমাদের দ্বারা যেন জনগণের ভোগান্তি না হয় আমাদের সেভাবেই কাজ করে যেতে হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) আলীম আখতার খান। আলীম আখতার খান তার প্রবন্ধে ভূমি জরিপের ইতিহাস, জরিপ কাজে বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও করণীয় সমূহ এবং জরিপ কর্মকা- আধুনিকায়নে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোচনা করেন। কর্মশালায় নির্ধারিত আলোচকবৃন্দ ছিলেন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের প্রাক্তন মহাপরিচালক মোঃ মাহফুজুর রহমান, প্রাক্তন পরিচালক ফায়েকুজ্জামান চৌধুরী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক নূরুল ইসলাম নাজেম। অধ্যাপক নূরুল ইসলাম উচ্চ শিক্ষায় ভূমি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক বিশেষায়িত কোর্স চালু করা এবং সিভিল সার্ভিসে ল্যান্ড ক্যাডার এর প্রতিষ্ঠা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অধ্যাপক ইসলামের মতে, বিসিএস (ল্যান্ড ক্যাডার) করা হলে ভূমি সেক্টরে কর্মরত কর্মকর্তাদের মাঝে দায়িত্বশীলতা আরও বৃদ্ধি পাবে।

কর্মশালায় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান মুনশী শাহাবুদ্দীন আহমেদ এবং ভূমি আপীল বোর্ডের চেয়ারম্যান মোঃ আবদুল হান্নান। সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান এ বছরের জুন মাসের মধ্যেই সমগ্র দেশে ই-নামজারি কার্যক্রম শুরু হবার সমূহ সম্ভাবনার কথা জানান। দুই শীর্ষ সরকারী কর্মকর্তাই ভূমি ব্যবস্থাপনার সমস্যার গভীরতা বোঝাতে যেয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত জমি সংক্রান্ত ভোগান্তির কথাও উল্লেখ করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের মহাপরিচালক জনাব মোঃ তসলীমুল ইসলাম। বক্তব্যের এক পর্যায়ে ভূমিমন্ত্রী বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় ৭ ধারা নোটিস জারির পর প্রায়ই দেখা যায় মানুষকে হয়রানির উদ্দেশে মাঠ পর্যায়ে কোন কোন অসাধু চক্র যোগসাজশ করে আরেকজনকে দিয়ে টাইটেল মামলা করায়। ৩ এবং ৪ ধারার নোটিস জারি করার পরই কেবল শেষবারের মতো ৭ ধারার নোটিস জারি করা হয়। সুতরাং, জনভোগান্তি কমানোর লক্ষ্যে, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ৭ ধারার নোটিস জারির পর আর কোন অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হবে না এ মর্মে আমরা শীঘ্রই পরিপত্র জারি করতে যাচ্ছি।